২৯ অক্টোবর ২০২৫, সময়টা সন্ধ্যা ছয়টা ত্রিশ। কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমিন চৌধুরী তখন অফিসে নিত্যদিনের মতো ব্যস্ত। হঠাৎ তার কক্ষে ঢুকে পড়লেন এক অফিস সহকারী, সঙ্গে খালি পায়ে সবুজ জামা পরা এক ছোট্ট মেয়ে। সহকারী জানালেন, “একজন লোক মেয়েটিকে অফিসে দিয়ে গেছে— বলেছে বাস টার্মিনাল থেকে পেয়েছে, নাকি হারিয়ে গেছে।”
চোখেমুখে ভয়, কণ্ঠে অসহায় কাঁপুনি— মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ইউএনও নিলুফা বুঝলেন, কোনো মায়ের বুক আজ খালি হয়ে গেছে। মেয়েটিকে কোলে টেনে নিয়ে ধীরে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার নাম কী?” শিশুটি কান্নাভেজা কণ্ঠে বলল, “আমার নাম মরিয়ম, বয়স আট বছর। চোখে ভালো দেখি না। মাদ্রাসায় থাকি, সেখানেই পড়ি। আজ হঠাৎ ছুটি দিলে মা আসতে পারেনি। এক লোক বলেছিল আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে, সে-ই আমাকে বাস টার্মিনালে নিয়ে আসে। এরপর কিছুই মনে নেই, শুধু জানি— আমি পথ হারিয়েছি।”
মরিয়ম জানায়, তার বাবা মারা গেছেন অনেক আগেই। জন্মদাত্রী মা অন্ধ, বড় ভাইও দৃষ্টিহীন। একমাত্র বোন চোখে দেখে, অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে, রান্না করে সংসার সামলায়। সরকার তাদের একটি ঘর দিয়েছে, গত শীতে কম্বলও পেয়েছে তারা। মা অন্ধ ভাতা পান— এমন আরও টুকরো তথ্যের ভেতর দিয়ে শিশুটির জীবনের কষ্টগাঁথা ফুটে ওঠে।
শিশুটির কথা শুনে ইউএনও নিলুফা সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ করেন ঈদগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিমল চাকমার সঙ্গে। একই সঙ্গে সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকেও নির্দেশ দেন অন্ধ ও প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীদের তথ্যভান্ডারে মরিয়মের পরিবার খুঁজে বের করতে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে জানা যায়— মরিয়মের বাড়ি ঈদগাঁও উপজেলার পোকখালী এলাকায়। খবর পেয়ে মেয়েকে হারিয়ে পাগলপ্রায় মা গ্রাম পুলিশ ও এক প্রতিবেশীকে সঙ্গে নিয়ে রাতেই রওনা দেন কক্সবাজারের পথে।
অস্কারজয়ী চিলিয়ান চলচ্চিত্র নির্মাতা সেবাস্তিয়ান লেলিও আর নেই
অফিসের ভেতর ছোট্ট মেয়েটির ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ইউএনও নিলুফার মনে অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করে। মরিয়ম তাকে জানায়, “আমি জন্মান্ধ না আপা, ছোটবেলায় ভালোই দেখতাম, কিন্তু টাকার অভাবে কখনও ডাক্তার দেখানো হয়নি।” সেই কথাগুলো যেন ইউএনওর হৃদয়ে দাগ কেটে যায়। মনে হল, হয়তো আল্লাহ তাকে মরিয়মের জীবনে কিছু আলো ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যই পাঠিয়েছেন।
তাৎক্ষণিকভাবে তিনি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাসেল, সমাজকর্মী সুজন ও কমিউনিটি চক্ষু হাসপাতালের ডা. বিমল চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মানবিক ডা. বিমল তখনই বিনা ফিতে শিশুটির চোখ পরীক্ষা করে চশমা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেন। চশমা পরে ছোট্ট মরিয়মের মুখে ফুটে ওঠে হাসি। সে বলে, “এখন আগের চেয়ে কিছুটা ভালো দেখি।” সেই হাসি যেন মুহূর্তেই আলোকিত করে তোলে পুরো ঘরটাকে।
চিকিৎসা শেষে ইউএনও নিলুফা তাকে নিয়ে যান মার্কেটে। খালি পায়ের সেই মেয়েটির জন্য কেনা হয় সবুজ আর খয়েরি রঙের নতুন জুতো। পথে যেতে যেতে নিলুফা জানতে চান, “তোমার প্রিয় রঙ কী?” মেয়েটি চোখে মায়া ভরে বলে, “হলুদ।” কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই মিষ্টি হেসে জানায় নিজের স্বপ্ন— “আমি লাল পরী হতে চাই, লাল জামা, লাল চুড়ি, লাল লিপস্টিক আর লাল ওড়না লাগবে।”
তার সেই শিশুসুলভ ইচ্ছা পূরণে ইউএনও নিলুফা ও সহকর্মীরা নিয়ে যান তাকে মেগামার্ট শপিং মলে। বিশাল দোকান আর সারি সারি পোশাক দেখে অবাক হয়ে মরিয়ম বলে ওঠে, “এরা এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে কেমন করে?” পুতুলসাজা ম্যানিকুইনগুলোকে ছুঁয়ে দেখে বিস্ময়ে ভরে যায় তার মুখ। অবশেষে পছন্দ হয় এক লাল ফ্রক, লাল চুড়ি, লাল ওড়না, লাল লিপস্টিক— সত্যি সত্যিই যেন হয়ে ওঠে সে এক লাল পরী।
এর কিছুক্ষণ পরেই তার মা, বোন, গ্রাম পুলিশ ও এক প্রতিবেশী পৌঁছে যান ইউএনও অফিসে। মেয়েকে দেখেই অন্ধ মা হাত বাড়িয়ে দেন, আর মরিয়ম ছুটে গিয়ে মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অন্ধ চোখে মায়ের তখন আনন্দাশ্রু, মুখে অপরিসীম তৃপ্তির হাসি। মরিয়ম বলে, “আপা, এখন আমি আগের চেয়ে ভালো দেখি, তবে পুরোপুরি না।” তারপর গর্বভরে মাকে দেখায় তার লাল জামা, সবুজ জুতো— জানায়, হলুদ জামাটা আর খয়েরি জুতাটা পরের ঈদের জন্য রেখে দেবে। মা-মেয়ের সেই পুনর্মিলনে উপস্থিত সবার চোখেই তখন জল।
বিদায়ের সময় মরিয়ম সারাক্ষণ ইউএনও নিলুফার হাত ধরে ছিল। ইউএনওর সরকারি গাড়ীতে উঠতে গিয়ে মরিয়ম হেসে বলল, “আপা, এই গাড়িটার রংও আমার জামার মতো লাল! একটা ছবি তুলবেন?” সেই মুহূর্তে যেন রাতের আকাশও একটু বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
রাত দশটায় লাল পরী মরিয়ম রওনা দিল ঘরের পথে— অন্ধ মায়ের কোলে ফিরে, চোখে নতুন আলো নিয়ে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান পরে মরিয়ম ও তার পরিবারের খবর নেন এবং সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
হারিয়ে যাওয়া এক শিশুর ঘরে ফেরা, তার চোখে আলো ফিরে আসা, আর এক প্রশাসকের মমতায় মানবতার পুনর্জাগরণ— “লাল পরী” মরিয়মের এই গল্প যেন মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীতে এখনো মানুষ আছে, আছে ভালোবাসা, আছে আলো।
#




মন্তব্য করুন