হোম ট্রেন্ডিং লাইভ অনুসন্ধান মেনু
প্রতি মুর্হুতের কক্সবাজারকে জানুন
🔔 নোটিফিকেশন সাবস্ক্রিপশন ×
🔔

নতুন খবর সবার আগে আপনার ফোনে পান!

পিকনিক যখন কাঙালি ভোজ – DesheBideshe

প্রতিবেদকের নাম:

প্রতিবেদকের নাম:

রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ০১:১৭ পূর্বাহ্ন


কানাডাসহ উত্তর আমেরিকায় এখন পিকনিকের মৌসুম। গ্রীষ্ম এলেই কমিউনিটির ক্যালেন্ডারে যেন নতুন প্রাণ জেগে ওঠে। পার্ক বুকিং, খাবারের মেনু, শিশুদের খেলাধুলা, বড়দের আড্ডা, ছবি তোলা, ফেসবুক পোস্ট, শুভেচ্ছা বক্তব্য, পুরস্কার বিতরণ মিলিয়ে পিকনিক এখানে কেবল একটি বিনোদনমূলক আয়োজন নয়। এটি অনেক সময় হয়ে ওঠে সংগঠনের বার্ষিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার সবচেয়ে বড় মঞ্চ।

কোনো কোনো সংগঠনের সারা বছর তেমন কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম না থাকলেও বছরের একটি পিকনিক দিয়েই তারা নিজেদের অস্তিত্বের পতাকা উড়াতে চায়। অনেকের কাছে এই বার্ষিক আয়োজনই যেন সংগঠনের জীবনবৃত্তান্ত, সাংগঠনিক সাফল্যের একমাত্র প্রমাণ। ফলে যে আয়োজনটি হওয়ার কথা ছিল আনন্দ, সৌহার্দ্য ও পারিবারিক মিলনের, সেটি অনেক সময় পরিণত হয় লোকদেখানো প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক প্রভাব প্রদর্শনের এক অদ্ভুত মঞ্চে।

আরও পড়ুন

বিসিবির দারুণ উপহার: মিরপুরে বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম টেস্ট দেখা যাবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে

গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, এই পিকনিক সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক ধরনের আনকালচার। প্রায় প্রতিটি আয়োজনের আগে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন, ফেসবুকে প্রচারণা, দোকান ও রেস্টুরেন্টসহ নানা জায়গায় পোস্টার সেঁটে খোলা আমন্ত্রণ জানানো হয়। পোস্টারে বড় করে লেখা থাকে, ‘ফ্রি’। উদ্দেশ্য যেন একটাই, কার পিকনিকে কত বেশি লোকসমাগম হলো, তা দেখানো। অনেকেই ধরে নেন, ভিড় যত বড়, প্রভাবও তত বেশি। ফলে পিকনিক যেন আর পিকনিক নেই, হয়ে উঠেছে কমিউনিটির অঘোষিত জনপ্রিয়তা পরীক্ষার মাঠ। অনেকেই মনে করেন, এ এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা।

প্রথমেই আসে ফ্রি পিকনিকের প্রসঙ্গ। অনেক সময় এসব আয়োজন দেখে মনে হয়, এটি পিকনিক নয়, যেন এক ধরনের কাঙালি ভোজের আধুনিক সংস্করণ। যদিও উত্তর আমেরিকায় বাস্তব অর্থে কাঙাল খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবে ফ্রি খাবারের খবর ছড়িয়ে পড়লে ভদ্রবেশী কাঙাল আর সুবেশিনী কাঙালিনীদের অভাব হয় না। তাঁরা তখন দল মত ও রাজনীতির ঊর্ধ্বে ওঠেন, পেশাগত মর্যাদার হিসাব ভুলে যান, আঞ্চলিকতার সীমা অতিক্রম করেন এবং যথাসময়ে যথাস্থানে সগৌরবে উপস্থিত হন।

দাওয়াত লাগে না, রেজিস্ট্রেশন লাগে না, পরিচয় লাগে না, সদস্যপদ লাগে না। শুধু জানা দরকার, কোথায় পিকনিক। এরপর শুরু হয় মানুষের ঢল। কেউ আসে পরিবার নিয়ে, কেউ আসে বন্ধুবান্ধবসহ। তাঁদের অনেকেই সংগঠনের সদস্য নন, আয়োজকদের সঙ্গে তাঁদের তেমন কোনো সম্পর্কও নেই। ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়। লোকজনের ভিড়ে আয়োজনে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, আয়োজকরা হিমশিম খেতে থাকেন, খাবার কম পড়ে। আর অতিথিরা মুখ গম্ভীর করে বলেন, ‘ব্যবস্থাপনা ভালো হয়নি।’ এরপর ফেসবুকে শুরু হয় অভিযোগ, অসন্তোষ আর নানা মন্তব্যে ভরা পোস্টের পালা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পিকনিক স্পন্সর। প্রশ্ন উঠেছে, একটি সংগঠন যদি বছরে একটি পিকনিকের আয়োজন করে, সেখানে স্পন্সর লাগবে কেন? নিয়মমাফিক সংগঠনের সদস্যরা চাঁদা দেবেন, আগ্রহীরা রেজিস্ট্রেশন করবেন, সেই অর্থে পিকনিক হবে, এটাই তো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক সংগঠন পিকনিকের আগেই স্পন্সরের খোঁজে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে শুরু করে। কেউ আবার পোস্টার ও ব্যানারে স্পন্সরের নাম দিয়ে পরে টাকা তুলতে যান। এতে অনেক ব্যবসায়ী বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়েন।

ব্যবসায়ী, রিয়েলটর, মর্টগেজ এজেন্ট, লইয়ার, রাজনীতিবিদ কিংবা বিভিন্ন পেশাজীবীর কাছ থেকে স্পন্সর নিয়ে পিকনিক আয়োজন করলে সংগঠনের কর্মকর্তাদের ওপর এক ধরনের অদৃশ্য অবলিগেশন তৈরি হয়। আজ যাঁর কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হলো, কাল তাঁর ব্যবসায়িক কাজে সহযোগিতা করা, তাঁকে অগ্রাধিকার দেওয়া কিংবা তাঁর প্রতি বিশেষ আনুকূল্য দেখানোর প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে। আবার যাঁরা স্পন্সর করেননি, তাঁদের মধ্যেও ভুল ধারণা জন্ম নিতে পারে যে, সংগঠনের কর্মকর্তারা হয়তো তাঁদের গুরুত্ব দিচ্ছেন না বা পছন্দ করছেন না। এতে কমিউনিটির সম্পর্কের ভেতর অপ্রয়োজনীয় অস্বস্তি ও বিভাজন তৈরি হয়।

এর বাইরে আরেকটি দৃষ্টিকটু বিষয় হলো, পিকনিকের ব্যানার ও পোস্টারে স্পন্সরের অতিরিক্ত উপস্থিতি। অনেক সময় ব্যানার দেখে মনে হয়, এটি কোনো সামাজিক সংগঠনের মিলনমেলা নয়, বরং কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রচারমূলক আয়োজন। কোথাও স্পন্সরের বড় ছবি, কোথাও প্রতিষ্ঠানের নাম, কোথাও ব্যবসায়িক পরিচিতি এমনভাবে তুলে ধরা হয় যে, মূল সংগঠনের পরিচয়ই আড়ালে চলে যায়। এতে সংগঠনের মর্যাদা ও সুনাম ক্ষুণ্ন হয়। কেউ কেউ এমন ধারণাও করেন, সংগঠন বা সংগঠকেরা নিজেদের সদস্যদের অংশগ্রহণে একটি সাধারণ পিকনিক করার সক্ষমতাও রাখেন না। সংশ্লিষ্টদের মতে, পিকনিকের নামে এই স্পন্সরনির্ভর অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।

তৃতীয় বিষয় হলো অতিথি নির্বাচন। কমিউনিটিতে শতাধিক সংগঠন রয়েছে। প্রতিটি সংগঠনের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, উপদেষ্টা, সাবেক সভাপতি, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, আজীবন সদস্য, সম্মানিত অতিথি, বিশেষ অতিথি, প্রধান অতিথি, আমন্ত্রিত অতিথি, শুভাকাঙ্ক্ষী, পৃষ্ঠপোষক, গণ্যমান্য ব্যক্তি, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, পেশাজীবী, সবার হিসাব করলে পিকনিকের জায়গা আর পিকনিকের জন্য থাকে না। শেষ পর্যন্ত দেখা যাবে, অতিথিদের সংখ্যাই হাজারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

এখানে অতিথিদেরও কিছু সামাজিক বোধ থাকা জরুরি। সব জায়গা সবার জন্য নয়। সব অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা সামাজিক মর্যাদার প্রমাণ নয়। কোনো সংগঠনের সদস্য না হয়েও, আয়োজকদের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলেও, শুধু পোস্টার দেখে হাজির হওয়া কোনো গৌরবের বিষয় হতে পারে না। বরং এতে আয়োজকদের কষ্ট বাড়ে, অন্য অতিথির অধিকার নষ্ট হয় এবং নিজেকেও অনেক সময় অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়তে হয়।

কমিউনিটির অভিজ্ঞ সংগঠকদের মতে, প্রথম শর্ত হলো পরিকল্পনা। পিকনিক ফ্রি না করাই ভালো। সংগঠনের সদস্য, তাঁদের পরিবার এবং আগ্রহী অংশগ্রহণকারীদের নির্দিষ্ট ফি দিয়ে রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একক ব্যক্তি, দম্পতি এবং পরিবারের জন্য আলাদা ফি নির্ধারণ করা যেতে পারে। বারো বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ফ্রি রাখা যায়। সিনিয়র সিটিজেনদের জন্যও সম্মানসূচক ফ্রি অংশগ্রহণ রাখা যেতে পারে। এতে একদিকে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আগে থেকে জানা যাবে, অন্যদিকে খাবার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা থাকবে।

দ্বিতীয়ত, স্পন্সর নির্ভরতা কমাতে হবে। সংগঠনের নিজস্ব অর্থ, সদস্যদের চাঁদা এবং রেজিস্ট্রেশন ফি দিয়েই পিকনিক আয়োজনের চেষ্টা করা উচিত। সংগঠনের কারও ব্যক্তিগত সামর্থ্য থাকলে তিনি শিশুদের খেলাধুলার পুরস্কার দিতে পারেন, সিনিয়রদের সম্মাননা দিতে পারেন। কিন্তু সেটি যেন বাণিজ্যিক প্রচারে পরিণত না হয়। পিকনিকের সৌন্দর্য থাকে আন্তরিকতায়, ব্যানারের আকারে নয়।

তৃতীয়ত, আয়োজনকে পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগের মঞ্চ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এলাম, খেলাম, ছবি তুললাম আর গেলাম, এটি সত্যিকারের কোনো পিকনিক নয়। বরং সদস্যদের মধ্যে পরিচিতি, নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ, শিশুদের খেলাধুলা, সিনিয়রদের সঙ্গে আলাপ, নারীদের অংশগ্রহণ, এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। পিকনিকের দিনটি যেন সত্যিকারের মিলনমেলায় পরিণত হয়, সেটিই হওয়া উচিত লক্ষ্য।

শেষ কথা হলো, পিকনিকের সাফল্য মানুষের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। মাপা যায় মানুষের মুখের হাসি দিয়ে, আন্তরিক কথোপকথন দিয়ে, শিশুদের আনন্দ দিয়ে, আয়োজকদের স্বস্তি দিয়ে এবং অতিথিদের সুন্দর স্মৃতি দিয়ে। পিকনিক আনন্দের আয়োজন। প্রবাস জীবনে এ ধরনের আয়োজন মানুষকে কাছে আনে, সম্পর্ককে নবায়ন করে, কমিউনিটির ভেতর সৌহার্দ্যের সেতু তৈরি করে। কিন্তু যে পিকনিকে খাবার আছে অথচ সম্পর্ক নেই, ভিড় আছে অথচ সৌহার্দ্য নেই, ছবি আছে অথচ প্রাণ নেই, সে পিকনিক শেষ পর্যন্ত শুধু প্রদর্শনী হিসেবেই থেকে যায়। আর যে পিকনিকে মানুষ মানুষকে সময় দেয়, পরস্পরের খোঁজখবর নেয়, পরিবার ও প্রজন্মের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে, সেটিই সত্যিকারের কমিউনিটি পিকনিক।


coxsbazarpost

coxsbazarpost

কক্সবাজারের স্থানীয় সাংবাদিকতা ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের বিশ্বস্ত লেখক।

সত্যতা যাচাই: এই সংবাদটি সম্পাদকীয় নীতি অনুসরণ করে বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

সংবাদ কিউআর কোড

নিচের QR কোডটি স্ক্যান করে যেকোনো মোবাইলে সংবাদটি সরাসরি ওপেন করুন।

ফটোকার্ড স্টুডিও

২য় লীড নিউজ
Card Image

পিকনিক যখন কাঙালি ভোজ – DesheBideshe

www.coxsbazarposts.com সত্যের সন্ধানে অনুক্ষণ

প্রিন্ট প্রিভিউ

Logo www.coxsbazarposts.com

পিকনিক যখন কাঙালি ভোজ – DesheBideshe

প্রতিবেদক: প্রতিবেদকের নাম: | প্রকাশিত: রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ০১:১৭ পূর্বাহ্ন
Print Image
[ad_1] কানাডাসহ উত্তর আমেরিকায় এখন পিকনিকের মৌসুম। গ্রীষ্ম এলেই কমিউনিটির ক্যালেন্ডারে যেন নতুন প্রাণ জেগে ওঠে। পার্ক বুকিং, খাবারের মেনু, শিশুদের খেলাধুলা, বড়দের আড্ডা, ছবি তোলা, ফেসবুক পোস্ট, শুভেচ্ছা বক্তব্য, পুরস্কার বিতরণ মিলিয়ে পিকনিক এখানে কেবল একটি বিনোদনমূলক আয়োজন নয়। এটি অনেক সময় হয়ে ওঠে সংগঠনের বার্ষিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার সবচেয়ে বড় মঞ্চ।কোনো কোনো সংগঠনের সারা বছর তেমন কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম না থাকলেও বছরের একটি পিকনিক দিয়েই তারা নিজেদের অস্তিত্বের পতাকা উড়াতে চায়। অনেকের কাছে এই বার্ষিক আয়োজনই যেন সংগঠনের জীবনবৃত্তান্ত, সাংগঠনিক সাফল্যের একমাত্র প্রমাণ। ফলে যে আয়োজনটি হওয়ার কথা ছিল আনন্দ, সৌহার্দ্য ও পারিবারিক মিলনের, সেটি অনেক সময় পরিণত হয় লোকদেখানো প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক প্রভাব প্রদর্শনের এক অদ্ভুত মঞ্চে।গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, এই পিকনিক সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক ধরনের আনকালচার। প্রায় প্রতিটি আয়োজনের আগে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন, ফেসবুকে প্রচারণা, দোকান ও রেস্টুরেন্টসহ নানা জায়গায় পোস্টার সেঁটে খোলা আমন্ত্রণ জানানো হয়। পোস্টারে বড় করে লেখা থাকে, ‘ফ্রি’। উদ্দেশ্য যেন একটাই, কার পিকনিকে কত বেশি লোকসমাগম হলো, তা দেখানো। অনেকেই ধরে নেন, ভিড় যত বড়, প্রভাবও তত বেশি। ফলে পিকনিক যেন আর পিকনিক নেই, হয়ে উঠেছে কমিউনিটির অঘোষিত জনপ্রিয়তা পরীক্ষার মাঠ। অনেকেই মনে করেন, এ এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা।প্রথমেই আসে ফ্রি পিকনিকের প্রসঙ্গ। অনেক সময় এসব আয়োজন দেখে মনে হয়, এটি পিকনিক নয়, যেন এক ধরনের কাঙালি ভোজের আধুনিক সংস্করণ। যদিও উত্তর আমেরিকায় বাস্তব অর্থে কাঙাল খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবে ফ্রি খাবারের খবর ছড়িয়ে পড়লে ভদ্রবেশী কাঙাল আর সুবেশিনী কাঙালিনীদের অভাব হয় না। তাঁরা তখন দল মত ও রাজনীতির ঊর্ধ্বে ওঠেন, পেশাগত মর্যাদার হিসাব ভুলে যান, আঞ্চলিকতার সীমা অতিক্রম করেন এবং যথাসময়ে যথাস্থানে সগৌরবে উপস্থিত হন।দাওয়াত লাগে না, রেজিস্ট্রেশন লাগে না, পরিচয় লাগে না, সদস্যপদ লাগে না। শুধু জানা দরকার, কোথায় পিকনিক। এরপর শুরু হয় মানুষের ঢল। কেউ আসে পরিবার নিয়ে, কেউ আসে বন্ধুবান্ধবসহ। তাঁদের অনেকেই সংগঠনের সদস্য নন, আয়োজকদের সঙ্গে তাঁদের তেমন কোনো সম্পর্কও নেই। ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়। লোকজনের ভিড়ে আয়োজনে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, আয়োজকরা হিমশিম খেতে থাকেন, খাবার কম পড়ে। আর অতিথিরা মুখ গম্ভীর করে বলেন, ‘ব্যবস্থাপনা ভালো হয়নি।’ এরপর ফেসবুকে শুরু হয় অভিযোগ, অসন্তোষ আর নানা মন্তব্যে ভরা পোস্টের পালা।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পিকনিক স্পন্সর। প্রশ্ন উঠেছে, একটি সংগঠন যদি বছরে একটি পিকনিকের আয়োজন করে, সেখানে স্পন্সর লাগবে কেন? নিয়মমাফিক সংগঠনের সদস্যরা চাঁদা দেবেন, আগ্রহীরা রেজিস্ট্রেশন করবেন, সেই অর্থে পিকনিক হবে, এটাই তো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক সংগঠন পিকনিকের আগেই স্পন্সরের খোঁজে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে শুরু করে। কেউ আবার পোস্টার ও ব্যানারে স্পন্সরের নাম দিয়ে পরে টাকা তুলতে যান। এতে অনেক ব্যবসায়ী বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়েন।ব্যবসায়ী, রিয়েলটর, মর্টগেজ এজেন্ট, লইয়ার, রাজনীতিবিদ কিংবা বিভিন্ন পেশাজীবীর কাছ থেকে স্পন্সর নিয়ে পিকনিক আয়োজন করলে সংগঠনের কর্মকর্তাদের ওপর এক ধরনের অদৃশ্য অবলিগেশন তৈরি হয়। আজ যাঁর কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হলো, কাল তাঁর ব্যবসায়িক কাজে সহযোগিতা করা, তাঁকে অগ্রাধিকার দেওয়া কিংবা তাঁর প্রতি বিশেষ আনুকূল্য দেখানোর প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে। আবার যাঁরা স্পন্সর করেননি, তাঁদের মধ্যেও ভুল ধারণা জন্ম নিতে পারে যে, সংগঠনের কর্মকর্তারা হয়তো তাঁদের গুরুত্ব দিচ্ছেন না বা পছন্দ করছেন না। এতে কমিউনিটির সম্পর্কের ভেতর অপ্রয়োজনীয় অস্বস্তি ও বিভাজন তৈরি হয়।এর বাইরে আরেকটি দৃষ্টিকটু বিষয় হলো, পিকনিকের ব্যানার ও পোস্টারে স্পন্সরের অতিরিক্ত উপস্থিতি। অনেক সময় ব্যানার দেখে মনে হয়, এটি কোনো সামাজিক সংগঠনের মিলনমেলা নয়, বরং কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রচারমূলক আয়োজন। কোথাও স্পন্সরের বড় ছবি, কোথাও প্রতিষ্ঠানের নাম, কোথাও ব্যবসায়িক পরিচিতি এমনভাবে তুলে ধরা হয় যে, মূল সংগঠনের পরিচয়ই আড়ালে চলে যায়। এতে সংগঠনের মর্যাদা ও সুনাম ক্ষুণ্ন হয়। কেউ কেউ এমন ধারণাও করেন, সংগঠন বা সংগঠকেরা নিজেদের সদস্যদের অংশগ্রহণে একটি সাধারণ পিকনিক করার সক্ষমতাও রাখেন না। সংশ্লিষ্টদের মতে, পিকনিকের নামে এই স্পন্সরনির্ভর অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।তৃতীয় বিষয় হলো অতিথি নির্বাচন। কমিউনিটিতে শতাধিক সংগঠন রয়েছে। প্রতিটি সংগঠনের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, উপদেষ্টা, সাবেক সভাপতি, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, আজীবন সদস্য, সম্মানিত অতিথি, বিশেষ অতিথি, প্রধান অতিথি, আমন্ত্রিত অতিথি, শুভাকাঙ্ক্ষী, পৃষ্ঠপোষক, গণ্যমান্য ব্যক্তি, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, পেশাজীবী, সবার হিসাব করলে পিকনিকের জায়গা আর পিকনিকের জন্য থাকে না। শেষ পর্যন্ত দেখা যাবে, অতিথিদের সংখ্যাই হাজারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।এখানে অতিথিদেরও কিছু সামাজিক বোধ থাকা জরুরি। সব জায়গা সবার জন্য নয়। সব অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা সামাজিক মর্যাদার প্রমাণ নয়। কোনো সংগঠনের সদস্য না হয়েও, আয়োজকদের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলেও, শুধু পোস্টার দেখে হাজির হওয়া কোনো গৌরবের বিষয় হতে পারে না। বরং এতে আয়োজকদের কষ্ট বাড়ে, অন্য অতিথির অধিকার নষ্ট হয় এবং নিজেকেও অনেক সময় অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়তে হয়।কমিউনিটির অভিজ্ঞ সংগঠকদের মতে, প্রথম শর্ত হলো পরিকল্পনা। পিকনিক ফ্রি না করাই ভালো। সংগঠনের সদস্য, তাঁদের পরিবার এবং আগ্রহী অংশগ্রহণকারীদের নির্দিষ্ট ফি দিয়ে রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একক ব্যক্তি, দম্পতি এবং পরিবারের জন্য আলাদা ফি নির্ধারণ করা যেতে পারে। বারো বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ফ্রি রাখা যায়। সিনিয়র সিটিজেনদের জন্যও সম্মানসূচক ফ্রি অংশগ্রহণ রাখা যেতে পারে। এতে একদিকে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আগে থেকে জানা যাবে, অন্যদিকে খাবার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা থাকবে।দ্বিতীয়ত, স্পন্সর নির্ভরতা কমাতে হবে। সংগঠনের নিজস্ব অর্থ, সদস্যদের চাঁদা এবং রেজিস্ট্রেশন ফি দিয়েই পিকনিক আয়োজনের চেষ্টা করা উচিত। সংগঠনের কারও ব্যক্তিগত সামর্থ্য থাকলে তিনি শিশুদের খেলাধুলার পুরস্কার দিতে পারেন, সিনিয়রদের সম্মাননা দিতে পারেন। কিন্তু সেটি যেন বাণিজ্যিক প্রচারে পরিণত না হয়। পিকনিকের সৌন্দর্য থাকে আন্তরিকতায়, ব্যানারের আকারে নয়।তৃতীয়ত, আয়োজনকে পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগের মঞ্চ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এলাম, খেলাম, ছবি তুললাম আর গেলাম, এটি সত্যিকারের কোনো পিকনিক নয়। বরং সদস্যদের মধ্যে পরিচিতি, নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ, শিশুদের খেলাধুলা, সিনিয়রদের সঙ্গে আলাপ, নারীদের অংশগ্রহণ, এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। পিকনিকের দিনটি যেন সত্যিকারের মিলনমেলায় পরিণত হয়, সেটিই হওয়া উচিত লক্ষ্য।শেষ কথা হলো, পিকনিকের সাফল্য মানুষের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। মাপা যায় মানুষের মুখের হাসি দিয়ে, আন্তরিক কথোপকথন দিয়ে, শিশুদের আনন্দ দিয়ে, আয়োজকদের স্বস্তি দিয়ে এবং অতিথিদের সুন্দর স্মৃতি দিয়ে। পিকনিক আনন্দের আয়োজন। প্রবাস জীবনে এ ধরনের আয়োজন মানুষকে কাছে আনে, সম্পর্ককে নবায়ন করে, কমিউনিটির ভেতর সৌহার্দ্যের সেতু তৈরি করে। কিন্তু যে পিকনিকে খাবার আছে অথচ সম্পর্ক নেই, ভিড় আছে অথচ সৌহার্দ্য নেই, ছবি আছে অথচ প্রাণ নেই, সে পিকনিক শেষ পর্যন্ত শুধু প্রদর্শনী হিসেবেই থেকে যায়। আর যে পিকনিকে মানুষ মানুষকে সময় দেয়, পরস্পরের খোঁজখবর নেয়, পরিবার ও প্রজন্মের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে, সেটিই সত্যিকারের কমিউনিটি পিকনিক। [ad_2]

ডাইরেক্ট মেসেজ

Telegram Direct Message WhatsApp Direct Message

বাংলা ফন্ট কনভার্টার (বিজয় ⇄ ইউনিকোড)

×

তথ্য

×