ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ভ্যাঙ্কুভার আইল্যান্ডে ছড়িয়ে থাকা শান্ত শহর নানাইমো। ভ্যাঙ্কুভার থেকে প্রায় দেড়শ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থানের এই শহর প্রকৃতির কোলে থাকা, সুশৃঙ্খল এবং অপরাধপ্রবণতার দিক থেকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ শহরগুলোর একটি।
১২ নভেম্বর ২০২৫। বুধবার বিকেল তিনটার পর। অফিস শেষ হওয়া মানুষের ভিড়ে ব্যস্ত হয়ে উঠছিল হাইওয়ে 19A। ঠিক তখনই পুলিশ রেডিওতে একটি সতর্কবার্তা আসে। রাস্তার ধারে ঝোপের ভেতর কিছু অস্বাভাবিক দেখা গেছে। প্রথমে কেউ ঠিক বুঝতে পারেনি বিষয়টি কী হতে পারে। অনেক সময় প্রাণীর চলাফেরায় এমন শব্দ হয়। কিন্তু এবার বিষয়টি পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করল অন্যভাবে। কারণ শুকনো পাতার ওপর দেখা গেল ভারী কোনো কিছুকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এমন দাগ, যা সাধারণ প্রাণীর চলাফেরার সঙ্গে মিলছিল না।
হরমুজ প্রণালিতে ৪ দেশের জাহাজে ইরানের বিশেষ ছাড়
টহলদল একটু একটু করে ঝোপের দিকে এগোতে থাকে। সূর্য তখন পশ্চিমে হেলে পড়ছে, আলো কমে আসছে, আর সেই ম্লান আলোয় তারা দেখতে পায় একটি মানুষের পা। কয়েক সেকেন্ডের ভেতর পুরো ছবিটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঝোপের ভেতর পড়ে আছে এক তরুণের নিথর দেহ। সেই দৃশ্যই নানাইমোর ছোট্ট শহরটিতে ভয়, শোক এবং প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছড়িয়ে দিল।

তরুণটির নাম মাহাদি হাসান রেদোয়ান। বয়স মাত্র তেইশ। বাংলাদেশ থেকে মাত্র ছয় মাস আগে তিনি কানাডায় এসেছিলেন। স্বপ্ন ছিল পরিবারকে একটু ভালোভাবে দাঁড় করাবেন। দুইটি চাকরি করতেন একসঙ্গে। চারপাশের সবাই বলত, তিনি ছিলেন ভদ্র, নম্র, সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য একজন মানুষ। নতুন জীবনের সন্ধানে আসা এই যুবকের যাত্রা এমনভাবে থেমে যাবে, তা কেউ ভাবতে পারেনি।
৩ নভেম্বর সকাল। কুরটেনি (নানাইমো থেকে ১১০ কিলোমিটার দূরত্ব) যাওয়ার জন্য একটি রাইড ঠিক ছিল। তাঁর সহকর্মী সময়মতো মাহাদির বাসার সামনে পৌঁছান। কিন্তু দরজা খুলে দেয় না কেউ। ফোনও বন্ধ। অপেক্ষা করতে করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, কোনো সাড়া পাওয়া যায় না। কেউ জানে না ঠিক কোথায় মিলিয়ে গেলেন তিনি।
৫ নভেম্বর পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে নিখোঁজ ঘোষণা করে। পরিবার, বন্ধুবান্ধব, কমিউনিটি সবাই তখন উদ্বেগে কাতর। এমনভাবে যোগাযোগহীন থাকা তাঁর স্বভাবের সঙ্গে মেলে না। দিন যত এগোতে থাকে, ততই শঙ্কা বাড়ে।
১২ নভেম্বর যখন তাঁর মরদেহ উদ্ধার হয়, তখন তিনি সেখানে পড়ে ছিলেন প্রায় দশ দিন ধরে।
হাইওয়ের এমন ব্যস্ত একটি জায়গায় একটি দেহ পড়ে থাকা সত্ত্বেও এতদিন কেউ টের পায়নি, এটিই তদন্তকারীদের সবচেয়ে বিস্মিত করেছে। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই নানাইমো এবং ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার অভিবাসী কমিউনিটিতে নেমে আসে শোকের ঢেউ।
নানাইমো আরসিএমপির রিজার্ভ কনস্টেবল গ্যারি ও’ব্রায়েন জানান, ঘটনাটি এখন স্পষ্টভাবে একটি অপরাধমূলক তদন্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং প্রতিটি সম্ভাবনাই খোলা রয়েছে। পুলিশের বিশ্বাস মাহাদির মৃত্যু ২ নভেম্বর রাত প্রায় আটটা পনেরোর দিকে ঘটেছে। তবে ঠিক কী হয়েছিল, কারও হাত রয়েছে কি না, কোনো যানবাহন জড়িত কি না, নাকি এটি পরিকল্পিত কোনো আক্রমণ, সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর পুলিশ এখনো খুঁজে পাচ্ছে না।
মাহাদির স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা। কয়েক মাস পর জন্ম নেবে তাঁদের সন্তান। দুজনের স্বপ্ন ছিল নবাগত শিশুটিকে নিয়ে নিরাপদ একটি ভবিষ্যৎ গড়া। ঠিক সেই সময়েই তাঁর স্ত্রী পেলেন সেই মর্মান্তিক সংবাদ। এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ল একটি পরিবারের সব স্বপ্ন, আর অন্ধকারে ঢেকে গেল একটি অনাগত শিশুর ভবিষ্যৎ।
মাহাদির স্মরণে কানাডায় শুরু হয়েছে একটি সহায়তা সংগ্রহ। কমিউনিটির মানুষ তাঁর স্ত্রী ও সন্তানের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এখন পর্যন্ত উনিশ হাজার ডলারেরও বেশি জোগাড় হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানো হবে এবং বাকিটা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য রাখা হবে।
নতুন জীবনের স্বপ্ন বুকে নিয়ে কানাডায় এসেছিলেন মাহাদি। তিনি বিশ্বাস করতেন পরিশ্রম করলে পথ তৈরি হয়, জীবন ঠিকই তাকে নিজের মতো করে জায়গা করে দেবে। হয়তো তিনি কল্পনায় দেখেছিলেন সন্তানের প্রথম হাসি, প্রথম ডাকে বাবা ডাকা। হয়তো তাঁর মনে ছিল স্ত্রীকে নিয়ে একটু ভালো সময়ে পৌঁছানোর স্বপ্ন। কিন্তু সেই সব স্বপ্ন পড়ে রইল হাইওয়ের ঝোপের পাশে, বাতাসের শোকে মিলিয়ে যাওয়া এক তরুণের নিথর শরীরের পাশে।
সূত্র:
Nanaimo News NOW (November 13, 2025)
Times Colonist (November 14, 2025)
Royal Canadian Mounted Police




মন্তব্য করুন