টরন্টো, ২১ ফেব্রুয়ারি- সংযম, ক্ষমা ও আত্মশুদ্ধির পবিত্র বার্তা মাহে রমজান। এ মাস মানুষের ভেতরের অস্থিরতাকে শৃঙ্খলায় বাঁধে, হৃদয়ে জাগায় দয়া, ক্ষমা ও আত্মসমালোচনার আলো। দিনের দীর্ঘ উপবাস ও রাতের প্রার্থনায় বিশ্বাসী মানুষ যেন নিজের ভেতরেই ফিরে যায়, সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য আরও গভীরভাবে অনুভব করে। কিন্তু এবার সেই পবিত্র মাসের দোরগোড়ায় টরন্টোর ইয়র্কভিল এলাকার Toronto Islamic Centre হঠাৎই মুখোমুখি হলো এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার। ফোনের ওপার থেকে ভেসে এল বিদ্বেষী কণ্ঠ, অভিবাসীবিরোধী ও ইসলামবিদ্বেষী ভাষা, সঙ্গে সহিংসতার ইঙ্গিত। মুহূর্তে বদলে গেল মসজিদের চেনা পরিবেশ, উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ল মুসল্লি ও কমিউনিটিতে।
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মসজিদে নামাজের সময় দেখা গেছে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বাইরে একজন নিরাপত্তাকর্মী সতর্ক দৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, আর পাশ দিয়ে টহল দিচ্ছিল টরন্টো পুলিশের দুটি গাড়ি। ভেতরে একজন কর্মী নামাজের প্রস্তুতির ফাঁকে পরিধান বদলে পরেছেন প্যাডেড নিরাপত্তা ভেস্ট। সাধারণ ইবাদতের পরিবেশে এমন দৃশ্য স্বাভাবিক নয়, কিন্তু সাম্প্রতিক হুমকির পর সেটাই হয়ে উঠেছে বাস্তবতা।
মসজিদের জেনারেল ম্যানেজার শ্যাফনি নালির জানান, ১১ ফেব্রুয়ারি একজন ব্যক্তি ফোন করে অভিবাসীবিরোধী, ইসলামবিদ্বেষী ও বর্ণবাদী মন্তব্যের সঙ্গে সহিংস হুমকি দেয়। একই দিনে আরেকটি দীর্ঘ ফোনালাপে ওই ব্যক্তি ২০১৯ সালে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ হামলার প্রসঙ্গ তুলে টরন্টোর এই মসজিদেও “অনুরূপ ঘটনা” ঘটার ইঙ্গিত দেয়। মসজিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফোনালাপের একটি রেকর্ডিং National Council of Canadian Muslims সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেছে।
ম্যানেজার আরও জানান, দুই দিন পর ১৩ ফেব্রুয়ারি আরেকজন আলাদা ব্যক্তি ফোন করে ইসলামবিদ্বেষী এবং ফিলিস্তিনবিরোধী বক্তব্য দেয়। ধারাবাহিক এসব ঘটনার পর কমিউনিটির অনেকে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। মুসল্লিরা মসজিদ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও সরকারি মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করে সহযোগিতা চাইতে।
রমজান শুরু হওয়ায় ইবাদতের চাপ ও সমবেত উপস্থিতি বেড়েছে, কিন্তু উদ্বেগও বেড়েছে একই সঙ্গে। মসজিদ কর্তৃপক্ষ বলেন, এখন প্রতিটি জামাতে দুজন করে সদস্য নামাজে না দাঁড়িয়ে দরজার দিকে নজর রাখছেন।
এই ঘটনার মানসিক অভিঘাত সবচেয়ে বেশি বোঝা যায় মসজিদের কিশোরদের কথায়। ১৩ বছর বয়সী আব্দুর রহমান চৌধুরী বলেন, ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি মসজিদের ভেতরে হোমওয়ার্ক করছিলেন, তখন দেখেন বড়রা ফোনের কাছে জড়ো হয়েছেন। একসময় তিনি ও তাঁর বন্ধুরা কাছাকাছি গিয়ে শুনতে পান ইসলামকে লক্ষ্য করে প্রচণ্ড ঘৃণামিশ্রিত কথা। তাঁর ভাষায়, সেই মুহূর্তে পরিবেশ ছিল উত্তেজনায় ভারী। এরপর থেকে তিনি আগের মতো নিরাপদ অনুভব করেন না।
তবে একই সঙ্গে দেখা গেছে সংহতির মানবিক চিত্র। বিভিন্ন মসজিদের মুসল্লিরা Toronto Islamic Centre-এ এসে নামাজ আদায় করছেন একাত্মতার বার্তা নিয়ে। ইহুদি কমিউনিটির সিনিয়র রাবাই মাইকেল ডলগিনও মসজিদে গিয়ে সমর্থন জানান। ডলগিন বলেন, রমজান তাঁদের জন্য পবিত্র সময়। এমন সময়ে ঘৃণার লক্ষ্যবস্তু হলে একটি কমিউনিটি বিচ্ছিন্ন বোধ করতে পারে। তাই তারা এসে জানাতে চেয়েছেন, তারা একা নয়। তাঁর মতে, ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু কমিউনিটির বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক হুমকি বৃহত্তর এক বিদ্বেষপূর্ণ সময়ের প্রতিচ্ছবি, যা সমাজের সবাইকে স্পর্শ করে।
মসজিদের জেনারেল ম্যানেজার বলেন, ভয় ও উৎকণ্ঠা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে মানসিক দৃঢ়তা ও ইতিবাচকতার দিকে। রমজানের সময় মানুষ একত্রিত হয়, ইবাদত বাড়ে, দান ও সহমর্মিতা আরও দৃশ্যমান হয়। তাঁর মতে, তারা চান না নেতিবাচক ভাবনা প্রার্থনা ও দৈনন্দিন ধর্মীয় জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করুক।
টরন্টোর মতো বহুসাংস্কৃতিক শহরে মসজিদের দরজায় নিরাপত্তা ভেস্ট আর টহল গাড়ির দৃশ্য কেবল একটি কমিউনিটির উদ্বেগ নয়, এটি পুরো সমাজের পরীক্ষাও।
তথ্যসূত্র:
Toronto Star (২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)