হোম ট্রেন্ডিং লাইভ অনুসন্ধান মেনু
প্রতি মুর্হুতের কক্সবাজারকে জানুন
🔔 নোটিফিকেশন সাবস্ক্রিপশন ×
🔔

নতুন খবর সবার আগে আপনার ফোনে পান!

চিকিৎসকের ছদ্মবেশে নিউ ইয়র্কের ডা. আবু হায়াতের ভয়াবহ কাহিনি

প্রতিবেদকের নাম:

প্রতিবেদকের নাম:

সোমবার, ৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২৪ অপরাহ্ন


নিউ ইয়র্কের কুখ্যাত ক্লিনিক কেলেঙ্কারির হোতা ডা. আবু হায়াত-এর রিস্টোরেটেড ছবি

১৯৯১ সালের ১৪ নভেম্বর। নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের আকাশ সেদিন ছিল ধূসর। ইস্ট ভিলেজের ১৩ নম্বর স্ট্রিট এবং এভিনিউ এ-র কোণে অবস্থিত একটি জরাজীর্ণ ক্লিনিক থেকে যখন ২০ বছর বয়সী রোসা রড্রিগেজ রক্তাক্ত ও বিপর্যস্ত অবস্থায় বেরিয়ে এলেন, কেউ ভাবেনি এই ঘটনা খোদ হোয়াইট হাউস পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেবে। সেদিনের সেই সাধারণ মেডিকেল কেস কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে রূপ নেয় আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অপরাধে। নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে শুরু করে সিএনএন, সবার শিরোনামে তখন একটিই নাম ছিল ডা. আবু হায়াত। তবে তার নির্মমতার ধরণ দেখে বিশ্বজুড়ে তিনি পরিচিতি পান ‘দ্য বুচার অব এভিনিউ এ’ বা ‘এভিনিউ এ-র কসাই’ হিসেবে।

নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির কাছে ডা. হায়াত তখন পরিচিত মুখ হলেও ক্লিনিকের পর্দার আড়ালে তার কর্মকাণ্ড ছিল বীভৎস। রোসা রড্রিগেজ যখন সাড়ে ছয় মাসের গর্ভবতী, তখন সামাজিক ও মানসিক চাপে পড়ে গর্ভপাত করাতে হায়াতের ক্লিনিকে যান। ৫০০ ডলার নগদ নিয়ে তিনি অপারেশন শুরু করেন। কিন্তু মাঝপথে প্রচণ্ড ব্যথায় রোসা যখন চিৎকার করে কাজ বন্ধ করতে বলেন, তখন হায়াত তাকে ধমক দিয়ে শান্ত থাকতে বাধ্য করেন এবং প্রক্রিয়া চালিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর রোসাকে একপ্রকার অর্ধমৃত অবস্থায় ক্লিনিক থেকে বের করে দেওয়া হয়।

নাটকীয় মোড় আসে পরদিন সকালে। তীব্র প্রসব বেদনা নিয়ে রোসা জামাইকা হাসপাতালে ভর্তি হলে চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন। অপারেশন থিয়েটারে তখন কয়েক মুহূর্তের জন্য সবাই স্তব্ধ হয়ে যান। রোসা একটি কন্যাসন্তান প্রসব করেন, যার নাম রাখা হয় আনা রোসা। কিন্তু নবজাতকটিকে দেখে চিকিৎসকরা শিউরে ওঠেন। শিশুটির ডান হাতটি কাঁধের কাছ থেকে নেই। তদন্তে বেরিয়ে আসে সেই লোমহর্ষক তথ্য। আগের দিন গর্ভপাতের ব্যর্থ চেষ্টার সময় হায়াত জরায়ুর ভেতরেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে ভ্রূণের হাতটি কেটে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলেন। ৩২ সপ্তাহের পূর্ণাঙ্গ শিশুটি অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরলেও হায়াতের সেই লালসা তাকে সারাজীবনের জন্য পঙ্গু করে দেয়।

আরও পড়ুন

গোলরক্ষকের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হয়ে হাসপাতালে মারা গেলেন স্প্যানিশ ফুটবলার, তদন্ত শুরু

নিউ ইয়র্ক পোস্টের ক্যামেরায় ১৬ মাস বয়সী আনা রোসা রড্রিগেজ

ডা. আবু হায়াতের সেই জরাজীর্ণ চেম্বারটি ছিল মূলত একটি অন্ধকার ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু। সেই সময়ে নিউ ইয়র্কের অভিবাসী সমাজ এবং বিশেষ করে স্বল্প আয়ের অবিবাহিত তরুণীদের কাছে এই ক্লিনিকটি ছিল এক খোলা গোপন বিষয়। সামাজিক লোকলজ্জার ভয় আর আইনি জটিলতা এড়াতে যেসব মেয়েরা গোপনে গর্ভপাত করাতে চাইতেন, হায়াত ছিলেন তাদের শেষ গন্তব্য।

তদন্তে দেখা যায়, সেখানে কোনো নিয়ম-নীতি বা প্রাথমিক শারীরিক পরীক্ষার বালাই ছিল না। একমাত্র শর্ত ছিল নগদ ডলার। যেসব ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থা আইনি সীমা পার হয়ে যেত এবং অন্য কোনো বৈধ ক্লিনিক রোগীদের ফিরিয়ে দিত, হায়াত তাদের লুফে নিতেন। তিনি জানতেন, এই মেয়েরা মুখ খুলবে না। এই সুযোগে তিনি একেকটি গর্ভপাতের জন্য ৫০০ থেকে ১০০০ ডলার পর্যন্ত আদায় করতেন।

ডা. হায়াত এবং তার সহযোগীরা জানতেন এই মেয়েদের পেছনে কোনো শক্তিশালী সামাজিক সমর্থন নেই। ক্লিনিকে কোনো উন্নত সরঞ্জাম বা জরুরি সেবার ব্যবস্থা ছিল না। মাঝপথে কেউ ভয় পেয়ে অপারেশন বন্ধ করতে চাইলে তাদের ব্ল্যাকমেইল করা হতো। “অর্ধেক কাজ করে ছেড়ে দিলে তুমি মারা যাবে” এমন হুমকি দিয়ে তাদের জিম্মি করা হতো। হায়াত নিজেকে ত্রাণকর্তা হিসেবে জাহির করলেও পর্দার আড়ালে তিনি ছিলেন এক নির্দয় ব্যবসায়ী। তিনি মূলত সেই সব তরুণীদের টার্গেট করতেন যাদের হেলথ ইন্স্যুরেন্স নেই কিংবা যারা কাগজপত্রের অভাবে মূল হাসপাতালে যেতে ভয় পেতেন। চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাসে এটি ছিল এক জঘন্য মেডিকেল র‍্যাকেট।

১৯৯২ সালের শেষভাগে ম্যানহাটনের সুপ্রিম কোর্টে শুরু হয় এই শতাব্দীর অন্যতম আলোচিত বিচার। বিচারক টমাস গ্যালিগানের আদালত কক্ষ ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। বিচারের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্তটি আসে যখন প্রসিকিউটর মার্গারেট চেরি আদালতের মাঝখানে একটি ছোট সাদা বাক্স খোলেন। সেই বাক্সে ছিল ফরেনসিক রিপোর্টে সংরক্ষিত শিশু আনা রোসার সেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ক্ষুদ্র ডান হাতটি। আদালত কক্ষের ভেতরে তখন এক গভীর স্তব্ধতা নেমে আসে।এমনকি কঠোর হৃদয়ের জুরি মেম্বারদের চোখেও সেদিন জল দেখা গিয়েছিল।

এই মামলায় আদালতের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ডা. হায়াতের নিজস্ব সহকারীর সাক্ষ্য। ২৪ বছর বয়সী রাবেয়া বসরী কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলেন, ঘটনার দিন তিনি নিজের চোখে দেখেছেন হায়াত একটি রক্তমাখা ‘মাংসের টুকরো’ ক্লিনিকের আবর্জনার পাত্রে ফেলে দিচ্ছেন। পরে তদন্তকারীদের কাছে তিনি স্পষ্ট করে জানান, সেটি আসলে নবজাতক আনা রোসার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ডান হাত। রাবেয়ার এই সাক্ষ্য আদালত কক্ষে উপস্থিত সবার মধ্যে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। রাষ্ট্রপক্ষের মতে, এটি কেবল নিষ্ঠুরতার প্রমাণ নয়, বরং অপরাধ আড়াল করার সরাসরি চেষ্টা।

সংবাদ সংস্থা ‘অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস’ (AP)-এ প্রকাশিত ডা. আবু হায়াত মামলার সেই ঐতিহাসিক প্রতিবেদন।

দীর্ঘ সাক্ষ্যগ্রহণ ও প্রমাণ উপস্থাপনের পর ৯ জন পুরুষ ও ৩ জন নারীর সমন্বয়ে গঠিত জুরি বোর্ড টানা পাঁচ দিন ধরে আলোচনা করে। সেই আলোচনার প্রতিটি ধাপে উঠে আসে একের পর এক ভয়াবহ তথ্য। শেষ পর্যন্ত জুরিরা সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে ডা. আবু হায়াতের কর্মকাণ্ড কোনো চিকিৎসাগত ভুল নয়, এটি ছিল সচেতন ও নির্মম অপরাধ। এই সিদ্ধান্তই পরবর্তী রায়ের ভিত্তি গড়ে দেয়।

কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ডা. হায়াত বিষয়টিকে একটি দুর্ঘটনা হিসেবে প্রমাণের আপ্রাণ চেষ্টা করেন। তার আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে ভ্রূণটি তখনো পূর্ণাঙ্গ মানুষ নয়। কিন্তু একের পর এক ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য এবং অকাট্য প্রমাণের সামনে সব যুক্তি ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

ম্যানহাটনের স্টেট সুপ্রিম কোর্টে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর আদালত কক্ষ থেকে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বের করে নিয়ে যাচ্ছেন ৬৩ বছর বয়সী ডা. আবু হায়াতকে।

আদালত তাকে ১০ থেকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে। এটি ছিল সে সময় নিউ ইয়র্কের ইতিহাসে গর্ভপাত সংক্রান্ত অপরাধে কঠোরতম সাজা। পরবর্তীতে তাকে মোট ২২ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়। ১৯৯৩ সালের নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে ডা. হায়াত জানতেন শিশুটি জরায়ুর বাইরে বেঁচে থাকতে সক্ষম এবং তবুও তিনি কোনো মানবিকতা দেখাননি। এই মামলাটি নিউ ইয়র্কের হেলথ কোড বা স্বাস্থ্যবিধি আমূল বদলে দেয়।

সময়ের পাতায় দীর্ঘ বছর কারাবাসের পর ২০০৬ সালে ডা. হায়াত প্যারোলে মুক্তি পান। জেল থেকে বের হয়ে তিনি নিজের কলঙ্কিত নাম পরিবর্তনের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু একজন বিচক্ষণ বিচারক তার সেই আবেদন সরাসরি নাকচ করে দেন যাতে সমাজ তার অপরাধের কথা ভুলে না যায়। পঁয়ত্রিশ বছর পেরিয়ে গেছে। ইস্ট ভিলেজের সেই ক্লিনিকটি আর নেই। কিন্তু আনা রোসা আজ একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী। তার সেই একটি হাত না থাকা আজও ম্যানহাটনের ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়ের জীবন্ত সাক্ষী।

তথ্যসূত্র:
1. The New York Times (Archived Articles)
2. Associated Press (AP News)
3. New York Daily News (Digital Archive)
4. The story of Ana Rosa Rodriguez (ভিডিও সংযুক্ত)


coxsbazarpost

coxsbazarpost

কক্সবাজারের স্থানীয় সাংবাদিকতা ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের বিশ্বস্ত লেখক।

সত্যতা যাচাই: এই সংবাদটি সম্পাদকীয় নীতি অনুসরণ করে বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

সংবাদ কিউআর কোড

নিচের QR কোডটি স্ক্যান করে যেকোনো মোবাইলে সংবাদটি সরাসরি ওপেন করুন।

ফটোকার্ড স্টুডিও

২য় লীড নিউজ
Card Image

চিকিৎসকের ছদ্মবেশে নিউ ইয়র্কের ডা. আবু হায়াতের ভয়াবহ কাহিনি

www.coxsbazarposts.com সত্যের সন্ধানে অনুক্ষণ

প্রিন্ট প্রিভিউ

Logo www.coxsbazarposts.com

চিকিৎসকের ছদ্মবেশে নিউ ইয়র্কের ডা. আবু হায়াতের ভয়াবহ কাহিনি

প্রতিবেদক: প্রতিবেদকের নাম: | প্রকাশিত: সোমবার, ৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২৪ অপরাহ্ন
Print Image
[ad_1] নিউ ইয়র্কের কুখ্যাত ক্লিনিক কেলেঙ্কারির হোতা ডা. আবু হায়াত-এর রিস্টোরেটেড ছবি১৯৯১ সালের ১৪ নভেম্বর। নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের আকাশ সেদিন ছিল ধূসর। ইস্ট ভিলেজের ১৩ নম্বর স্ট্রিট এবং এভিনিউ এ-র কোণে অবস্থিত একটি জরাজীর্ণ ক্লিনিক থেকে যখন ২০ বছর বয়সী রোসা রড্রিগেজ রক্তাক্ত ও বিপর্যস্ত অবস্থায় বেরিয়ে এলেন, কেউ ভাবেনি এই ঘটনা খোদ হোয়াইট হাউস পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেবে। সেদিনের সেই সাধারণ মেডিকেল কেস কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে রূপ নেয় আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অপরাধে। নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে শুরু করে সিএনএন, সবার শিরোনামে তখন একটিই নাম ছিল ডা. আবু হায়াত। তবে তার নির্মমতার ধরণ দেখে বিশ্বজুড়ে তিনি পরিচিতি পান ‘দ্য বুচার অব এভিনিউ এ’ বা ‘এভিনিউ এ-র কসাই’ হিসেবে।নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির কাছে ডা. হায়াত তখন পরিচিত মুখ হলেও ক্লিনিকের পর্দার আড়ালে তার কর্মকাণ্ড ছিল বীভৎস। রোসা রড্রিগেজ যখন সাড়ে ছয় মাসের গর্ভবতী, তখন সামাজিক ও মানসিক চাপে পড়ে গর্ভপাত করাতে হায়াতের ক্লিনিকে যান। ৫০০ ডলার নগদ নিয়ে তিনি অপারেশন শুরু করেন। কিন্তু মাঝপথে প্রচণ্ড ব্যথায় রোসা যখন চিৎকার করে কাজ বন্ধ করতে বলেন, তখন হায়াত তাকে ধমক দিয়ে শান্ত থাকতে বাধ্য করেন এবং প্রক্রিয়া চালিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর রোসাকে একপ্রকার অর্ধমৃত অবস্থায় ক্লিনিক থেকে বের করে দেওয়া হয়।নাটকীয় মোড় আসে পরদিন সকালে। তীব্র প্রসব বেদনা নিয়ে রোসা জামাইকা হাসপাতালে ভর্তি হলে চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন। অপারেশন থিয়েটারে তখন কয়েক মুহূর্তের জন্য সবাই স্তব্ধ হয়ে যান। রোসা একটি কন্যাসন্তান প্রসব করেন, যার নাম রাখা হয় আনা রোসা। কিন্তু নবজাতকটিকে দেখে চিকিৎসকরা শিউরে ওঠেন। শিশুটির ডান হাতটি কাঁধের কাছ থেকে নেই। তদন্তে বেরিয়ে আসে সেই লোমহর্ষক তথ্য। আগের দিন গর্ভপাতের ব্যর্থ চেষ্টার সময় হায়াত জরায়ুর ভেতরেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে ভ্রূণের হাতটি কেটে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলেন। ৩২ সপ্তাহের পূর্ণাঙ্গ শিশুটি অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরলেও হায়াতের সেই লালসা তাকে সারাজীবনের জন্য পঙ্গু করে দেয়।নিউ ইয়র্ক পোস্টের ক্যামেরায় ১৬ মাস বয়সী আনা রোসা রড্রিগেজডা. আবু হায়াতের সেই জরাজীর্ণ চেম্বারটি ছিল মূলত একটি অন্ধকার ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু। সেই সময়ে নিউ ইয়র্কের অভিবাসী সমাজ এবং বিশেষ করে স্বল্প আয়ের অবিবাহিত তরুণীদের কাছে এই ক্লিনিকটি ছিল এক খোলা গোপন বিষয়। সামাজিক লোকলজ্জার ভয় আর আইনি জটিলতা এড়াতে যেসব মেয়েরা গোপনে গর্ভপাত করাতে চাইতেন, হায়াত ছিলেন তাদের শেষ গন্তব্য।তদন্তে দেখা যায়, সেখানে কোনো নিয়ম-নীতি বা প্রাথমিক শারীরিক পরীক্ষার বালাই ছিল না। একমাত্র শর্ত ছিল নগদ ডলার। যেসব ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থা আইনি সীমা পার হয়ে যেত এবং অন্য কোনো বৈধ ক্লিনিক রোগীদের ফিরিয়ে দিত, হায়াত তাদের লুফে নিতেন। তিনি জানতেন, এই মেয়েরা মুখ খুলবে না। এই সুযোগে তিনি একেকটি গর্ভপাতের জন্য ৫০০ থেকে ১০০০ ডলার পর্যন্ত আদায় করতেন।ডা. হায়াত এবং তার সহযোগীরা জানতেন এই মেয়েদের পেছনে কোনো শক্তিশালী সামাজিক সমর্থন নেই। ক্লিনিকে কোনো উন্নত সরঞ্জাম বা জরুরি সেবার ব্যবস্থা ছিল না। মাঝপথে কেউ ভয় পেয়ে অপারেশন বন্ধ করতে চাইলে তাদের ব্ল্যাকমেইল করা হতো। “অর্ধেক কাজ করে ছেড়ে দিলে তুমি মারা যাবে” এমন হুমকি দিয়ে তাদের জিম্মি করা হতো। হায়াত নিজেকে ত্রাণকর্তা হিসেবে জাহির করলেও পর্দার আড়ালে তিনি ছিলেন এক নির্দয় ব্যবসায়ী। তিনি মূলত সেই সব তরুণীদের টার্গেট করতেন যাদের হেলথ ইন্স্যুরেন্স নেই কিংবা যারা কাগজপত্রের অভাবে মূল হাসপাতালে যেতে ভয় পেতেন। চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাসে এটি ছিল এক জঘন্য মেডিকেল র‍্যাকেট।১৯৯২ সালের শেষভাগে ম্যানহাটনের সুপ্রিম কোর্টে শুরু হয় এই শতাব্দীর অন্যতম আলোচিত বিচার। বিচারক টমাস গ্যালিগানের আদালত কক্ষ ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। বিচারের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্তটি আসে যখন প্রসিকিউটর মার্গারেট চেরি আদালতের মাঝখানে একটি ছোট সাদা বাক্স খোলেন। সেই বাক্সে ছিল ফরেনসিক রিপোর্টে সংরক্ষিত শিশু আনা রোসার সেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ক্ষুদ্র ডান হাতটি। আদালত কক্ষের ভেতরে তখন এক গভীর স্তব্ধতা নেমে আসে।এমনকি কঠোর হৃদয়ের জুরি মেম্বারদের চোখেও সেদিন জল দেখা গিয়েছিল।এই মামলায় আদালতের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ডা. হায়াতের নিজস্ব সহকারীর সাক্ষ্য। ২৪ বছর বয়সী রাবেয়া বসরী কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলেন, ঘটনার দিন তিনি নিজের চোখে দেখেছেন হায়াত একটি রক্তমাখা ‘মাংসের টুকরো’ ক্লিনিকের আবর্জনার পাত্রে ফেলে দিচ্ছেন। পরে তদন্তকারীদের কাছে তিনি স্পষ্ট করে জানান, সেটি আসলে নবজাতক আনা রোসার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ডান হাত। রাবেয়ার এই সাক্ষ্য আদালত কক্ষে উপস্থিত সবার মধ্যে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। রাষ্ট্রপক্ষের মতে, এটি কেবল নিষ্ঠুরতার প্রমাণ নয়, বরং অপরাধ আড়াল করার সরাসরি চেষ্টা।সংবাদ সংস্থা ‘অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস’ (AP)-এ প্রকাশিত ডা. আবু হায়াত মামলার সেই ঐতিহাসিক প্রতিবেদন।দীর্ঘ সাক্ষ্যগ্রহণ ও প্রমাণ উপস্থাপনের পর ৯ জন পুরুষ ও ৩ জন নারীর সমন্বয়ে গঠিত জুরি বোর্ড টানা পাঁচ দিন ধরে আলোচনা করে। সেই আলোচনার প্রতিটি ধাপে উঠে আসে একের পর এক ভয়াবহ তথ্য। শেষ পর্যন্ত জুরিরা সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে ডা. আবু হায়াতের কর্মকাণ্ড কোনো চিকিৎসাগত ভুল নয়, এটি ছিল সচেতন ও নির্মম অপরাধ। এই সিদ্ধান্তই পরবর্তী রায়ের ভিত্তি গড়ে দেয়।কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ডা. হায়াত বিষয়টিকে একটি দুর্ঘটনা হিসেবে প্রমাণের আপ্রাণ চেষ্টা করেন। তার আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে ভ্রূণটি তখনো পূর্ণাঙ্গ মানুষ নয়। কিন্তু একের পর এক ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য এবং অকাট্য প্রমাণের সামনে সব যুক্তি ধূলিসাৎ হয়ে যায়।ম্যানহাটনের স্টেট সুপ্রিম কোর্টে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর আদালত কক্ষ থেকে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বের করে নিয়ে যাচ্ছেন ৬৩ বছর বয়সী ডা. আবু হায়াতকে।আদালত তাকে ১০ থেকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে। এটি ছিল সে সময় নিউ ইয়র্কের ইতিহাসে গর্ভপাত সংক্রান্ত অপরাধে কঠোরতম সাজা। পরবর্তীতে তাকে মোট ২২ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়। ১৯৯৩ সালের নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে ডা. হায়াত জানতেন শিশুটি জরায়ুর বাইরে বেঁচে থাকতে সক্ষম এবং তবুও তিনি কোনো মানবিকতা দেখাননি। এই মামলাটি নিউ ইয়র্কের হেলথ কোড বা স্বাস্থ্যবিধি আমূল বদলে দেয়।সময়ের পাতায় দীর্ঘ বছর কারাবাসের পর ২০০৬ সালে ডা. হায়াত প্যারোলে মুক্তি পান। জেল থেকে বের হয়ে তিনি নিজের কলঙ্কিত নাম পরিবর্তনের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু একজন বিচক্ষণ বিচারক তার সেই আবেদন সরাসরি নাকচ করে দেন যাতে সমাজ তার অপরাধের কথা ভুলে না যায়। পঁয়ত্রিশ বছর পেরিয়ে গেছে। ইস্ট ভিলেজের সেই ক্লিনিকটি আর নেই। কিন্তু আনা রোসা আজ একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী। তার সেই একটি হাত না থাকা আজও ম্যানহাটনের ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়ের জীবন্ত সাক্ষী।তথ্যসূত্র:1. The New York Times (Archived Articles)2. Associated Press (AP News)3. New York Daily News (Digital Archive)4. The story of Ana Rosa Rodriguez (ভিডিও সংযুক্ত) [ad_2]

ডাইরেক্ট মেসেজ

Telegram Direct Message WhatsApp Direct Message

বাংলা ফন্ট কনভার্টার (বিজয় ⇄ ইউনিকোড)

×

তথ্য

×