অবকাশযাপনে যায় স্বস্তি ও আনন্দের খোঁজে। পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে, সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। কিন্তু কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে বেড়াতে গিয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ১০ পর্যটক। স্বজনদের কাছে আনন্দের স্মৃতি পরিণত হয়েছে গভীর শোকে।
এই প্রাণহানির পর রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা, পরিচালনার অনুমোদন এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানটির ফায়ার সেফটি লাইসেন্স ছিল না, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রও নেওয়া হয়নি। এর আগে অগ্নিঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল বলেও জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকায় রিসোর্টটিকে বন্ধের নোটিশ দেওয়া এবং পরে জরিমানা করার তথ্যও সামনে এসেছে।
প্রশ্ন হলো, ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করার পরও কীভাবে রিসোর্টটির কার্যক্রম চলছিল? নিরাপত্তার ঘাটতি দূর করতে কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল? একাধিক দপ্তরের নোটিশ ও জরিমানার পরও যদি কার্যক্রম বন্ধ না হয়ে থাকে, তাহলে আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর ভূমিকা কতটা কার্যকর ছিল? দশটি প্রাণহানির পর এসব প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সতর্কবার্তা ছিল, কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়? : শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে সাতটার দিকে রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। অধিকঝুঁকির কাঠের তৈরি স্থাপনাটিতে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে সকাল আটটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তারের সার্বিক মনিটরিং ও তত্ত্বাবধানে প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ততক্ষণে প্রাণ হারিয়েছেন ১০ জন।
উখিয়ায় বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে সিএনজিচালক নিহত
ঘটনায় অন্তত ছয়জন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন থাকতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে প্রশাসন। তবে পরিচয় ও পারিবারিক সম্পর্ক নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন ইউএনও পান্না আক্তার।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানিয়েছেন, গত জুন মাসে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পরিদর্শনের পর প্রতিষ্ঠানটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে ১১ জুন নোটিশ দেওয়া হয়। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুয়াইদ ১৭ অক্টোবর ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, রিসোর্টটির ফায়ার সেফটি লাইসেন্স ছিল না।
ইউএনও পান্না আক্তারের ভাষ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটির বড় অংশ কাঠের তৈরি হওয়ায় সমুদ্রের বাতাসে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। স্থাপনাটিতে বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেতব্যবস্থা, হোস পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনার মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার ঘাটতি ছিল। রিসোর্টটি মাত্র সাত-আট মাস আগে নির্মিত হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঝুঁকি শনাক্ত করার পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার ঘাটতি দূর করেছিল কি না, সংশ্লিষ্ট দপ্তর পুনরায় পরিদর্শন করেছিল কি না এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় কার্যক্রম বন্ধ বা অন্য কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
কোনো স্থাপনায় ঝুঁকি শনাক্ত করে নোটিশ দেওয়াই যথেষ্ট নয়; সেই সতর্কতার পর ঝুঁকি কমাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা যাচাই করাও জরুরি।
ছাড়পত্র ছাড়াই কার্যক্রম, জরিমানার পরও বন্ধ হয়নি রিসোর্ট : টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টের পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানিয়েছেন, ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় এ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ছাড়পত্রের জন্য আবেদনও করেনি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার অঞ্চলের পরিচালক জমির উদ্দিন জানান, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনা করায় গত এপ্রিলে টুপটুপ রেস্টুরেন্টকে বন্ধের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। নির্দেশনা না মানায় পরের মাসের ১৩ তারিখ প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবেশগত ছাড়পত্র পেতে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত ভবন নকশা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট থাকা প্রয়োজন। টুপটুপ রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের কোনোটিই ছিল না।
অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শুধু ছাড়পত্র না থাকার অভিযোগই ওঠেনি; কার্যক্রম বন্ধের নোটিশ অমান্য এবং জরিমানার পরও পরিচালনা অব্যাহত রাখার বিষয়টিও সামনে এসেছে। তাহলে জরিমানার পর প্রতিষ্ঠানটি বন্ধে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল কি না, নাকি আইনগত ক্ষমতার সীমাবদ্ধতায় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন এলাকায় ছাড়পত্র ছাড়া রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্ট পরিচালনার অভিযোগে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে বিভিন্ন সময়ে আরও ২৬টি রিসোর্ট ও ১০টি রেস্টুরেন্টকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। নির্দেশনা অমান্য করায় ১৪টি রিসোর্টকে জরিমানা করা হয় এবং দুটি রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। বাকি ১০টি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হলেও তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ১৯৯৯ সালে মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন সৈকত এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে সরকার। ওই এলাকায় টুপটুপসহ একাধিক রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধের উদ্যোগ নিতে গিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন বলেও তাঁদের দাবি। এ অভিযোগের সত্যতা ও প্রভাব নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিমানার তালিকায় রয়েছে রামুর সাম্পান বিচ রিসোর্ট, নিসর্গ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, উখিয়ার সি পার্লস বীচ রিসোর্ট, সি পার্ল বীচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা এবং টেকনাফের জাহাজপুরা ক্যাসলসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া কলাতলীর জিডি সমুদ্র বিলাস, মায়াবী বীচ রিসোর্ট, টাইটান হোটেল, হোটেল জানা ডাডা ও হোটেল স্যুট সাদাফকেও বিভিন্ন অঙ্কের জরিমানা করা হয়েছে। হিমছড়ি ও ইনানী এলাকার কয়েকটি রিসোর্ট এবং নির্মাণাধীন হোটেলকেও নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।
এসব তথ্য মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন এলাকায় পরিবেশগত আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। নোটিশ ও জরিমানা যদি অনিয়ম বন্ধ করতে না পারে, তাহলে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব কোন সংস্থার, সেই সংস্থার ক্ষমতা কতটুকু এবং বাস্তবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—তা জনসমক্ষে স্পষ্ট করা জরুরি।
মেরিন ড্রাইভে ১৫০ অবৈধ হোটেল-রিসোর্ট : কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত প্রায় ৮০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে বিপুলসংখ্যক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. জসিম উদ্দিন জানান, তাঁদের তালিকায় দোকানপাটসহ প্রায় ১৫০টি অবৈধ হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে।
তিনি বলেন, টুপটুপ রেস্টুরেন্টকে এর আগে দুই দফায় স্থাপনা ভেঙে ফেলার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির কোনো অনুমোদন ছিল না। আগামী সপ্তাহ থেকে অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এখানে প্রশ্ন শুধু টুপটুপ রিসোর্টকে ঘিরে নয়। দুই দফা স্থাপনা অপসারণের নোটিশের পরও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কীভাবে চলেছে? একইভাবে, প্রায় ১৫০টি অবৈধ স্থাপনার তালিকা থাকার পর সেগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে এত দিন কী বাধা ছিল? তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদন, স্থাপনার বৈধতা এবং আইন প্রয়োগের অগ্রগতি প্রকাশ করা হলে পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পরিবেশ আইনে নোটিশ ও জরিমানা করার সুযোগ থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা উচ্ছেদ করার এখতিয়ার তাঁদের নেই। এ ক্ষেত্রে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আইনি ক্ষমতা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ক্ষমতা ও দায়িত্বের এই বিভাজন কার্যকর সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। একটি সংস্থা অনিয়ম শনাক্ত করার পর অন্য সংস্থার দায়িত্ব কীভাবে সক্রিয় হবে, তার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে আইন প্রয়োগ কাগজপত্রেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
নোটিশ, জরিমানা, সতর্কবার্তা—তারপরও রিসোর্ট চালু, জবাবদিহি কার? : টুপটুপ রিসোর্টে ১০ পর্যটকের মৃত্যুতে সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি শুধু আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হলো, তা নয়; বরং সম্ভাব্য ঝুঁকির তথ্য ও অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পরও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কীভাবে অব্যাহত থাকল। ফায়ার সার্ভিসের সতর্কবার্তা, পরিবেশ অধিদপ্তরের বন্ধের নোটিশ ও এক লাখ টাকা জরিমানা এবং কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দুই দফা স্থাপনা অপসারণের নোটিশ—এসব তথ্য সত্য হলে প্রশাসনিক পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
একটি প্রতিষ্ঠান ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব কেবল নোটিশ জারি করা বা জরিমানা আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। ঝুঁকি দূর হয়েছে কি না, প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেয়েছে কি না এবং নির্দেশনা অমান্য করলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না—এসব নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর ছিল, তার জবাব প্রয়োজন।
এখানে প্রশাসনিক দায় নির্ধারণের জন্য কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জরুরি। ফায়ার সার্ভিসের সতর্কবার্তার পর পুনরায় পরিদর্শন করা হয়েছিল কি? অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি দূর না হলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল কি? পরিবেশ অধিদপ্তরের বন্ধের নোটিশ ও জরিমানার পর কার্যক্রম অব্যাহত থাকার বিষয়টি কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসন জানত কি? দুই দফা স্থাপনা অপসারণের নোটিশের পর বাস্তবায়নমূলক পদক্ষেপ নেওয়া না হয়ে থাকলে তার কারণ কী? দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে তার দায় কার?
এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। তবে শুধু নোটিশ ও জরিমানার তথ্য দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শেষ হয়েছে বলেও ধরে নেওয়া যায় না। কোন দপ্তরের হাতে কী ধরনের আইনগত ক্ষমতা ছিল, কে কোন পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন এবং সেই দায়িত্ব পালনে কোথাও অবহেলা হয়েছিল কি না—তা নথিপত্র ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।
বিশেষ করে, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একাধিক দপ্তরের ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য থাকার পরও যদি অনিয়ম চলতে থাকে, তাহলে সেই ব্যবস্থা কেন কার্যকর হয়নি, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাকে জানিয়েছিল কি না, কার্যকর সমন্বয়ের চেষ্টা করেছিল কি না এবং ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত থাকার পরও কোনো নিষ্ক্রিয়তা ছিল কি না—এসবই তদন্তের অংশ হওয়া উচিত।
রিসোর্টের মালিক, ব্যবস্থাপক কিংবা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সম্ভাব্য দায়ের পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকাও যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আইনগত দায়িত্ব, তাঁর জানা তথ্য, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং গৃহীত বা গৃহীত না হওয়া পদক্ষেপের সঙ্গে প্রাণহানির সম্পর্ক প্রমাণের ভিত্তিতেই দায় নির্ধারণ করতে হবে।
দশটি প্রাণহানির পর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো—আগাম সতর্কতা, প্রশাসনিক নোটিশ ও আর্থিক জরিমানা যদি ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম বন্ধ করতে না পারে, তাহলে মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা কোথায়? তদন্ত কমিটির কাছে তাই শুধু আগুনের উৎস ও অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি নির্ধারণই যথেষ্ট নয়; সতর্কবার্তা থেকে দুর্ঘটনার দিন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের পদক্ষেপের ধারাবাহিক পর্যালোচনাও প্রয়োজন। কোন পর্যায়ে কী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল, কে সেই ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন এবং কেন তা কার্যকর হয়নি—প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে আসা উচিত।
মালিক থেকে প্রশাসন—দায় নির্ধারণ হবে কীভাবে? : কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, রিসোর্টটির রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তদন্তে আগুনের সূত্রপাত ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণ, অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থার অবস্থা এবং প্রাণহানির পেছনে কোনো অবহেলা বা নিরাপত্তাগত ঘাটতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থাপনাটির নির্মাণ ও ব্যবহারসংক্রান্ত অনুমোদন, ব্যবসায়িক নিবন্ধন, পরিবেশগত ছাড়পত্র, ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং আগের নোটিশের পর গৃহীত পদক্ষেপের নথিও পর্যালোচনা করা জরুরি।
জালিয়া পালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এসএম সৈয়দ আলম জানিয়েছেন, জায়গাটির মালিকানা নিয়ে বিরোধ ছিল। এ ক্ষেত্রে জমির মালিকানা, রিসোর্ট পরিচালনার অধিকার এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার ওপর ছিল, তা নির্ধারণ করতে হবে।
কক্সবাজারে টুপটুপ রিসোর্টে আগুনের ঘটনায় মালিক তানভীর আহমদকে প্রধান আসামি করে উখিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে। পুলিশ হেফাজতে থাকা রিসোর্টে ম্যানেজার সুমনকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
কক্সবাজার পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের পরই আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।
তবে তদন্ত শুধু ম্যানেজারের দায়িত্বে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা, নিরাপত্তাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং পূর্ববর্তী সতর্কবার্তা সম্পর্কে তাঁদের জানা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩০৪ক ধারায় অবহেলাজনিত কাজের কারণে মৃত্যু ঘটলে শাস্তির বিধান রয়েছে। একইভাবে, দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা তাঁদের আইনগত দায়িত্ব অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন কি না, সেটিও যাচাই করা জরুরি। নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে কি না, তা বিবেচনা করতে হবে। তদন্তে কোনো ব্যক্তিকে আগাম দায়ী না করে প্রমাণ, নথিপত্র ও আইনগত দায়িত্বের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করাই ন্যায়সংগত পদ্ধতি।
আইন আছে, প্রয়োগ নিশ্চিত করাই এখন চ্যালেঞ্জ : বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ১২ ধারায় প্রযোজ্য প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে টুপটুপ রিসোর্টের ক্ষেত্রে ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক ছিল কি না, তা সংশ্লিষ্ট বিধিমালা, প্রতিষ্ঠানের শ্রেণি ও নথিপত্র যাচাই করে নির্ধারণ করতে হবে।
বাংলাদেশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ আইন, ২০১৪-তেও নিবন্ধন ও লাইসেন্সসংক্রান্ত বিধান রয়েছে। একইভাবে, অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন, ২০০৩ অনুযায়ী রিসোর্টটির নির্মাণ, নকশা ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী ধরনের অগ্নিনিরাপত্তা অনুমোদন প্রয়োজন ছিল, তা যাচাই করা জরুরি।
এখানে মূল প্রশ্ন শুধু কোনো লাইসেন্স বা ছাড়পত্র ছিল কি না, তা নয়; কোন অনুমোদন আইনত বাধ্যতামূলক ছিল, সেগুলো ছাড়া কীভাবে কার্যক্রম চলেছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত দায়িত্ব কী ছিল, তারও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
হোটেল-রিসোর্টের সংখ্যা জানে না প্রশাসন : উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, ‘ইনানীতে ঠিক কতটি রিসোর্ট রয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান উপজেলা প্রশাসনের কাছে নেই। হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট নির্মাণ ও পরিচালনার বিষয়টি জেলা প্রশাসনের বাণিজ্য শাখা, পরিবেশ অধিদফতর, ফায়ার সার্ভিস ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। শনিবারের অগ্নিকাণ্ডের পর উপজেলা প্রশাসন রিসোর্টগুলোর সঠিক তালিকা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেবে।’
তদন্তের পর কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি : টুপটুপ রিসোর্টে ১০ পর্যটকের মৃত্যু কেবল একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নয়; এটি পর্যটনকেন্দ্রে নিরাপত্তাব্যবস্থা, আইন প্রয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিশেষ করে, আগেই ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করার পরও যদি প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না হয়ে থাকে, তাহলে সেই ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি।
স্বজনহারা পরিবারগুলোর কাছে কোনো ক্ষতিপূরণই প্রিয়জনের শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না। তবু প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, দায় নির্ধারণ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
এ জন্য তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ, আগের নোটিশ ও জরিমানার পর নেওয়া পদক্ষেপের তথ্য প্রকাশ এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি পর্যটন এলাকার হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁর অগ্নিনিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং জরুরি বহির্গমনব্যবস্থা নিয়মিত যাচাই করতে হবে। অনুমোদনহীন স্থাপনার তালিকা হালনাগাদ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
টুপটুপ রিসোর্টে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় দায় কার, তা তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত। তবে মানুষের জীবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং আইন প্রয়োগে কোনো ঘাটতি থাকলে তার জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। স্বজনহারা পরিবারগুলোর ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা পূরণে তদন্ত যেন কেবল অগ্নিকাণ্ডের কারণ নির্ধারণে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং আগের সতর্কবার্তা, অনুমোদনহীন কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বও যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা হয়।
- মুক্তি'র প্রশিক্ষণে উখিয়ায় ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদন করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী খামারিরা
- নৌকা না পেয়ে স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচনের ঘোষণা কক্সবাজার জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি বাহাদুরের
❓ সাধারণ জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: ১০ পর্যটকের মৃত্যুর দায় নেবে কে? সম্পর্কিত তথ্য কী?
উত্তর: অবকাশযাপনে যায় স্বস্তি ও আনন্দের খোঁজে। পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে, সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। কিন্তু কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পা। মূল সংবাদ থেকে বিস্তারিত জানুন।




মন্তব্য করুন