ঢাকা, ২০ মে – জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর যে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম কার্যত স্তিমিত হয়ে পড়েছিল, তারা কি তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবার ‘ব্যাক’ বা পুনর্বাসিত হয়েছে? সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং জুলাই আন্দোলনের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড মাহফুজ আলমের একটি ফেসবুক পোস্ট এই মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে বড় ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। গত মঙ্গলবার রাতে দেওয়া এক পোস্টে মাহফুজ দাবি করেন, আওয়ামী লীগ কোনো সাধারণ দল নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ‘ধর্মতত্ত্ব’—যার ওপর মানুষের ইমান বা বিশ্বাস আবার ফেরত এসেছে।
মাহফুজের এই পোস্টটি এমন এক সময়ে এলো, যখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘প্রত্যাবর্তন ২.০’ বা দ্বিতীয় দফায় ফিরে আসার বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা বেশ জোরেশোরে প্রচারণা চালাচ্ছেন। একই সাথে ভারতের কিছু গণমাধ্যমে সম্প্রতি শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর এই গুঞ্জন আরও ডালপালা মেলেছে।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন লঘুচাপ: পরিবর্তন হবে আবহাওয়া
একই দিনে সরকারের অবস্থান: ‘হাসিনার প্রতিও ইনসাফ থাকবে’
রহস্যজনকভাবে, মাহফুজ আলম যেদিন রাতে এই পোস্ট দেন, ঠিক একই দিন দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সরকারের এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পরিষ্কার করেন।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “শেখ হাসিনার প্রতিও আমাদের ইনসাফ থাকবে। শেখ হাসিনা যদি বাংলাদেশে আসেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো এক্সট্রা জুডিশিয়াল (বিচারবহির্ভূত) কিছু আমরা করব না।”
মাহফুজ আলমের এই ফেসবুক পোস্টের নিচে দেশের ছাত্ররাজনীতি এবং নাগরিক সমাজের শীর্ষ ব্যক্তিত্বরা এসে তাঁকে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘অলটারনেটিভস’ (Alternatives)—যা তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাথে যুক্ত না হয়ে গত মার্চে গঠন করেছিলেন—তার সহযোদ্ধারাও এখন এই অবস্থানের ময়নাতদন্ত করছেন।
পোস্টের কমেন্ট বক্সে আসা তিনটি প্রধান তির্যক মন্তব্য নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. উগ্র ডানপন্থার তোষণ ও পদত্যাগের প্রশ্ন: গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য মাহতাব উদ্দীন আহমেদ সরাসরি প্রশ্ন তুলে বলেন, যে অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা আজ মাহফুজ করছেন, তিনি নিজে যখন সেই সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন, তখন পদত্যাগ করলেন না কেন? যখন সরকার উগ্র ডানপন্থীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছিল, তখন সততার সাথে ব্যর্থতা মেনে নিয়ে কেন তিনি সরে দাঁড়ালেন না? এই প্রশ্নটি মাহফুজের ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’কে বড় সংকটে ফেলেছে।
২. অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগ: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা আবু বাকের মজুমদার মন্তব্য করেন, মাহফুজের পোস্টে উপদেষ্টাদের কারও কারও “অর্থ কেলেঙ্কারি”র বিষয়টি মিস হয়ে গেছে, যা যোগ করা উচিত ছিল।
নূমান আহমাদ চৌধুরীর এক মন্তব্যের জবাবে মাহফুজ নিজে স্বীকার করেন যে, “আওয়ামী লীগ যদি ব্যাক করে, তবে তা মুজিববাদী বাম (বাকশালি বাম) এবং কট্টর ডানের মিতালিতেই ব্যাক করবে।”
আসিফ নজরুল ও ফিরোজ আহমেদের পাল্টা ব্যাখ্যা
মাহফুজের এই ‘লীগ ব্যাক করা’র তত্ত্বকে পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। তিনি নিজের ওয়ালে লিখেছেন, “আওয়ামী লীগ ব্যাক করেনি, তারা ছিলই। ব্যাক করেছে তাদের দম্ভ, মিথ্যাচার আর মানুষকে বিভ্রান্ত করার দুঃসাহস।”
অন্যদিকে, সাবেক সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ও বিশিষ্ট লেখক ফিরোজ আহমেদ এক দীর্ঘ বিশ্লেষণে লিখেছেন যে, দল হিসেবে আওয়ামী লীগ হয়তো ফেরত আসবে না, কিন্তু যে পুরোনো স্বৈরতান্ত্রিক ও শোষণমূলক প্রশাসনিক ‘বন্দোবস্ত’ বা সিস্টেমকে হঠাতে মানুষ জুলাইয়ে জীবন দিয়েছিল, সেই পুরোনো বন্দোবস্তই আজ নতুনদের দাবার ঘুঁটি বানিয়ে ফিরে এসেছে।
মাঝরাতে মাহফুজের ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ ও দ্বিতীয় ব্যাখ্যা
প্রথম পোস্ট নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা ও বিতর্কের ঝড় উঠলে গত মধ্যরাতে আরেকটি পোস্টের মাধ্যমে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন মাহফুজ আলম। সেখানে তিনি এক প্রকার রক্ষণাত্মক অবস্থান নিয়ে জুলাই আন্দোলনের পক্ষের সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি তাঁর দ্বিতীয় পোস্টে কয়েকটি জরুরি এজেন্ডা তুলে ধরেন:
উগ্রবাদ দমন ও মানবাধিকার: দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিকের মানবাধিকার রক্ষা এবং উগ্রবাদী ও অন্তর্ঘাতমূলক রাজনীতিকে পরাস্ত করা। বিশেষ করে মাজার ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিচার নিশ্চিত করা।
বিচারের মোড় ঘোরানোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ: গত দেড় বছরকে (অন্তর্বর্তী সরকারের আমল) ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদের চেয়েও খারাপ বা দুঃসহ দেখানোর যে চেষ্টা চলছে—যার মাধ্যমে হাসিনার অপকর্ম ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে—সেই ফ্যাসিস্ট বয়ানকে রুখে দেওয়া।
অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্য সংস্কার: কৃষক-শ্রমিক ও মধ্যবিত্তের জীবন-জীবিকার সংকট দূর করতে এবং স্বাস্থ্য খাতের বিশৃঙ্খলা কাটাতে সরকারকে বাধ্য করা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মাহফুজ আলমের এই দুটি পোস্ট প্রমাণ করে যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল কারিগরদের মধ্যে আদর্শিক ও কৌশলগত বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। একদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরের দুর্বলতা ও অর্থ কেলেঙ্কারির গুঞ্জন, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে পুরোনো ব্যবস্থার পুনর্বাসন—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক চরম অনিশ্চিত ও ধূসর অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে।
এনএন/ ২০ মে ২০২৬




মন্তব্য করুন