টানা বৃষ্টিপাত বন্ধ হবার মধ্যদিয়ে সোমবার থেকে চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখনো নানাভাবে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় চরম মানবিক সংকটে রয়েছেন। লোকালয়ের গ্রামগুলোতে তলিয়ে গেছে নলকূপ ও শৌচাগার। যার ফলে তীব্র বিশুদ্ধ পানি, খাবার ও স্যানিটেশন-সংকট দেখা দিয়েছে।
বেশিরভাগ দুর্গত পরিবারে রান্নার সুযোগ না থাকায় শুকনো খাবার খেয়ে দিন পার করছেন। তবে চকরিয়া উপজেলার দুর্গম এলাকাগুলোতে এখনো সরকারি ত্রাণ না পৌঁছানোর অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। প্রশাসন অবশ্য দুর্গম এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের আশ্বাস দিয়েছেন।
সোমবার সকালে সরেজমিনে কয়েকটি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বন্যার পানিতে নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির উৎস প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বন্যার পানি ব্যবহার করছে।
অন্যদিকে ঢলের পানিতে রাস্তা-ঘাটের ভগ্নদশা সৃষ্টি হওয়ায় আভ্যন্তরিন সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এ অবস্থায় দুর্গত মানুষের জন্য বাজারে গিয়ে চাল, ডাল, শিশুখাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। উপজেলার বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে নৌকাই এখন যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম।
চকরিয়া মহিলা কলেজ পরিদর্শনে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের কলেজ পরিদর্শক, মানসম্মত লেখাপড়া নিশ্চিতের তাগিদ
বানবাসি মানুষের দাবি, দ্রুত সময়ে বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা না গেলে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। চকরিয়া উপজেলার কাকারা, বরইতলী, রসুলাবাদ, ডেইঙ্গাকাটা, বিবিরখীল ও হারবাং ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও তাদের এলাকায় এখনো কোনো সরকারি ত্রাণ পৌঁছেনি।
চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ছালেকুজ্জামান বলেন, আমার ইউনিয়নের বেশিরভাগ পরিবারের ‘ঘরে এখনো পানি। রাতে ঠিকমতো ঘুমানোর জায়গা নেই। চুলা জ্বালাতে না পারায় কয়েক দিন ধরে রান্না করতে পারছে না বানবাসি মানুষ। বিভিন্ন এলাকায় নলকূপ ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট। শৌচাগারও পানির নিচে থাকায় খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি আর দ্রুত ত্রাণ।’
কাকারা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সাহাব উদ্দিন বলেন, এখনো বিভিন্ন এলাকায় বানবাসি মানুষ ‘নৌকা যোগে চলাচল করছে। বাড়িতে বন্দি বসে থাকার কারণে বানবাসি পরিবার গুলোর হাতে টাকা-পয়সাও নেই, ইচ্ছা করলে পন্য সামগ্রী কিনতে পারছে না। এ অবস্থায় বেশিরভাগ পরিবার অর্ধাহারে দিন কাটছে। দ্রুত ত্রাণ না এলে আরও দুর্ভোগ বাড়তে পারে বানবাসি মানুষের।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষার্থীরাও। অনেকের বই-খাতা, স্কুলব্যাগ ও শিক্ষা উপকরণ পানিতে ভেসে গেছে। বরইতলী ইউনিয়নের রসুল্লাবাদের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার বলে, ‘আমার সব বই-খাতা নষ্ট হয়ে গেছে। সামনে পরীক্ষা। এখন কীভাবে পড়াশোনা করব বুঝতে পারছি না।’
চকরিয়া মাতামুহুরী উপজেলার একাধিক ইউপি চেয়ারম্যানের অভিযোগ, বন্যার জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পেছনে চকরিয়া উপকুলের পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্লুইসগেট ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও দায়ী। কিছু স্লুইসগেট ইজারা নিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীরা মাছ চাষ করায় বন্যার সময়ও সময়মতো গেট খোলা হয় না। পশ্চিম বড়ভেওলা ইউনিয়নের বাসিন্দা এডভোকেট রবিউল এহেছান বলেন, ‘সময়মত স্লুইসগেট গেইটের জলকপাট খুললে এতদিন পানি আটকে থাকত না। মানুষের দুর্ভোগও অনেক কম হতো।’
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘বান্দরবানের পাহাড় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় চকরিয়া ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। নদীর পানির উচ্চতা বেশি থাকায় স্লুইসগেট খুললেও পানি বের হওয়ার সুযোগ ছিল না। নদীর পানি কমে গেলে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হবে।’ একইসঙ্গে ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ সংস্কার কাজ করা হবে।
অপরদিকে পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করতে উপজেলা প্রশাসন মাঠপর্যায়ে সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বোচ্চ সহায়তা প্রদানে প্রশাসন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। কোনো মানুষ যেন খাবারের কষ্টে না ভোগে, তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। ধাপে ধাপে উপজেলার বিভিন্ন প্লাবিত পানিবন্দি পরিবারের মাঝে সহযোগিতা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে চাহিদা ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে আরও বড় ধরনের সরকারি সহায়তার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাতামুহুরী উপজেলার অতিরিক্ত শাহীন দেলোয়ার বলেন, ‘বন্যাকবলিত সব ইউনিয়নের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে দুর্গত বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। যেসব দুর্গম এলাকায় এখনো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি, সেখানে নৌকার মাধ্যমে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কোনো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তার বাইরে রাখা হবে না।’ ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরি করে জমা দেওয়ার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বলা হয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, বন্যা দুর্দিনে ‘জেলার ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৫ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্গত এলাকার বানবাসি মানুষের জন্য সরকারিভাবে ২০০ মেট্রিক টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলা পরিদর্শন করে ইতোমধ্যে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দিতে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ##




মন্তব্য করুন