হোম ট্রেন্ডিং লাইভ অনুসন্ধান মেনু
প্রতি মুর্হুতের কক্সবাজারকে জানুন
🔔 নোটিফিকেশন সাবস্ক্রিপশন ×
🔔

নতুন খবর সবার আগে আপনার ফোনে পান!

কানাডায় বাংলাদেশি সিপিএ ও ট্যাক্স অ্যাডভাইজারদের কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারের গোপন চক্র

প্রতিবেদকের নাম:

প্রতিবেদকের নাম:

বৃহস্পতিবার, ২৮ আগস্ট ২০২৫, ০৮:২২ অপরাহ্ন


উন্নততর সুশাসন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতীক কানাডা অভিবাসীদের জন্য এক প্রত্যাশার দেশ। প্রতি বছর হাজারো অভিবাসী আসেন এই দেশে নতুন জীবন গড়ার উদ্দেশ্যে। তাদের অনেকেই সৎ পথে এগিয়ে চলেন, আবার কেউ কেউ স্বপ্নের নামে ধোঁকা ও প্রতারণার আশ্রয় নেন।

এই প্রতারণার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে কিছু অসাধু চার্টার্ড প্রফেশনাল অ্যাকাউন্ট্যান্ট (CPA) ও ট্যাক্স পরামর্শকরা। বিশেষত বাংলাদেশি, ভারতীয় ও পাকিস্তানি পেশাদারদের মধ্যে এই প্রবণতা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

আরও পড়ুন

জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি ঐক্য: অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে এনসিপি ছেড়েছেন তাসনিম জারা, তাজনূভা ও সামান্তা শারমিন

এসব অপরাধীরা সাধারণত উচ্চশিক্ষিত, স্মার্ট এবং দক্ষ পেশাদার। তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান ভাল হলেও অর্থলিপ্সা, লোভ ও দ্রুত অর্থ আয়ের আকাঙ্ক্ষা তাদের অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। তারা নিজেদের দক্ষতা ব্যবহার করে, ক্লায়েন্টদের অবৈধভাবে কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারে সাহায্য করেন।

এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনার সময় তারা সতর্ক এবং অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে আইন এড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কারণে তাদের অনেকেই আজকাল ধরা পড়ছেন।

এই গল্প তাদের নিয়েই—যারা চার্টার্ড প্রফেশনাল অ্যাকাউন্ট্যান্ট (CPA) কিংবা ট্যাক্স অ্যাডভাইজারের খোলসে থেকে কানাডার আর্থিক ব্যবস্থায় বিষ ঢালছিলেন। CPA Canada, CRA, RCMP এবং FINTRAC-এর দীর্ঘমেয়াদী এক যৌথ তদন্তের পর বেরিয়ে এসেছে ট্যাক্স ফ্রড ও মানি লন্ডারিংয়ের বিস্ময়কর সব গল্প।

প্রথমে বিষয়টি খুব গুরুত্ব না পেলেও পরবর্তীতে CRA-এর অ্যানালিটিক্স টুলে দেখা যায় একটি অস্বাভাবিক প্যাটার্ন: একই ঠিকানা, একই ব্যাংক, একই IP-থেকে পাঠানো বহু ট্যাক্স রিটার্ন। CRA কর্মকর্তারা পরবর্তীতে একে ‘Ghost Consultant Syndicate’ নাম দেন। তদন্তে যুক্ত হয় CPA Canada-এর ডিসিপ্লিনারি ইউনিট, FINTRAC-এর সাসপিশাস রিপোর্টিং ডিপার্টমেন্ট এবং পরবর্তীতে আরসিএমপি-এর ইকোনমিক ক্রাইম ইউনিট।

তারা তৈরি করেন এক ‘কনসালটেন্ট ম্যাপ’, যেখানে দেখানো হয়—প্রতিটি অপরাধী ট্যাক্স অ্যাডভাইজার বা CPA কাদের সাথে যুক্ত, কোন কোন রিয়েল এস্টেট ট্রানজেকশনে তারা যুক্ত ছিলেন, কতটি ভুয়া ইনভয়েস তৈরি হয়েছে, এবং কোন কোন অ্যাকাউন্টে গিয়ে শেষ হয়েছে সেই অর্থ। সেই ম্যাপের কেন্দ্রে ছিল কিছু পরিচিত নাম।

জাহাঙ্গির হোসেন, CPA। সাদা ফাইল ফোল্ডার হাতে, মুখে মৃদু হাসি। বাহ্যিকভাবে একজন নিরীহ, ভদ্র, পেশাদার হিসেবেই চেনা যেত তাঁকে। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল কর ফাঁকির এক নিখুঁত কারিগর। টরন্টোতে গত ছয় বছর ধরে অভিবাসীদের ট্যাক্স রিটার্নে ‘আদর্শ পরামর্শদাতা’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু CRA’র অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, তার ২০০টিরও বেশি ক্লায়েন্ট একাধিক ভুয়া নির্ভরশীল দেখিয়ে Canada Workers Benefit এবং GST রিফান্ড তুলেছেন।

FINTRAC তার কয়েকটি ক্লায়েন্টের অ্যাকাউন্টে হঠাৎ করে বড় অঙ্কের ক্যাশ ডিপোজিট দেখে রিপোর্ট করে। জাহাঙ্গির হোসেনকে গোপনে অনুসরণ করা হয় ৩ মাস। অবশেষে, তার অফিসে হানা দিয়ে জব্দ করা হয় তিনটি ভিন্ন QuickBooks ডাটাবেস—একটি CRA-র জন্য, একটি ক্লায়েন্টের জন্য, আর একটি শুধুই নিজের জন্য। CPA Ontario তার লাইসেন্স স্থগিত করে, এবং CRA $৫০,০০০ ডলার জরিমানা করে।

অভিযোগ, তিনি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়ন্ত্রিত সরকারি অর্থায়ন কর্মসূচি Ontario Student Assistance Program (OSAP)–এর অর্থ প্রাপ্তিতে জালিয়াতির আশ্রয় নেন। বহু শিক্ষার্থী—বিশেষত নতুন এসেই আর্থিক অনিশ্চয়তায় থাকা বাংলাদেশি, ভারতীয় ও পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের—তিনি পরামর্শ দিতেন কীভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে OSAP-এর আওতায় বড় অঙ্কের অর্থ আদায় করা যায়।

তার কৌশলের মূল ভিত্তি ছিল মিথ্যা ইনকাম ডিক্লারেশন, ভুয়া বসবাসের ঠিকানা, ও সাজানো ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট। এই পদ্ধতিতে তিনি অন্তত ৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন, যেখানে প্রত্যেকের নামে গড়ে $১৫,০০০ থেকে $২৫,০০০ পর্যন্ত অনুদান ও ঋণ মঞ্জুর হয়। ধারণা করা হয়, পুরো স্কিমের মাধ্যমে প্রায় $৯ লাখ পর্যন্ত সরকারি অর্থ আত্মসাৎ হয়।

এই ঘটনায় OSAP, CRA ও CPA Ontario তিনটি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। এর ফলস্বরূপ: রতন তালুকদারের CPA লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়; তার সমস্ত ক্লায়েন্ট ফাইল পর্যালোচনার আওতায় আসে; কমপক্ষে ১২ জন শিক্ষার্থীর অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য করা হয়; কানাডার উচ্চশিক্ষা খাতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের প্রতি নৈতিক সন্দেহ ও প্রশাসনিক কড়াকড়ি বেড়ে যায়।

আব্দুল মান্নান, CPA। ভ্যাঙ্কুভারে বসে বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রতারিত রিফান্ড স্কিমে তার ভূমিকা ছিল নাট্যকারের মতো। টেমপ্লেট ব্যবহার করে বানানো টিউশন রিসিট, কলেজের স্ট্যাম্প ইম্প্রেশন, আর একই ফন্টে তৈরি রেজিস্ট্রেশন ফর্ম—সবকিছুই যেন কারখানার উৎপাদন।

CRA-এর অ্যান্টি-ফ্রড টিম এক শিক্ষার্থীর ফর্মে সন্দেহজনক QR কোড স্ক্যান করে দেখেন তা ভুয়া ওয়েবসাইটে নিয়ে যায়। পরে FINTRAC-এর তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, আব্দুল মান্নানের ক্লায়েন্টদের একটি অংশ বাংলাদেশ, ভারত ও নাইজেরিয়ার ‘ফেইক ইউনিভার্সিটি’ থেকে আসা। CPA British Columbia তার লাইসেন্স বাতিল করে, এবং CRA শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে রিফান্ড ফেরত ও ১০০% জরিমানা ধার্য করে।

মোহাম্মদ হাসান, CPA। মনট্রিয়লে রেস্টুরেন্ট ব্যবসার আড়ালে ক্যাশ লেনদেন গোপন করার কারিগর নামে পরিচিত। প্রতিটি ব্যবসার জন্য তিনি বানাতেন দুটি হিসাব বই—একটি CRA-এর সামনে পেশ করার জন্য, অন্যটি বাস্তব লেনদেনের।

RCMP-এর ফোরেনসিক অডিট টিম ‘POS system’-এর লগ ডেটা চেক করে তার হিসাবের ফাঁকফোকর বের করে। CPA Quebec লাইসেন্স বাতিল করে এবং আদালতের নির্দেশে তার অংশীদার ব্যবসার মালিকরা $৭৫০,০০০ ডলার জরিমানা ও ব্যাক ট্যাক্স দিতে বাধ্য হন।

আরিফ খান। অফশোর হ্যাভেন ব্যবহারের ক্ষেত্রে তার পদ্ধতি ছিল সফিস্টিকেটেড। বাহামা ও দুবাইয়ের শেল কোম্পানির মাধ্যমে $৩.৭ মিলিয়ন ডলার কানাডার বাইরে স্থানান্তর করেন। তিনি ক্লায়েন্টদের অফশোর ট্রাস্ট ফান্ড খোলার পরামর্শ দিতেন, যেখানে Beneficiary থাকত তার পরিবারেরই সদস্য।

CRA-এর “Project Octavia” তাকে টার্গেট করে। FINTRAC ও RCMP-এর যৌথ হানায় তার টরন্টো অফিস থেকে উদ্ধার করা হয় বাহামার একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট, জাল কর্পোরেট সিল, ও ক্রিপ্টোকারেন্সির পেমেন্ট রশিদ।

সুমন দাস। তিনি কখনো CPA ছিলেন না, কিন্তু টরন্টোর সকলেই তাকে “ট্যাক্স অ্যাডভাইজার” হিসেবে চিনে। ভুয়া RRSP কন্ট্রিবিউশনের রেকর্ড দেখিয়ে তিনি ২০ জন ক্লায়েন্টের $৫০০,০০০ ডলার রিফান্ড আদায়ে সহায়তা করেন।

CRA একটি ক্লায়েন্টের রিটার্ন যাচাই করতে গিয়ে বিষয়টি ধরে ফেলে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, RRSP রেকর্ড আসলে গ্রাফিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে তৈরি করা জাল নথিপত্র। আদালত তাকে ১৮ মাসের কারাদণ্ড দেয় এবং আজীবন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় ট্যাক্স পরামর্শ সেবা প্রদানে।

বাংলাদেশ থেকে লুট করা টাকাকে বৈধ করার সহায়তায় কানাডায় কিছু বাংলাদেশি ধূর্ত অ্যাকাউন্টেন্টকে বাহাদুরি করতে দেখা যায়। ড্রাইভওয়েতে পার্ক করে রাখা শাইনিং Porsche Cayenne, লাক্সারিয়াস বাড়ি, কমিউনিটির ইভেন্টে স্পনসরশিপের ব্যানারে তাদের নাম জ্বলজ্বলে অক্ষরে লেখা থাকে। অথচ এই সব বাহ্যিক চাকচিক্যের পেছনে ছায়া ফেলে থাকে এক গাঢ় অন্ধকার—একটি লুণ্ঠিত ইতিহাস, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া কোটি কোটি টাকার গল্প।

এই দেশে, যেখানে আইন ও শুদ্ধতার গৌরব নিয়ে অভিবাসীরা ঘর বানাতে চান, সেখানে কিছু সিপিএ ও ফিনান্সিয়াল অ্যাডভাইজার নিজেদের প্রফেশনাল পরিচয়ের আড়ালে মেতে উঠেছেন এক মারাত্মক খেলায়—বাংলাদেশের দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতি ও ব্যবসা থেকে আসা কালো টাকা ‘সাদা’ করে ফেলার প্রতারণামূলক এক অর্থনৈতিক নাটকে। তারা যেন ধুয়ে দেন অপরের পাপ, আর সেই জলে নিজেদের আয়নার গায়ে লাগিয়ে নেন এক ধূর্ত ‘সফলতা’র ছাপ।

এই মানি লন্ডারিং কোনো থ্রিলার সিনেমার চিত্রনাট্য নয়; বরং এটি বাস্তব জীবনের এক নির্মম এবং কুৎসিত সত্য, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে জড়িয়ে আছে হিসাবের সূক্ষ্ম কারসাজি, ভুয়া ডকুমেন্টেশনের কারিগরি কৌশল, অসাধু রিয়েলটর, ধান্দাবাজ মর্টগেজ এজেন্ট, এবং ধুরন্ধর আইনজীবীদের অংশগ্রহণ।

একটি সমন্বিত সিন্ডিকেট—যাদের লক্ষ্য একটাই: বাংলাদেশ থেকে লুট করা সম্পদকে কানাডার আর্থিক ব্যবস্থার নিরাপদ আশ্রয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া, যেন কেউ কখনও প্রশ্ন না তোলে, কোথা থেকে এলো এই অস্বাভাবিক সমৃদ্ধি।

তারা একেকজন একেক পথ বেছে নেন, কিন্তু লক্ষ্য একটাই—কালো টাকা যেন কানাডার অর্থনীতির স্বচ্ছ জলে মিশে যায়। এই প্রক্রিয়ায় তারা ব্যবহার করেন কিছু নির্দিষ্ট ও চেনা পদ্ধতি:

যেমন- রিয়েল এস্টেটের মূল্য বাড়িয়ে দেখানো (Overvaluation): স্বল্পমূল্যের সম্পত্তিকে উচ্চমূল্যে দেখিয়ে বৈধ বিনিয়োগ প্রমাণ করার চেষ্টা—এটাই এখন সবচেয়ে পরিচিত মানি লন্ডারিং কৌশল।

শেল কোম্পানি ও ভুয়া ইনভয়েস তৈরি: অস্তিত্বহীন কোম্পানির নামে জাল রপ্তানি বা সেবার বিল তৈরি করে বৈদেশিক লেনদেন বৈধ দেখানো।

ক্রিপ্টোকারেন্সির সাহায্যে ট্রান্সফার: দুবাই, সিঙ্গাপুর বা মাল্টার এক্সচেঞ্জে বিটকয়েন বা ইউএসডিটি কেনা, পরে কানাডায় রূপান্তর।

ইনভেস্টমেন্ট ভিসা প্রোগ্রাম অপব্যবহার: মিথ্যা নেট ওয়ার্থ সনদ দেখিয়ে সরকারি বিনিয়োগ স্কিমে অংশগ্রহণ, যেখানে মূল টাকাটিই দুর্নীতির।

এই মহাপরিকল্পনার কেন্দ্রে ছিলেন তিনজন বাংলাদেশি পেশাজীবী—তিন কৌশলের, কিন্তু একই লক্ষ্যের যাত্রী।

অভিনব ঋণ ফাঁদের জনক আহমেদ কবির। টরন্টোর এক অভিজাত এলাকায় তার অফিস। বাইরে থেকে একজন সফল কর পরামর্শক—কিন্তু FINTRAC-এর একটি রিপোর্ট ফাঁস করল তার আসল পরিচয়। তিনি তার ২০ জন বাংলাদেশি ক্লায়েন্টের জন্য ফেক লোন এগ্রিমেন্ট তৈরি করে সেই টাকাকে ‘পরিবারের ঋণ’ হিসেবে দেখান। এই কৌশলে প্রায় $২.৩ মিলিয়ন কালো টাকা রিয়েল এস্টেটে ঢুকে পড়ে।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, অধিকাংশ ‘ঋণদাতা’ ব্যক্তি বাংলাদেশে সরকারের নজরদারিতে থাকা ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও সাবেক আমলা। এই ঘটনার তদন্তে সংশ্লিষ্ট রিয়েল এস্টেট ফার্ম ও CPA-র ৪০টির বেশি লেনদেন রিভিউয়ের আওতায় আসে। শেষ পর্যন্ত CRA আহমেদ কবিরের সব ফাইল সাসপিশাস হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তার লাইসেন্স বাতিল করে।

জাল রপ্তানির কারিগর নাজমুল হাসান। অত্যন্ত সুপরিচিত একজন ACCA সার্টিফায়েড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি একটি শেল কোম্পানির মাধ্যমে $৫ মিলিয়ন টাকার ইনভয়েস ম্যানিপুলেশন করেন। কাগজে দেখানো হয় কানাডায় “টেক্সটাইল ও লেদার” পণ্য রপ্তানি হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে কোনো পণ্য আদান-প্রদান হয়নি।

এই জাল লেনদেন ব্যাংক হয়ে এসে বিনিয়োগে রূপ নেয়। RCMP-র তদন্তে বিষয়টি সামনে আসে। FINTRAC এই লেনদেন শনাক্ত করে, যার ফলে নাজমুলের লাইসেন্স স্থগিত হয় এবং পাঁচজন কর্পোরেট ক্লায়েন্টের ওপর তদন্ত শুরু হয়।

আশিক চৌধুরি। তিনি কাজ করতেন মূলত হাই-প্রোফাইল ক্লায়েন্টদের সঙ্গে। একদিন তার ক্লায়েন্ট লিস্টে দেখা গেল এক প্রাক্তন বাংলাদেশি মন্ত্রী, যিনি দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত। FINTRAC-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, আশিক একটি $১.৮ মিলিয়ন লেনদেন ইনভেস্টমেন্ট ভিসা প্রোগ্রাম-এর আওতায় বৈধ করেন, যেখানে টাকাটি আসলে এসেছিল বাহ্যিকভাবে একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির বিনিয়োগের নামে। কিন্তু সেই কোম্পানির অস্তিত্ব বাস্তবে ছিল না।

CSIS নজরদারিতে রাখে পুরো নেটওয়ার্ককে, এবং টরন্টোতে তার অ্যাসেটগুলো ফ্রিজ করে। কানাডার ইমিগ্রেশন অফিস তদন্ত শুরু করে এবং ওই ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামের ওপর নীতিমালা কঠোর করা হয়।

এই ঘটনাগুলো শুধু কয়েকজনের ব্যক্তিগত লাভের কাহিনি নয়—এগুলো প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের সম্পদ লুণ্ঠনের রক্তাক্ত ছায়া, যা আজ আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে কানাডিয়ান সমাজে ঢুকে পড়েছে। এরা শুধু অপরাধী নয়, এরা লুটেরাদের সহযাত্রী, যারা বিশ্বাস আর সিস্টেম—উভয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।

দ্রষ্টব্য (Footnote):
এই প্রতিবেদনের সব তথ্য বাস্তব তদন্তপ্রসূত হলেও আইনি ও নৈতিক কারণে নাম ও পরিচয় আংশিক পরিবর্তিত।

তথ্যসূত্র:
CPA Canada Annual Compliance Reports (২০২০–২০২৩)
FINTRAC Annual Reports
CRA Enforcement & Risk Analytics
RCMP Project Octavia Files
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: Globe and Mail, Financial Post, CBC News


coxsbazarpost

coxsbazarpost

কক্সবাজারের স্থানীয় সাংবাদিকতা ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের বিশ্বস্ত লেখক।

সত্যতা যাচাই: এই সংবাদটি সম্পাদকীয় নীতি অনুসরণ করে বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

সংবাদ কিউআর কোড

নিচের QR কোডটি স্ক্যান করে যেকোনো মোবাইলে সংবাদটি সরাসরি ওপেন করুন।

ফটোকার্ড স্টুডিও

২য় লীড নিউজ
Card Image

কানাডায় বাংলাদেশি সিপিএ ও ট্যাক্স অ্যাডভাইজারদের কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারের গোপন চক্র

www.coxsbazarposts.com সত্যের সন্ধানে অনুক্ষণ

প্রিন্ট প্রিভিউ

Logo www.coxsbazarposts.com

কানাডায় বাংলাদেশি সিপিএ ও ট্যাক্স অ্যাডভাইজারদের কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারের গোপন চক্র

প্রতিবেদক: প্রতিবেদকের নাম: | প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৮ আগস্ট ২০২৫, ০৮:২২ অপরাহ্ন
Print Image
[ad_1] উন্নততর সুশাসন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতীক কানাডা অভিবাসীদের জন্য এক প্রত্যাশার দেশ। প্রতি বছর হাজারো অভিবাসী আসেন এই দেশে নতুন জীবন গড়ার উদ্দেশ্যে। তাদের অনেকেই সৎ পথে এগিয়ে চলেন, আবার কেউ কেউ স্বপ্নের নামে ধোঁকা ও প্রতারণার আশ্রয় নেন।এই প্রতারণার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে কিছু অসাধু চার্টার্ড প্রফেশনাল অ্যাকাউন্ট্যান্ট (CPA) ও ট্যাক্স পরামর্শকরা। বিশেষত বাংলাদেশি, ভারতীয় ও পাকিস্তানি পেশাদারদের মধ্যে এই প্রবণতা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।এসব অপরাধীরা সাধারণত উচ্চশিক্ষিত, স্মার্ট এবং দক্ষ পেশাদার। তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান ভাল হলেও অর্থলিপ্সা, লোভ ও দ্রুত অর্থ আয়ের আকাঙ্ক্ষা তাদের অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। তারা নিজেদের দক্ষতা ব্যবহার করে, ক্লায়েন্টদের অবৈধভাবে কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারে সাহায্য করেন।এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনার সময় তারা সতর্ক এবং অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে আইন এড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কারণে তাদের অনেকেই আজকাল ধরা পড়ছেন।এই গল্প তাদের নিয়েই—যারা চার্টার্ড প্রফেশনাল অ্যাকাউন্ট্যান্ট (CPA) কিংবা ট্যাক্স অ্যাডভাইজারের খোলসে থেকে কানাডার আর্থিক ব্যবস্থায় বিষ ঢালছিলেন। CPA Canada, CRA, RCMP এবং FINTRAC-এর দীর্ঘমেয়াদী এক যৌথ তদন্তের পর বেরিয়ে এসেছে ট্যাক্স ফ্রড ও মানি লন্ডারিংয়ের বিস্ময়কর সব গল্প।প্রথমে বিষয়টি খুব গুরুত্ব না পেলেও পরবর্তীতে CRA-এর অ্যানালিটিক্স টুলে দেখা যায় একটি অস্বাভাবিক প্যাটার্ন: একই ঠিকানা, একই ব্যাংক, একই IP-থেকে পাঠানো বহু ট্যাক্স রিটার্ন। CRA কর্মকর্তারা পরবর্তীতে একে ‘Ghost Consultant Syndicate’ নাম দেন। তদন্তে যুক্ত হয় CPA Canada-এর ডিসিপ্লিনারি ইউনিট, FINTRAC-এর সাসপিশাস রিপোর্টিং ডিপার্টমেন্ট এবং পরবর্তীতে আরসিএমপি-এর ইকোনমিক ক্রাইম ইউনিট।তারা তৈরি করেন এক ‘কনসালটেন্ট ম্যাপ’, যেখানে দেখানো হয়—প্রতিটি অপরাধী ট্যাক্স অ্যাডভাইজার বা CPA কাদের সাথে যুক্ত, কোন কোন রিয়েল এস্টেট ট্রানজেকশনে তারা যুক্ত ছিলেন, কতটি ভুয়া ইনভয়েস তৈরি হয়েছে, এবং কোন কোন অ্যাকাউন্টে গিয়ে শেষ হয়েছে সেই অর্থ। সেই ম্যাপের কেন্দ্রে ছিল কিছু পরিচিত নাম।জাহাঙ্গির হোসেন, CPA। সাদা ফাইল ফোল্ডার হাতে, মুখে মৃদু হাসি। বাহ্যিকভাবে একজন নিরীহ, ভদ্র, পেশাদার হিসেবেই চেনা যেত তাঁকে। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল কর ফাঁকির এক নিখুঁত কারিগর। টরন্টোতে গত ছয় বছর ধরে অভিবাসীদের ট্যাক্স রিটার্নে ‘আদর্শ পরামর্শদাতা’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু CRA’র অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, তার ২০০টিরও বেশি ক্লায়েন্ট একাধিক ভুয়া নির্ভরশীল দেখিয়ে Canada Workers Benefit এবং GST রিফান্ড তুলেছেন।FINTRAC তার কয়েকটি ক্লায়েন্টের অ্যাকাউন্টে হঠাৎ করে বড় অঙ্কের ক্যাশ ডিপোজিট দেখে রিপোর্ট করে। জাহাঙ্গির হোসেনকে গোপনে অনুসরণ করা হয় ৩ মাস। অবশেষে, তার অফিসে হানা দিয়ে জব্দ করা হয় তিনটি ভিন্ন QuickBooks ডাটাবেস—একটি CRA-র জন্য, একটি ক্লায়েন্টের জন্য, আর একটি শুধুই নিজের জন্য। CPA Ontario তার লাইসেন্স স্থগিত করে, এবং CRA $৫০,০০০ ডলার জরিমানা করে।অভিযোগ, তিনি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়ন্ত্রিত সরকারি অর্থায়ন কর্মসূচি Ontario Student Assistance Program (OSAP)–এর অর্থ প্রাপ্তিতে জালিয়াতির আশ্রয় নেন। বহু শিক্ষার্থী—বিশেষত নতুন এসেই আর্থিক অনিশ্চয়তায় থাকা বাংলাদেশি, ভারতীয় ও পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের—তিনি পরামর্শ দিতেন কীভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে OSAP-এর আওতায় বড় অঙ্কের অর্থ আদায় করা যায়।তার কৌশলের মূল ভিত্তি ছিল মিথ্যা ইনকাম ডিক্লারেশন, ভুয়া বসবাসের ঠিকানা, ও সাজানো ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট। এই পদ্ধতিতে তিনি অন্তত ৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন, যেখানে প্রত্যেকের নামে গড়ে $১৫,০০০ থেকে $২৫,০০০ পর্যন্ত অনুদান ও ঋণ মঞ্জুর হয়। ধারণা করা হয়, পুরো স্কিমের মাধ্যমে প্রায় $৯ লাখ পর্যন্ত সরকারি অর্থ আত্মসাৎ হয়।এই ঘটনায় OSAP, CRA ও CPA Ontario তিনটি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। এর ফলস্বরূপ: রতন তালুকদারের CPA লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়; তার সমস্ত ক্লায়েন্ট ফাইল পর্যালোচনার আওতায় আসে; কমপক্ষে ১২ জন শিক্ষার্থীর অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য করা হয়; কানাডার উচ্চশিক্ষা খাতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের প্রতি নৈতিক সন্দেহ ও প্রশাসনিক কড়াকড়ি বেড়ে যায়।আব্দুল মান্নান, CPA। ভ্যাঙ্কুভারে বসে বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রতারিত রিফান্ড স্কিমে তার ভূমিকা ছিল নাট্যকারের মতো। টেমপ্লেট ব্যবহার করে বানানো টিউশন রিসিট, কলেজের স্ট্যাম্প ইম্প্রেশন, আর একই ফন্টে তৈরি রেজিস্ট্রেশন ফর্ম—সবকিছুই যেন কারখানার উৎপাদন।CRA-এর অ্যান্টি-ফ্রড টিম এক শিক্ষার্থীর ফর্মে সন্দেহজনক QR কোড স্ক্যান করে দেখেন তা ভুয়া ওয়েবসাইটে নিয়ে যায়। পরে FINTRAC-এর তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, আব্দুল মান্নানের ক্লায়েন্টদের একটি অংশ বাংলাদেশ, ভারত ও নাইজেরিয়ার ‘ফেইক ইউনিভার্সিটি’ থেকে আসা। CPA British Columbia তার লাইসেন্স বাতিল করে, এবং CRA শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে রিফান্ড ফেরত ও ১০০% জরিমানা ধার্য করে।মোহাম্মদ হাসান, CPA। মনট্রিয়লে রেস্টুরেন্ট ব্যবসার আড়ালে ক্যাশ লেনদেন গোপন করার কারিগর নামে পরিচিত। প্রতিটি ব্যবসার জন্য তিনি বানাতেন দুটি হিসাব বই—একটি CRA-এর সামনে পেশ করার জন্য, অন্যটি বাস্তব লেনদেনের।RCMP-এর ফোরেনসিক অডিট টিম ‘POS system’-এর লগ ডেটা চেক করে তার হিসাবের ফাঁকফোকর বের করে। CPA Quebec লাইসেন্স বাতিল করে এবং আদালতের নির্দেশে তার অংশীদার ব্যবসার মালিকরা $৭৫০,০০০ ডলার জরিমানা ও ব্যাক ট্যাক্স দিতে বাধ্য হন।আরিফ খান। অফশোর হ্যাভেন ব্যবহারের ক্ষেত্রে তার পদ্ধতি ছিল সফিস্টিকেটেড। বাহামা ও দুবাইয়ের শেল কোম্পানির মাধ্যমে $৩.৭ মিলিয়ন ডলার কানাডার বাইরে স্থানান্তর করেন। তিনি ক্লায়েন্টদের অফশোর ট্রাস্ট ফান্ড খোলার পরামর্শ দিতেন, যেখানে Beneficiary থাকত তার পরিবারেরই সদস্য।CRA-এর “Project Octavia” তাকে টার্গেট করে। FINTRAC ও RCMP-এর যৌথ হানায় তার টরন্টো অফিস থেকে উদ্ধার করা হয় বাহামার একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট, জাল কর্পোরেট সিল, ও ক্রিপ্টোকারেন্সির পেমেন্ট রশিদ।সুমন দাস। তিনি কখনো CPA ছিলেন না, কিন্তু টরন্টোর সকলেই তাকে “ট্যাক্স অ্যাডভাইজার” হিসেবে চিনে। ভুয়া RRSP কন্ট্রিবিউশনের রেকর্ড দেখিয়ে তিনি ২০ জন ক্লায়েন্টের $৫০০,০০০ ডলার রিফান্ড আদায়ে সহায়তা করেন।CRA একটি ক্লায়েন্টের রিটার্ন যাচাই করতে গিয়ে বিষয়টি ধরে ফেলে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, RRSP রেকর্ড আসলে গ্রাফিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে তৈরি করা জাল নথিপত্র। আদালত তাকে ১৮ মাসের কারাদণ্ড দেয় এবং আজীবন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় ট্যাক্স পরামর্শ সেবা প্রদানে।বাংলাদেশ থেকে লুট করা টাকাকে বৈধ করার সহায়তায় কানাডায় কিছু বাংলাদেশি ধূর্ত অ্যাকাউন্টেন্টকে বাহাদুরি করতে দেখা যায়। ড্রাইভওয়েতে পার্ক করে রাখা শাইনিং Porsche Cayenne, লাক্সারিয়াস বাড়ি, কমিউনিটির ইভেন্টে স্পনসরশিপের ব্যানারে তাদের নাম জ্বলজ্বলে অক্ষরে লেখা থাকে। অথচ এই সব বাহ্যিক চাকচিক্যের পেছনে ছায়া ফেলে থাকে এক গাঢ় অন্ধকার—একটি লুণ্ঠিত ইতিহাস, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া কোটি কোটি টাকার গল্প।এই দেশে, যেখানে আইন ও শুদ্ধতার গৌরব নিয়ে অভিবাসীরা ঘর বানাতে চান, সেখানে কিছু সিপিএ ও ফিনান্সিয়াল অ্যাডভাইজার নিজেদের প্রফেশনাল পরিচয়ের আড়ালে মেতে উঠেছেন এক মারাত্মক খেলায়—বাংলাদেশের দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতি ও ব্যবসা থেকে আসা কালো টাকা ‘সাদা’ করে ফেলার প্রতারণামূলক এক অর্থনৈতিক নাটকে। তারা যেন ধুয়ে দেন অপরের পাপ, আর সেই জলে নিজেদের আয়নার গায়ে লাগিয়ে নেন এক ধূর্ত ‘সফলতা’র ছাপ।এই মানি লন্ডারিং কোনো থ্রিলার সিনেমার চিত্রনাট্য নয়; বরং এটি বাস্তব জীবনের এক নির্মম এবং কুৎসিত সত্য, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে জড়িয়ে আছে হিসাবের সূক্ষ্ম কারসাজি, ভুয়া ডকুমেন্টেশনের কারিগরি কৌশল, অসাধু রিয়েলটর, ধান্দাবাজ মর্টগেজ এজেন্ট, এবং ধুরন্ধর আইনজীবীদের অংশগ্রহণ।একটি সমন্বিত সিন্ডিকেট—যাদের লক্ষ্য একটাই: বাংলাদেশ থেকে লুট করা সম্পদকে কানাডার আর্থিক ব্যবস্থার নিরাপদ আশ্রয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া, যেন কেউ কখনও প্রশ্ন না তোলে, কোথা থেকে এলো এই অস্বাভাবিক সমৃদ্ধি।তারা একেকজন একেক পথ বেছে নেন, কিন্তু লক্ষ্য একটাই—কালো টাকা যেন কানাডার অর্থনীতির স্বচ্ছ জলে মিশে যায়। এই প্রক্রিয়ায় তারা ব্যবহার করেন কিছু নির্দিষ্ট ও চেনা পদ্ধতি:যেমন- রিয়েল এস্টেটের মূল্য বাড়িয়ে দেখানো (Overvaluation): স্বল্পমূল্যের সম্পত্তিকে উচ্চমূল্যে দেখিয়ে বৈধ বিনিয়োগ প্রমাণ করার চেষ্টা—এটাই এখন সবচেয়ে পরিচিত মানি লন্ডারিং কৌশল।শেল কোম্পানি ও ভুয়া ইনভয়েস তৈরি: অস্তিত্বহীন কোম্পানির নামে জাল রপ্তানি বা সেবার বিল তৈরি করে বৈদেশিক লেনদেন বৈধ দেখানো।ক্রিপ্টোকারেন্সির সাহায্যে ট্রান্সফার: দুবাই, সিঙ্গাপুর বা মাল্টার এক্সচেঞ্জে বিটকয়েন বা ইউএসডিটি কেনা, পরে কানাডায় রূপান্তর।ইনভেস্টমেন্ট ভিসা প্রোগ্রাম অপব্যবহার: মিথ্যা নেট ওয়ার্থ সনদ দেখিয়ে সরকারি বিনিয়োগ স্কিমে অংশগ্রহণ, যেখানে মূল টাকাটিই দুর্নীতির।এই মহাপরিকল্পনার কেন্দ্রে ছিলেন তিনজন বাংলাদেশি পেশাজীবী—তিন কৌশলের, কিন্তু একই লক্ষ্যের যাত্রী।অভিনব ঋণ ফাঁদের জনক আহমেদ কবির। টরন্টোর এক অভিজাত এলাকায় তার অফিস। বাইরে থেকে একজন সফল কর পরামর্শক—কিন্তু FINTRAC-এর একটি রিপোর্ট ফাঁস করল তার আসল পরিচয়। তিনি তার ২০ জন বাংলাদেশি ক্লায়েন্টের জন্য ফেক লোন এগ্রিমেন্ট তৈরি করে সেই টাকাকে ‘পরিবারের ঋণ’ হিসেবে দেখান। এই কৌশলে প্রায় $২.৩ মিলিয়ন কালো টাকা রিয়েল এস্টেটে ঢুকে পড়ে।অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, অধিকাংশ ‘ঋণদাতা’ ব্যক্তি বাংলাদেশে সরকারের নজরদারিতে থাকা ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও সাবেক আমলা। এই ঘটনার তদন্তে সংশ্লিষ্ট রিয়েল এস্টেট ফার্ম ও CPA-র ৪০টির বেশি লেনদেন রিভিউয়ের আওতায় আসে। শেষ পর্যন্ত CRA আহমেদ কবিরের সব ফাইল সাসপিশাস হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তার লাইসেন্স বাতিল করে।জাল রপ্তানির কারিগর নাজমুল হাসান। অত্যন্ত সুপরিচিত একজন ACCA সার্টিফায়েড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি একটি শেল কোম্পানির মাধ্যমে $৫ মিলিয়ন টাকার ইনভয়েস ম্যানিপুলেশন করেন। কাগজে দেখানো হয় কানাডায় “টেক্সটাইল ও লেদার” পণ্য রপ্তানি হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে কোনো পণ্য আদান-প্রদান হয়নি।এই জাল লেনদেন ব্যাংক হয়ে এসে বিনিয়োগে রূপ নেয়। RCMP-র তদন্তে বিষয়টি সামনে আসে। FINTRAC এই লেনদেন শনাক্ত করে, যার ফলে নাজমুলের লাইসেন্স স্থগিত হয় এবং পাঁচজন কর্পোরেট ক্লায়েন্টের ওপর তদন্ত শুরু হয়।আশিক চৌধুরি। তিনি কাজ করতেন মূলত হাই-প্রোফাইল ক্লায়েন্টদের সঙ্গে। একদিন তার ক্লায়েন্ট লিস্টে দেখা গেল এক প্রাক্তন বাংলাদেশি মন্ত্রী, যিনি দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত। FINTRAC-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, আশিক একটি $১.৮ মিলিয়ন লেনদেন ইনভেস্টমেন্ট ভিসা প্রোগ্রাম-এর আওতায় বৈধ করেন, যেখানে টাকাটি আসলে এসেছিল বাহ্যিকভাবে একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির বিনিয়োগের নামে। কিন্তু সেই কোম্পানির অস্তিত্ব বাস্তবে ছিল না।CSIS নজরদারিতে রাখে পুরো নেটওয়ার্ককে, এবং টরন্টোতে তার অ্যাসেটগুলো ফ্রিজ করে। কানাডার ইমিগ্রেশন অফিস তদন্ত শুরু করে এবং ওই ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামের ওপর নীতিমালা কঠোর করা হয়।এই ঘটনাগুলো শুধু কয়েকজনের ব্যক্তিগত লাভের কাহিনি নয়—এগুলো প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের সম্পদ লুণ্ঠনের রক্তাক্ত ছায়া, যা আজ আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে কানাডিয়ান সমাজে ঢুকে পড়েছে। এরা শুধু অপরাধী নয়, এরা লুটেরাদের সহযাত্রী, যারা বিশ্বাস আর সিস্টেম—উভয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।দ্রষ্টব্য (Footnote):এই প্রতিবেদনের সব তথ্য বাস্তব তদন্তপ্রসূত হলেও আইনি ও নৈতিক কারণে নাম ও পরিচয় আংশিক পরিবর্তিত।তথ্যসূত্র:CPA Canada Annual Compliance Reports (২০২০–২০২৩)FINTRAC Annual ReportsCRA Enforcement & Risk AnalyticsRCMP Project Octavia Filesঅনুসন্ধানী প্রতিবেদন: Globe and Mail, Financial Post, CBC News [ad_2]

ডাইরেক্ট মেসেজ

Telegram Direct Message WhatsApp Direct Message

বাংলা ফন্ট কনভার্টার (বিজয় ⇄ ইউনিকোড)

×

তথ্য

×