কক্সবাজারের চকরিয়া থানা হাজতে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস সহকারি দূর্জয় চৌধুরীর মৃত্যুর ঘটনায় থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি)সহ নয় জনের বিরুদ্ধে চকরিয়া থানায় মামলা নিতে পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
গতকাল রোববার (১৪ সেপ্টেম্বর) কক্সবাজারের
জেলা ও দায়রা জজ (ভারপ্রাপ্ত) মামুনুর রশীদ তাঁর আদালতে নালিশী মামলার শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
নিহত দূর্জয় চৌধুরীর মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা কমল চৌধুরী বাদি হয়ে চকরিয়া থানার সাবেক ওসিসহ নয় জন অজ্ঞাত ৪-৫ জনের বিরুদ্ধে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে এই নালিশী মামলাটি করেন।
বাদী পক্ষের কৌশলী কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী এডভোকেট বিশ্বজিৎ ভৌমিক মামলা রুজু করার আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি ঐক্য: অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে এনসিপি ছেড়েছেন তাসনিম জারা, তাজনূভা ও সামান্তা শারমিন
মামলার এজাহারে অভিযুক্ত করা হয়েছে, চকরিয়া থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ শফিকুল ইসলাম, থানার সহকারী উপ- পরিদর্শক (এএসআই) মো.হানিফ মিয়া, পুলিশ কনস্টেবল হোম্মদ মহিউদ্দীন, ইসরাক হোসেন, চকরিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা রাবেয়া খানম, সহকারি শিক্ষক মোঃ জসীম উদ্দিন, মোস্তফা কামাল, অফিস সহায়ক মোহাম্মদ পারভেজ, নৈশ প্রহরী নুর মোহাম্মদসহ অজ্ঞাতনামা ৪-৫ জন।
বাদিপক্ষের আইনজীবী বিশ্বজিৎ ভৌমিক বলেন, চকরিয়া থানা হাজতে স্কুলের অফিস সহকারী দুর্জয় চৌধুরীর মৃত্যুর ঘটনায় নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে থানার ওসি, এএসআই,দুই পুলিশ কনস্টেবল, সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষকা, সহকারী শিক্ষকসহ ৯ জনকে আসামি করে নিহতের বাবা কমল চৌধুরী বাদি হয়ে জজ আদালতে মামলার আবেদন করেন।
রোববার ১৪ সেপ্টেম্বর মামলার অভিযোগের বিষয়ে
শুনানি শেষে চকরিয়া থানায় মামলাটি রুজু করতে পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে মামলা রুজু করে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর তারিখের মধ্যে আদালতকে অবহিত করতে বলা হয়েছে আদেশে।
মামলার এজাহারে বাদি কমল চৌধুরী কতৃক অভিযোগ করা হয়েছে, তাঁর ছেলে চকরিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন দুর্জয় চৌধুরী। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং অফিস সহকারি নৈশপ্রহরী পরস্পর যোগসাজক্রমে তারা বিভিন্ন সময় বিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফান্ডের টাকা আত্মসাৎ করে আসছিল। তাদের অধীনে দুর্জয় চৌধুরীর ব্যবহারের কম্পিউটারে ডাটা সংরক্ষিত ছিল।
তাদের এ অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে জানতে পারলে দুর্জয় চৌধুরীকে বিদ্যালয় থেকে জোরপূর্বক চাকরি থেকে বাহির করে দেয়ার জন্য বিভিন্ন সময়ে অপচেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন। তারা দুর্জয় চৌধুরীকে বিদ্যালয়ের থেকে বিতাড়িত করিতে না পেরে পরম্পর যোগসাজসক্রমে দুর্জয়কে হত্যার ষড়যন্ত্র করতে থাকে।
এর ধারাবাহিকতায় গত ২১ আগস্ট পরিকল্পিতভাবে চকরিয়া থানা পুলিশের মাধ্যমে অধীনের ছেলে দুর্জয় চৌধুরীকে আটকানোর পরিকল্পনা করে। ওইদিন সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা দুর্জয় চৌধুরীকে ফোন করে স্কুলে নিয়ে যান। এসময় দুর্জয়ের ব্যবহৃত ল্যাপট সহ নিয়ে যায়। একইদিনে সকাল ১১ টায় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকা দুর্জয় চৌধুরী বাবা কমল চৌধুরীকে ফোন করে স্কুলে আসতে বললে তিনিও যান। স্কুলে অফিসে রুমে ডুকতে প্রধান শিক্ষকা রাবেয়া খানম আসামী বাল যে, তোমার ছেলে স্কুল টাকা আত্মসাৎ করেছে এ টাকা ফেরত দিতে হবে। তখন দুর্জয় চৌধুরী প্রতিবাদ করলে ধমক দিয়ে চুপ থাকতে বলেন।
এসময় কমল চৌধুরী শিক্ষকদের উদ্দেশ্য বলেন, আমার ছেলে স্কুলের টাকা আত্মসাৎ প্রমাণিত হয় তাহলে বাবা হিসাবে সকল টাকা পরিশোধ করবে মোখিক অঙ্গীকার করে বাড়িতে চলে আসেন।
মামলার এজাহারের অভিযোগে আরও জানা যায়, দুর্জয় চৌধুরী জেঠাত ভাই সঞ্জিবের কাছ থেকে জানাতে পারেন দুর্জয়কে প্রথমে চকরিয়া থানায় ও পরে সহকারি কমিশনার (ভূমি) রুপয়ান দেব কাছে নিয়ে যান। পরে সেখান থেকে একইদিন রাত ১০ টার দুর্জয়কে থানা-পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। দুর্জয়ের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ বা মামলা না থাকা এবং গ্রেফতারী পরোয়ানা না থাকা স্বত্ত্বেও ওসির নির্দেশ দুর্জয় চৌধুরীকে থানায় আটক করে রাখেন।
এর পরে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রাবেয়া খানমের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় থানায় অবৈধভাবে আটকে রেখে ওই দিন রাতে দুর্জয়কে শারীরিক নির্যাতনসহ শ্বাসরুদ্ধকরে হত্যা করা হয়। এর পরদিন ২২ আগস্ট ভোরে থানা পুলিশ দুর্জয় পরিবারের লোকজনকে খরব দেন দুর্জয় হাজতে আত্মহত্যা করেছে।
এদিকে দুর্জয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক থানা পৌঁছেন তার পরিবারের লোকজন। তখন দেখতে পান দুর্জয়ের দুই পা মাটিতে লাগানো আছে এবং দুই হাতও হাজতে গ্রীলের সাথে শক্তভাবে লাগানো অবস্থায় দেখতে পান। তার মৃত দেহ দেখে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পরস্পরের যোগাসাজশে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছেন বলে এজাহারে দাবি করেন দুর্জয় চৌধুরী বাবা কমল চৌধুরী।
মামলার বাদী কমল চৌধুরী বলেন, সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা রাবেয়া খানম ফোন করে আমার ছেলেকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে স্কুলে আসতে বাধ্যকরে। আমার ছেলের ল্যাপটপ ও ব্যাক্তিগত ব্যাগটা নিয়ে সকাল সাড়ে ৯টায় স্কুলে চলে যান। পরে সকাল ১১টার দিকে কল করে আমাকে স্কুলে যেতে বলেন স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা রাবেয়া খানম। ওখানে গিয়ে দেখি শিক্ষকরা সবাই বসে আছে তখন তারা বলেন আপনার ছেলে টাকা আত্মসাত করেছে। তখন আমি সকল শিক্ষকের সামনে বলি, আমার ছেলে যদি টাকা আত্মসাৎ করে, আমি সব টাকা পরিশোধ করবো, মুচলেকাও দিবো। প্রয়োজনে ওর চাকরি চলে যাক, কিন্তু আপনারা অন্যায়ভাবে কিছু করবেন না। রাতে চকরিয়া থানার পুলিশ কাছে সোপর্দ করেন। তারপর ওরা সবাই মিলে আমার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন।
উল্লেখ্য, গত ২১ আগস্ট বৃহস্পতিবার রাতে চকরিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর দুর্জয় চৌধুরী থানা হাজতে মৃত্যু হয়। তার বিরুদ্ধে ২ লাখ ৮৩ হাজার টাকা সরকারি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাবেয়া খানম থানায় একটি লিখিত অভিযোগ সহকারে দুর্জয়কে সোপর্দ করেন।
পরে শাররীক অসুস্থতা কারনে তাকে থানা হাজতের একটি আলাদা কক্ষে রাখা হয়েছিল। ভোররাতে নিজের পরনের শার্ট ব্যবহার করে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন দুর্জয় চৌধুরী। তবে তার রহস্যজনক মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দুর্জয় চৌধুরী পরিবার এই ঘটনায় গত ২৬ আগস্ট চকরিয়া থানায় এজাহার দায়ের করেন।
কিন্তু চকরিয়া থানায় মামলা হিসেবে রুজু না করায় দুর্জয় চৌধুরীকে হত্যার অভিযোগ তুলে গত ৯ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে চকরিয়া থানার সাবেক ওসিসহ ৯জনের বিরুদ্ধে নালিশী মামলা দায়ের করেন নিহতের বাবা কমল চৌধুরী। ##




মন্তব্য করুন