মধ্যপ্রাচ্য, ১৭ মার্চ – মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। মঙ্গলবার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেন যে লারিজানি নিহত হয়েছেন।
তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ এখনো তার মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির তুলনায় লারিজানি অনেক বেশি দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করছিলেন। মোজতবা খামেনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাকে জনসমক্ষে খুব একটা দেখা যায়নি। অন্যদিকে গত সপ্তাহে তেহরানে সরকারপন্থী এক সমাবেশে লারিজানিকে জনতার সঙ্গে হাঁটতে দেখা যায়। এই ঘটনাটিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার মৃত্যু নিশ্চিত হলে তা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য একটি বড় ধাক্কা হবে।
হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন ধ্বংসের দাবি ইরানের
এর ফলে এমন এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে হারানো হবে যিনি আদর্শিক অবস্থান এবং কূটনৈতিক দক্ষতার মধ্যে চমৎকার ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম ছিলেন। আদর্শিক আনুগত্য এবং বাস্তবধর্মী রাষ্ট্র পরিচালনার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে দক্ষ লারিজানি যুদ্ধের আগে ইরানের পারমাণবিক নীতি ও কৌশলগত কূটনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। চশমা পরিহিত এবং সংযত বক্তব্যের জন্য পরিচিত ৬৮ বছর বয়সী লারিজানি দীর্ঘ সামরিক, গণমাধ্যম ও আইনসভা জীবনের কারণে প্রয়াত খামেনির অত্যন্ত আস্থাভাজন হিসেবে বিবেচিত হতেন।
২০২৫ সালে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আগের যুদ্ধের পর তাকে ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রায় দুই দশক আগে তিনি এই পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এই পদে থেকে তিনি প্রতিরক্ষা কৌশল সমন্বয় এবং পারমাণবিক নীতি তদারকি করতেন। পরবর্তীতে তিনি কূটনৈতিক অঙ্গনেও বেশ সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তেহরান যখন সতর্কভাবে পারমাণবিক আলোচনা চালাচ্ছিল তখন তিনি ওমান ও কাতারের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো সফর করেন যা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের কারণে ভেস্তে যায়।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্প পরিচালক আলি ভায়েজ যুদ্ধ শুরুর আগে বলেছিলেন যে লারিজানি একজন প্রকৃত অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিত্ব এবং কৌশলী পরিচালনাকারী। তিনি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কার্যপ্রণালী সম্পর্কে খুব ভালোভাবে অবগত। ১৯৫৭ সালে ইরাকের নাজাফে জন্ম নেওয়া লারিজানি এমন এক প্রভাবশালী শিয়া আলেম পরিবারের সদস্য যাদের ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের প্রভাব রয়েছে। তার বাবা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনির ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তার পরিবারের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও তারা সবসময় তা অস্বীকার করেছেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে তার পুনরাগমন তার এমন একটি ভাবমূর্তির প্রতিফলন যেখানে তিনি আদর্শিক অবস্থান বজায় রেখেও বাস্তববাদী নীতি গ্রহণ করতে সক্ষম একজন রক্ষণশীল নেতা হিসেবে পরিচিত। লারিজানি ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তিকে সমর্থন করেছিলেন যা তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরে দাঁড়ানোর ফলে ভেঙে পড়ে।
২০২৫ সালের মার্চে তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন যে দীর্ঘস্থায়ী বাহ্যিক চাপ ইরানের পারমাণবিক অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তিনি বলেছিলেন যে তারা পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে এগোচ্ছেন না। তবে ইরানের পারমাণবিক ইস্যুতে ভুল কিছু করা হলে তা তাদের সেই দিকে যেতে বাধ্য করবে কারণ আত্মরক্ষার জন্য তা প্রয়োজন হয়ে উঠবে। লারিজানি বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা শুধু পারমাণবিক বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত।
পাশাপাশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে তিনি ইরানের সার্বভৌম অধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন। যুক্তরাষ্ট্র জানুয়ারি মাসে দেশব্যাপী বিক্ষোভ দমনে সহিংস দমন পীড়নের অভিযোগে যেসব কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে লারিজানি তাদের মধ্যে একজন ছিলেন।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শুরু হওয়া ওই বিক্ষোভে সরকারি কঠোর দমন পীড়নে হাজারো মানুষ নিহত হয় বলে বিভিন্ন অধিকার সংগঠন জানিয়েছে। লারিজানি স্বীকার করেছিলেন যে অর্থনৈতিক চাপ বিক্ষোভের অন্যতম কারণ ছিল। তবে পরবর্তীকালে হওয়া সহিংসতার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের বহিরাগত সম্পৃক্ততাকে দায়ী করেন।




মন্তব্য করুন