উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশি কমিউনিটির কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন হলে কত প্রস্তুতি, কত ব্যস্ততা! মিলনায়তন ভাড়া থেকে শুরু করে মঞ্চসজ্জা, ব্যানার, ফুলের তোড়া, খাবারদাবার, শিল্পীদের সম্মানী, অতিথিদের আপ্যায়ন, সবকিছুর জন্যই থাকে আলাদা বাজেট। আয়োজকদের কেউ কেউ অনুষ্ঠান সফল করতে হাজার হাজার ডলার ব্যয় করেন। বড় আয়োজনের ক্ষেত্রে সেই ব্যয় লাখ ডলারও ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু অনুষ্ঠানটির প্রচার-প্রচারণার প্রসঙ্গ উঠলেই যেন হিসাবের খাতা বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষ করে বাংলা গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য অনেক আয়োজনে কোনো বরাদ্দই থাকে না। অথচ সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন গণমাধ্যমের কাছ থেকে প্রচার পাওয়া যেনো আয়োজকদের এক অলিখিত অধিকার।
সম্প্রতি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ঠিকানা পত্রিকার সম্পাদক এম এম শাহীন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি প্রশ্ন তুলেছেন। সবকিছুর বাজেট আছে, মিডিয়ার জন্য কেন শুধু ‘ফ্রি’? তাঁর প্রশ্নটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশি কমিউনিটির গণমাধ্যমকে ঘিরে। কিন্তু কানাডার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, একই চিত্র এখানেও বিদ্যমান। কোথাও কম, কোথাও বেশি। দুই দেশের বাংলাদেশি কমিউনিটির গণমাধ্যমগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রায় একই ধরনের অবহেলা ও অযৌক্তিক প্রত্যাশার মুখোমুখি হচ্ছে।
যাত্রাবাড়ীতে ড্রাইভারের চোখ নষ্টের মামলায় আনিসুল হক ও পলক গ্রেপ্তার
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় বাংলাদেশিদের বিভাগ, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এসএসসি-এইচএসসি ব্যাচ, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী পরিচয় ঘিরে অসংখ্য সংগঠন গড়ে উঠেছে। বছরজুড়ে এসব সংগঠনের সভা, সম্মেলন, নির্বাচন, অভিষেক, বনভোজন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলার আয়োজন চলে। এসব অনুষ্ঠানের জন্য অর্থ সংগ্রহ ও স্পন্সর নেওয়া হয়। অথচ যে গণমাধ্যমগুলো এসব আয়োজনের খবর হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়, তাদের বিজ্ঞাপন দেওয়ার বিষয়টি অনেক আয়োজকের পরিকল্পনাতেই থাকে না। বরং তাঁদের ধারণা, সংগঠনের কর্মকাণ্ড, নেতাদের বক্তব্য ও ছবি তুলে ধরাই যেন গণমাধ্যমের দায়িত্ব।
একটি সংবাদ পাঠকের হাতে কিংবা দর্শকের পর্দায় পৌঁছানোর পেছনে কত মানুষের শ্রম জড়িয়ে থাকে, সে হিসাব অনেকেই জানেন না। একজন সাংবাদিককে অনুষ্ঠানস্থলে যেতে হয়, কখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। বক্তব্য শোনা, তথ্য সংগ্রহ, নাম-পদবি যাচাই, ছবি তোলা এবং প্রতিবেদন লেখা, প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন হয় সময় ও দক্ষতার। টেলিভিশন ও ডিজিটাল গণমাধ্যমে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ভিডিও ধারণ, স্ক্রিপ্ট লেখা, কণ্ঠ সংযোজন, সম্পাদনা, গ্রাফিক্স ও সম্প্রচারের প্রস্তুতি। দর্শক হয়তো তিন মিনিটের একটি সংবাদ দেখলেন, অথচ সেই তিন মিনিটের পেছনে রয়েছে কয়েকজন পেশাদার মানুষের কয়েক ঘণ্টার শ্রম, মূল্যবান প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। জনস্বার্থে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশ করা গণমাধ্যমের পেশাগত দায়িত্ব। সংবাদ প্রকাশের বিনিময়ে সাংবাদিকের হাতে অর্থ তুলে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। কোন ঘটনা সংবাদযোগ্য, তা নির্ধারণ করবেন সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের সম্পাদক ও সংবাদকর্মীরা। কিন্তু কোনো সংগঠন নিজেদের প্রচারের উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠান আয়োজন করলেই তার সংবাদ প্রকাশ করা গণমাধ্যমের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব হয়ে যায় না। আয়োজকেরা যদি নিজেদের কর্মকাণ্ডের নিশ্চিত প্রচার চান, তাহলে সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়াটাই উত্তম। সেটি হতে পারে পত্রিকা কিংবা অনলাইনে বিজ্ঞাপন, অথবা টেলিভিশনের জন্য বিশেষ প্রচারমূলক ভিডিও। সংবাদ থাকবে সংবাদ হিসেবে, বিজ্ঞাপন থাকবে বিজ্ঞাপন হিসেবে। এতে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও পেশাগত মর্যাদা উভয়ই অক্ষুণ্ণ থাকবে।
সমস্যা হলো, অনেক সংগঠক এই পার্থক্যটি বুঝতে চান না। তাঁদের ধারণা, অনুষ্ঠান আয়োজন করলেই সংবাদমাধ্যমকে উপস্থিত থাকতে হবে, সংবাদ প্রকাশ ও ছবি-ভিডিও প্রচার করতে হবে। অথচ সংবাদমূল্য নির্ভর করে ঘটনার গুরুত্ব, প্রাসঙ্গিকতা ও জনস্বার্থের ওপর। কোনো সংগঠনের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক হওয়া সম্মানের, কিন্তু সেই পরিচয়ের সুবাদে গণমাধ্যমে প্রচার পাওয়াকে ব্যক্তিগত অধিকার মনে করার সুযোগ নেই।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমন্ত্রণ জানানোর এক অদ্ভুত সংস্কৃতি। একসময় সংগঠনের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র কিংবা ইমেইল পাঠানো হতো। সেখানে অনুষ্ঠানের বিস্তারিত তথ্য থাকত। প্রয়োজনে ফোন করেও উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানানো হতো। এখন অনেকে হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা মেসেঞ্জারে একটি টিকিট বা পোস্টারের ছবি পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন। কেউ কেউ আবার সঙ্গে লিখে দেন, ‘কোনো টিকিট লাগবে না।’ যেন বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ দেওয়াটাই গণমাধ্যমকে আমন্ত্রণ জানানোর যথেষ্ট সৌজন্য। অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য, আয়োজকদের পরিচয় কিংবা গণমাধ্যমের কাছে তাঁদের প্রত্যাশা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানোর প্রয়োজনও বোধ করেন না। আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণের শিষ্টাচার যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, কেউ কেউ কোনো গণমাধ্যমের প্রতিবেদক বা ক্যামেরাপারসন পাঠানোর অনুরোধ না করে সরাসরি প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধারকেই অনুষ্ঠান কাভার করার আমন্ত্রণ জানান। একজন সম্পাদক কিংবা গণমাধ্যমপ্রধানকে অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো অবশ্যই সৌজন্যের পরিচয়। কিন্তু তাঁকে উপস্থিত থেকে সংবাদ সংগ্রহ, ছবি তোলা বা ভিডিও ধারণের দায়িত্ব পালন করতে হবে, এমন প্রত্যাশা কতটা সংগত?
আরও একটি বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় সংবাদমাধ্যমগুলোকে। কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা সম্ভব না হলে অনেক আয়োজক অসন্তোষ প্রকাশ করেন। কেউ বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করেন, কেউ আবার অনুপস্থিতিকে তাঁদের প্রতি অসম্মান হিসেবেও বিবেচনা করেন। অথচ একটি সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব কর্মসূচি ও সংবাদ সংগ্রহের অগ্রাধিকার রয়েছে। একই দিনে একাধিক অনুষ্ঠানও থাকতে পারে। কোথায় সাংবাদিক পাঠানো হবে, সেটি নির্ধারণের অধিকার সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের। কোনো আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে না পারা মানেই আয়োজকদের অসম্মান করা নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে কথায় কথায় সংবাদ সম্মেলন কিংবা ‘মিট দ্য প্রেস’ আয়োজনের প্রবণতা বেশ প্রকট হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থাটিকে বিনামূল্যে প্রচার পাওয়ার সহজ উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সাংগঠনিক বিরোধ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন ডাকাও এখন যেন অত্যন্ত সহজ একটি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও বহিষ্কার, পাল্টা বহিষ্কার, কোথাও এক পক্ষের বিরুদ্ধে অন্য পক্ষের অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ। ব্যস, ডাক পড়ে সাংবাদিকদের। আজ এক পক্ষের সংবাদ সম্মেলন, কাল অন্য পক্ষের পাল্টা সংবাদ সম্মেলন। উভয় পক্ষই প্রত্যাশা করে, সাংবাদিকেরা সেখানে উপস্থিত থাকবেন, তাঁদের অভিযোগ শুনবেন, ছবি তুলবেন এবং বক্তব্যগুলো ফলাও করে প্রচার করবেন। সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তির দায়িত্বও যেন সংবাদমাধ্যমের কাঁধে এসে পড়েছে। অথচ এসব অভিযোগের কতটুকু জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট, কতটুকু ব্যক্তিগত আক্রোশ কিংবা নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, তা বিবেচনা করার প্রয়োজন আয়োজকেরা বোধ করেন না। নিজেদের সমস্যা নিজেরা মেটানোর পরিবর্তে সংবাদমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ ঘায়েল করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
কেউ কেউ মনে করেন, সাংবাদিকদের চা-সিঙ্গাড়া খাওয়ালেই দায়িত্ব শেষ। একটু বড় আয়োজন হলে মধ্যাহ্নভোজ কিংবা নৈশভোজের ব্যবস্থা থাকে। যেন সাংবাদিকদের উপস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় সব সৌজন্য দেখানো হয়ে গেল। অতিথি আপ্যায়ন অবশ্যই ভালো বিষয়, কিন্তু সেটিকে সংবাদমাধ্যমের প্রতি দায়িত্ব পালনের বিকল্প মনে করা উচিত নয়। সাংবাদিকেরা সংবাদ সম্মেলনে যান সংবাদ সংগ্রহ করতে। সেখানে সংবাদযোগ্য কিছু না থাকলে যত আয়োজনই করা হোক, তা প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নেই। একইভাবে চক্ষুলজ্জা কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে প্রতিটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সংস্কৃতিও পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
তবে গণমাধ্যমেরও আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। কমিউনিটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে কখনো কখনো সংবাদ ও প্রচারের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। কারও অনুরোধে গুরুত্বহীন সংবাদ প্রকাশ, ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে অনুষ্ঠানকে অতিরিক্ত প্রচার দেওয়া কিংবা সংবাদপত্র ও টেলিভিশনকে সংগঠনের মুখপত্রে পরিণত করার প্রবণতা গণমাধ্যমের মর্যাদাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই সংস্কৃতি পরিবর্তনের দায়িত্ব সংবাদমাধ্যমেরও। বিজ্ঞাপনকে বিজ্ঞাপন হিসেবে প্রকাশ করতে হবে, আর সংবাদকে রাখতে হবে সম্পাদনাগত স্বাধীনতার আওতায়।
ঠিকানা সম্পাদক এম এম শাহীনের উত্থাপিত প্রশ্নটি তাই নিছক বিজ্ঞাপন পাওয়ার দাবি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রবাসে বাংলা সাংবাদিকতার পেশাগত মর্যাদা, সংবাদমাধ্যমের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধের প্রশ্ন। একটি অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। কিন্তু সেই অনুষ্ঠানের সংবাদ, ছবি ও ভিডিও থেকে যায় দীর্ঘদিন। প্রবাসী সমাজের ইতিহাসের অসংখ্য অধ্যায় এভাবেই সংরক্ষিত হচ্ছে সংবাদমাধ্যমের পাতায় ও ডিজিটাল আর্কাইভে।
উত্তর আমেরিকায় বাংলা গণমাধ্যমের দীর্ঘ পথচলায় অনেক প্রতিষ্ঠান এসেছে, আবার হারিয়েও গেছে। যেসব প্রতিষ্ঠান এই পথচলা অব্যাহত রেখেছে, তাদের পেছনে রয়েছে বিপুল শ্রম, বিনিয়োগ, পেশাগত নিষ্ঠা এবং মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা। প্রবাসী সমাজ গঠনে ও জনমত তৈরিতে এসব গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাই সংগঠনগুলোর অনুষ্ঠানের বাজেটে বাংলা গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার জন্য বরাদ্দ রাখাকে কোনো অনুগ্রহ মনে করার কারণ নেই। এটি পারস্পরিক সম্মান ও সম্পর্কেরই অংশ। একই সঙ্গে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন, আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ ও সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও পেশাগত শিষ্টাচার বজায় রাখতে হবে।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে এই সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে উঠলেই উপকৃত হবে সমগ্র বাংলাদেশি কমিউনিটি।
এনএন/ ১৮ অক্টোবর ২০২৬
❓ সাধারণ জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: উত্তর আমেরিকায় বাংলা গণমাধ্যম কেন অবহেলার শিকার? সম্পর্কিত তথ্য কী?
উত্তর: উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশি কমিউনিটির কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন হলে কত প্রস্তুতি, কত ব্যস্ততা! মিলনায়তন ভাড়া থেকে শুরু করে মঞ্চসজ্জা, ব্যান। মূল সংবাদ থেকে বিস্তারিত জানুন।




মন্তব্য করুন