হোম ট্রেন্ডিং লাইভ অনুসন্ধান মেনু
প্রতি মুর্হুতের কক্সবাজারকে জানুন
🔔 নোটিফিকেশন সাবস্ক্রিপশন ×
🔔

নতুন খবর সবার আগে আপনার ফোনে পান!

বিউমন্টের নিঃশব্দ সংলাপ – DesheBideshe

প্রতিবেদকের নাম:

প্রতিবেদকের নাম:

সোমবার, ২৫ আগস্ট ২০২৫, ০৭:২০ অপরাহ্ন


শেখ আবির হোসেন

টেক্সাসের পূর্ব প্রান্তে, লুইজিয়ানা সীমান্তঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বিউমন্ট শহরটি যেন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলা এক নীরব জনপদ। শহরের বুক চিরে বয়ে গেছে নিওচেস নদী, আর আশপাশে ছড়িয়ে আছে ছিমছাম বাড়িঘর, নির্জন উপশহর, সরু ফাঁকা রাস্তা। শীতকালে এই শহর হয়ে ওঠে আরও সংযত—রাতের শিশির জমে থাকে গাড়ির কাচে, আর সকালের কুয়াশা ঢেকে দেয় পাথরের বাড়ির দেয়াল, বাসস্টপের বেঞ্চ, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা নিস্তব্ধ পাইনগাছগুলোকে।

ডিসেম্বরে এই শহরের বাতাসে থাকে এক ধরনের স্থবিরতা—যা ঠিক বিষণ্ন নয়, বরং গভীর। বড়দিন পেরিয়ে যাওয়া শহর তখন থেমে থাকে নতুন বছরের প্রহর গুনতে গুনতে। দোকানের ঝলমলে আলো ঝিমিয়ে আসে, সময়ের আগে রেস্তোরাঁর আসন খালি হতে থাকে, এবং প্রতিটি দোকানপাট সন্ধ্যার পর নিঃশব্দ এক অভ্যাসে মিশে যায় রাতের অন্ধকারে।

বিউমন্টের এই নিস্তব্ধ দৃশ্যপটেই গড়ে উঠছিল এক তরুণ গবেষকের একাকী জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়। এই শহরের এক কোনায়, একটি দোকানে পার্টটাইম কাজ করেন শেখ আবির হোসেন—৩৪ বছরের যুবক। তিনি একজন গবেষক, একজন ছাত্র, যিনি মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণে ব্রত ছিলেন। যিনি বিশ্বাস করতেন জীবনকে ঘাম আর জ্ঞানের সমন্বয়ে গড়ে তোলা যায়। তিনি জানতেন না, নিঃশব্দ এই শহর এক রাতে তাঁর সব শব্দ কেড়ে নেবে।

আরও পড়ুন

৭ নভেম্বর উপলক্ষে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের শ্রদ্ধা

২৯ ডিসেম্বর, ২০২৩। রাত ১০টা। শহরের দক্ষিণপ্রান্তে অবস্থিত ছোট্ট দোকানের ভেতরে তখন দিনের শেষ হিসাব মেলাচ্ছিলেন আবির হোসেন। দোকানে আর কেউ ছিল না। দুই মুখোশধারী প্রবেশ করে। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একজন তাকে কাউন্টারের পেছনে যেতে বলে, অস্ত্র তাক করে। আবির মৃদুভাবে বাধা দেন। সেই মুহূর্তে ঘটে চূড়ান্ত ট্র্যাজেডি। ঠান্ডা মাথায় তাঁর বুক লক্ষ্য করে দুটি গুলি চালায় সন্ত্রাসীরা।

কন্যা আর্শিয়ার সাথে বাবা আবির

আবির হোসেন ছিলেন ল্যামার ইউনিভার্সিটির একজন গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং পিএইচডি ছাত্র। তিনি পড়ছিলেন ব্যবসায় প্রশাসনে, টেক্সাসে বসবাস করতেন ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে। যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য। স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হবেন, গবেষণা করবেন, এমন কিছু সৃষ্টি করবেন যা মানুষ ও সমাজের উপকারে আসবে।

এই মানুষটির একটি পরিচয় ছিল আর্থিক সংকটের সঙ্গেও। প্রবাসে পড়াশোনা করার খরচ, বাসস্থান, খাবার, স্বাস্থ্য, বই, সফটওয়্যার—সবকিছুর পেছনে হিসাব করতে হতো। তাই তিনি কাজ নিয়েছিলেন বিউমন্ট শহরের একটি ছোট দোকানে—ক্রিস ফুড মার্টে। সন্ধ্যার পর কাজ, দিনে বিশ্ববিদ্যালয়, মাঝখানে নিজের পড়া, গবেষণা, আর দুঃখ চেপে রাখা চিঠিগুলো স্ত্রীর জন্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীদের সংগঠন আয়োজিত নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কমিউনিটি ডিনারে তিনি অংশ নিতেন। কিন্তু সে সবের বাইরেও তাঁর ছিল এক নিঃসঙ্গ যুদ্ধ—যা অনেকেই টের পায়নি।

খুনি রবিনসন (বাঁয়ে) ও তার সহযোগি ল্যারি হ্যাগান (ডানে)

তাঁর স্ত্রী ও দুই বছরের ছোট্ট কন্যা থাকতেন নিউ ইয়র্কে। এক ফ্ল্যাটে, স্ত্রী সানজিদা থাকতেন তাঁর পরিবারের সঙ্গে। আবির চাইতেন তারা যেন নিরাপদ থাকে। টেক্সাসের খরচ কম, নিউ ইয়র্কে কাজ পাওয়া সহজ—এই সমন্বয়েই চলছিল সংসার। নিউ ইয়র্কের একটি ফ্ল্যাটে বসে সানজিদা আবিরের শেষ ইমেলটি খুললেন—যেখানে লেখা ছিল, ‘আর ক’টা মাস, তারপর আমরা একসাথে হবো…’ দুই বছরের আর্শিয়া বাবার মুখ মনে করতে পারে না। স্ত্রী বলেছিলেন, “সে শুধু ভালো একজন স্বামী নয়, একজন দায়িত্ববান মানুষ। আমাদের জন্য প্রতিটি দিন সে লড়ত।”

পুলিশ হত্যাকান্ডের ভিডিও প্রকাশ করে। ফোনে পাওয়া যায় পরিকল্পনার চিহ্ন—তাদের আগেই এই ডাকাতির ছক ছিল। পুলিশের দায়ের করা লিখিত রিপোর্টে বলা হয়, এটি ছিল পরিকল্পিত সহিংসতা। আবিরকে হত্যা করা হয় ঠান্ডা মাথায়।

কোর্ট রেকর্ডে উঠে আসে রবিনসনের অতীত—আগে সে এক ডাকাতির মামলায় পাঁচ বছরের প্রবেশনে ছিল। সেই শাস্তি চলার মাঝেই এই হত্যাকাণ্ড। খুনি রবিনসনকে অল্পসময়ের মধ্যে পুলিশ গ্রেফতার করে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ল্যারি হ্যাগানকে নিউ অরলিন্স থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

শেখ আবির হোসেন এখন নেই। ল্যামার ইউনিভার্সিটির এক কোণে, হয়তো কোনো ছাত্র আজ তাঁর টেবিলে বসে, জানে না, সেই চেয়ারটি একসময় আবিরের ছিল।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৩ সালে ৪০,০০০-এর বেশি মানুষ গুলিতে মারা গেছে। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়—প্রতিটি নামের পেছনে আছে আবিরের মতো মুখ।


coxsbazarpost

coxsbazarpost

কক্সবাজারের স্থানীয় সাংবাদিকতা ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের বিশ্বস্ত লেখক।

সত্যতা যাচাই: এই সংবাদটি সম্পাদকীয় নীতি অনুসরণ করে বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

সংবাদ কিউআর কোড

নিচের QR কোডটি স্ক্যান করে যেকোনো মোবাইলে সংবাদটি সরাসরি ওপেন করুন।

ফটোকার্ড স্টুডিও

২য় লীড নিউজ
Card Image

বিউমন্টের নিঃশব্দ সংলাপ – DesheBideshe

www.coxsbazarposts.com সত্যের সন্ধানে অনুক্ষণ

প্রিন্ট প্রিভিউ

Logo www.coxsbazarposts.com

বিউমন্টের নিঃশব্দ সংলাপ – DesheBideshe

প্রতিবেদক: প্রতিবেদকের নাম: | প্রকাশিত: সোমবার, ২৫ আগস্ট ২০২৫, ০৭:২০ অপরাহ্ন
Print Image
[ad_1] শেখ আবির হোসেনটেক্সাসের পূর্ব প্রান্তে, লুইজিয়ানা সীমান্তঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বিউমন্ট শহরটি যেন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলা এক নীরব জনপদ। শহরের বুক চিরে বয়ে গেছে নিওচেস নদী, আর আশপাশে ছড়িয়ে আছে ছিমছাম বাড়িঘর, নির্জন উপশহর, সরু ফাঁকা রাস্তা। শীতকালে এই শহর হয়ে ওঠে আরও সংযত—রাতের শিশির জমে থাকে গাড়ির কাচে, আর সকালের কুয়াশা ঢেকে দেয় পাথরের বাড়ির দেয়াল, বাসস্টপের বেঞ্চ, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা নিস্তব্ধ পাইনগাছগুলোকে।ডিসেম্বরে এই শহরের বাতাসে থাকে এক ধরনের স্থবিরতা—যা ঠিক বিষণ্ন নয়, বরং গভীর। বড়দিন পেরিয়ে যাওয়া শহর তখন থেমে থাকে নতুন বছরের প্রহর গুনতে গুনতে। দোকানের ঝলমলে আলো ঝিমিয়ে আসে, সময়ের আগে রেস্তোরাঁর আসন খালি হতে থাকে, এবং প্রতিটি দোকানপাট সন্ধ্যার পর নিঃশব্দ এক অভ্যাসে মিশে যায় রাতের অন্ধকারে।বিউমন্টের এই নিস্তব্ধ দৃশ্যপটেই গড়ে উঠছিল এক তরুণ গবেষকের একাকী জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়। এই শহরের এক কোনায়, একটি দোকানে পার্টটাইম কাজ করেন শেখ আবির হোসেন—৩৪ বছরের যুবক। তিনি একজন গবেষক, একজন ছাত্র, যিনি মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণে ব্রত ছিলেন। যিনি বিশ্বাস করতেন জীবনকে ঘাম আর জ্ঞানের সমন্বয়ে গড়ে তোলা যায়। তিনি জানতেন না, নিঃশব্দ এই শহর এক রাতে তাঁর সব শব্দ কেড়ে নেবে।২৯ ডিসেম্বর, ২০২৩। রাত ১০টা। শহরের দক্ষিণপ্রান্তে অবস্থিত ছোট্ট দোকানের ভেতরে তখন দিনের শেষ হিসাব মেলাচ্ছিলেন আবির হোসেন। দোকানে আর কেউ ছিল না। দুই মুখোশধারী প্রবেশ করে। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একজন তাকে কাউন্টারের পেছনে যেতে বলে, অস্ত্র তাক করে। আবির মৃদুভাবে বাধা দেন। সেই মুহূর্তে ঘটে চূড়ান্ত ট্র্যাজেডি। ঠান্ডা মাথায় তাঁর বুক লক্ষ্য করে দুটি গুলি চালায় সন্ত্রাসীরা।কন্যা আর্শিয়ার সাথে বাবা আবিরআবির হোসেন ছিলেন ল্যামার ইউনিভার্সিটির একজন গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং পিএইচডি ছাত্র। তিনি পড়ছিলেন ব্যবসায় প্রশাসনে, টেক্সাসে বসবাস করতেন ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে। যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য। স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হবেন, গবেষণা করবেন, এমন কিছু সৃষ্টি করবেন যা মানুষ ও সমাজের উপকারে আসবে।এই মানুষটির একটি পরিচয় ছিল আর্থিক সংকটের সঙ্গেও। প্রবাসে পড়াশোনা করার খরচ, বাসস্থান, খাবার, স্বাস্থ্য, বই, সফটওয়্যার—সবকিছুর পেছনে হিসাব করতে হতো। তাই তিনি কাজ নিয়েছিলেন বিউমন্ট শহরের একটি ছোট দোকানে—ক্রিস ফুড মার্টে। সন্ধ্যার পর কাজ, দিনে বিশ্ববিদ্যালয়, মাঝখানে নিজের পড়া, গবেষণা, আর দুঃখ চেপে রাখা চিঠিগুলো স্ত্রীর জন্য।বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীদের সংগঠন আয়োজিত নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কমিউনিটি ডিনারে তিনি অংশ নিতেন। কিন্তু সে সবের বাইরেও তাঁর ছিল এক নিঃসঙ্গ যুদ্ধ—যা অনেকেই টের পায়নি।খুনি রবিনসন (বাঁয়ে) ও তার সহযোগি ল্যারি হ্যাগান (ডানে)তাঁর স্ত্রী ও দুই বছরের ছোট্ট কন্যা থাকতেন নিউ ইয়র্কে। এক ফ্ল্যাটে, স্ত্রী সানজিদা থাকতেন তাঁর পরিবারের সঙ্গে। আবির চাইতেন তারা যেন নিরাপদ থাকে। টেক্সাসের খরচ কম, নিউ ইয়র্কে কাজ পাওয়া সহজ—এই সমন্বয়েই চলছিল সংসার। নিউ ইয়র্কের একটি ফ্ল্যাটে বসে সানজিদা আবিরের শেষ ইমেলটি খুললেন—যেখানে লেখা ছিল, ‘আর ক’টা মাস, তারপর আমরা একসাথে হবো…’ দুই বছরের আর্শিয়া বাবার মুখ মনে করতে পারে না। স্ত্রী বলেছিলেন, “সে শুধু ভালো একজন স্বামী নয়, একজন দায়িত্ববান মানুষ। আমাদের জন্য প্রতিটি দিন সে লড়ত।”পুলিশ হত্যাকান্ডের ভিডিও প্রকাশ করে। ফোনে পাওয়া যায় পরিকল্পনার চিহ্ন—তাদের আগেই এই ডাকাতির ছক ছিল। পুলিশের দায়ের করা লিখিত রিপোর্টে বলা হয়, এটি ছিল পরিকল্পিত সহিংসতা। আবিরকে হত্যা করা হয় ঠান্ডা মাথায়।কোর্ট রেকর্ডে উঠে আসে রবিনসনের অতীত—আগে সে এক ডাকাতির মামলায় পাঁচ বছরের প্রবেশনে ছিল। সেই শাস্তি চলার মাঝেই এই হত্যাকাণ্ড। খুনি রবিনসনকে অল্পসময়ের মধ্যে পুলিশ গ্রেফতার করে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ল্যারি হ্যাগানকে নিউ অরলিন্স থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।শেখ আবির হোসেন এখন নেই। ল্যামার ইউনিভার্সিটির এক কোণে, হয়তো কোনো ছাত্র আজ তাঁর টেবিলে বসে, জানে না, সেই চেয়ারটি একসময় আবিরের ছিল।উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৩ সালে ৪০,০০০-এর বেশি মানুষ গুলিতে মারা গেছে। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়—প্রতিটি নামের পেছনে আছে আবিরের মতো মুখ। [ad_2]

ডাইরেক্ট মেসেজ

Telegram Direct Message WhatsApp Direct Message

বাংলা ফন্ট কনভার্টার (বিজয় ⇄ ইউনিকোড)

×

তথ্য

×