ফেসবুক খুললেই আজকাল একটি পরিচিত দৃশ্য চোখে পড়ে। আপনার নজর কাড়ল জীবনঘন, সুচিন্তিত একটি লেখা। পড়া শেষ করে লেখককে ধন্যবাদ দিতে মন চায়। ঠিক তখনই চোখে পড়ে নিচের এক শব্দ, “সংগৃহীত”। মুহূর্তেই আনন্দটা ফিকে হয়ে যায়, কারণ বুঝে যান লেখাটির প্রকৃত লেখকের নাম উল্লেখ করা হয়নি। এই অভিজ্ঞতা কমবেশি অনেকেরই আছে।
অনেকে অন্যের লেখা কপি করে নিজের ওয়ালে এমনভাবে পোস্ট করেন, যেন সেটি তাদের নিজেরই সৃষ্টি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই প্রবণতা কেবল শেয়ার করার আনন্দ নয়, বরং অন্যের মেধা আত্মসাৎ করে নিজেকে জ্ঞানী প্রমাণ করার একটি পথ হয়ে উঠছে। এমন অভ্যাস আমাদের সমাজের নৈতিক বোধকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দিচ্ছে।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে বিশেষ অধ্যাদেশ জারি
একজন লেখক যখন চিন্তা, অভিজ্ঞতা আর শ্রম দিয়ে শব্দ সাজান, তখন সেই লেখার ভেতর জড়িয়ে থাকে তাঁর সময়, সাধনা ও মেধার ইতিহাস। সেই লেখাটি যখন লেখকের নাম ছাড়া ইন্টারনেটে ঘুরে বেড়ায়, তখন তাকে আর সাধারণ শেয়ার বলা যায় না। এটি এক প্রকার মেধা চুরি। “সংগৃহীত” শব্দের আড়ালে একজন সৃষ্টিশীল মানুষের পরিচয় ও অস্তিত্বকে কার্যত অস্বীকার করা হয়। বিস্ময় লাগে যখন দেখি সমাজের অনেক শিক্ষিত মানুষও অনায়াসে নামহীন লেখা পোস্ট করেন, আবার কেউ কেউ সেই পোস্টে বাহবা দিয়ে বিভ্রান্তিকে উৎসাহিত করেন। অন্যের কষ্টার্জিত সৃষ্টিকে নিজের নামে চালিয়ে দিয়ে কয়েকশ লাইক আর কমেন্ট পেয়ে তারা যে আত্মতৃপ্তি পান, তার ভিত্তি কিন্তু নিরেট মিথ্যা।
অনেকের মতে এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো নিজের সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং স্বীকৃতি পাওয়ার তাড়না। যারা বারবার অন্যের লেখা কৌশলে নিজের নামে চালান, তারা বন্ধুদের চোখে একটি “বুদ্ধিজীবী” ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে চান। কিন্তু যে সম্মান মেধা ধার করে আসে, তা টেকে না, কারণ সেটি নিজের অর্জন নয়, অন্যের শ্রমে গড়া চিন্তার ওপর দাঁড়ানো। আরও সহজ করে বললে, অন্যের লেখা চুরি করে নিজেকে জ্ঞানী প্রমাণ করা হলো অন্যের মেডেল নিজের গলায় ঝুলিয়ে নায়ক সাজা। এতে সাময়িক বাহবা পাওয়া যায়, কিন্তু সম্মান পাওয়া যায় না।
অনেক সময় যুক্তি দেওয়া হয়, ভালো কথা তো সবার জানা উচিত, তাই শেয়ার করেছি। অবশ্যই ভালো কথা ছড়িয়ে দেওয়া উচিত, কিন্তু তা হতে হবে লেখকের প্রতি সম্মান রেখে। কপি পেস্ট করে নিজের ওয়ালে বসিয়ে দেওয়ার বদলে পোস্টের শেয়ার বাটন ব্যবহার করা যায়। উদ্ধৃতি হিসেবে দিলে উদ্ধৃতি চিহ্ন ব্যবহার করা যায়, সঙ্গে লেখকের নাম, মূল উৎসের লিংক, কিংবা অন্তত যে পেজ বা বই থেকে লেখা নেওয়া হয়েছে তা স্পষ্ট করে উল্লেখ করা যায়। ইন্টারনেটের যুগে সামান্য চেষ্টা করলেই অনেক সময় আসল লেখকের নাম খুঁজে পাওয়া যায়। তবু অনেকে সেই ন্যূনতম দায়িত্বটুকু নিতে চান না, বরং “সংগৃহীত” লিখে দায়মুক্তির পথ খোঁজেন। এতে লেখকের প্রতি যেমন অবিচার হয়, তেমনি পাঠকের সঙ্গেও প্রতারণা ঘটে। পাঠকরা ভাবেন পোস্টদাতা খুবই জ্ঞানী, কিন্তু বাস্তবে তিনি অন্যের শব্দে নিজেকে সাজিয়ে রাখেন।


মন্তব্য করুন