কানাডার সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ও প্রাণবন্ত শহরগুলোর একটি হচ্ছে টরন্টো। এখানে একটি সকালের গল্প শুরু হয় আইস স্কেটিং রিঙ্কে শিশুর হাসিতে, ডাউনটাউনের কফিশপে হোয়াইট চকোলেট মক্কাচিনো হাতে তরুণদের ক্যাম্পাসে ছুটে চলায়, কিংবা রাতের বেলায় কুইন ষ্ট্রিটের ব্যস্ত রেস্টুরেন্টের টেবিলে। এই শহর, যেখানে প্রতিটি ভাষা একেকটি সংস্কৃতির সুর তুলে ধরে।
রিজেন্ট পার্কের ডানডাস বা জেরার্ড এর স্ট্রিটকারে চড়ে যতই পূর্ব দিকে এগোনো যায়—ছড়িয়ে আছে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের বসতি; তার মধ্যে বিশেষভাবে লক্ষণীয় বাংলাদেশি পরিবারগুলোর ছায়াপথ।
এখানে একদিকে আছে গ্রোসারি, মসজিদ, রেষ্টুরেন্ট—চেনা সংস্কৃতির অবলম্বন; আর অন্যদিকে আছে হাইরাইজ কন্ডোর ঝলমলে লবি, সুশীল আধুনিকতা, আর দুই প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত।
নারায়ণগঞ্জে পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হাত-পা ভাঙল ও রগ কাটল মাদক কারবারিরা
একদিকে প্রথম প্রজন্মের বাবা-মায়েরা, যাদের চোখে কানাডা শুধু রুটি-রুজির দেশ, ধর্ম আর শেকড় রক্ষার লড়াই; অন্যদিকে আছে তাদের সন্তানেরা, যারা এই সমাজে বড় হয়েছে ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তাদের কাছে স্বাধীনতা, ভালোবাসা, পছন্দ, অধিকার এবং আত্মপরিচয় জীবনের অপরিহার্য অংশ। এই শহরে প্রতিটি বাড়ি, প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্ট যেন একটি দ্বৈত সংস্কৃতির নাট্যমঞ্চ।
এমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ছিল রিনা আক্তার। বয়স মাত্র বাইশ। বাংলাদেশের নোয়াখালির মেয়ে। যিনি সমাজকর্ম নিয়ে পড়াশোনা করতেন সেন্টেনিয়াল কলেজে।
এই গল্প সেই শহরের, সেই পরিবারের, সেই প্রজন্মের, যারা একে অপরকে বুঝতে পারেনি। এই গল্প রিনার জন্য—যার বিদায় আজও প্রতিধ্বনি তোলে টরন্টোর কংক্রিটের ফ্ল্যাটে, আর আমাদের বিবেকের দেয়ালে।
২৫ জুলাই ২০১৭। রিনা পরিবার ছেড়ে চলে যান প্রেমিকের বাসায়। ২৬ জুলাই বাবা ও মামা থানায় গিয়ে রিপোর্ট করেন যে তাদের মেয়ে “নিখোঁজ”। ২৮ জুলাই রিনাকে ফোন করে বলা হয়, শেষবারের মত একটি “আলোচনা” দরকার। সে বাড়িতে ফিরে আসে। এই ফেরা ছিল তার জীবনের শেষ ফেরা।
পরদিন, ২৯ জুলাই সকালে পুলিশ পায় একটি ফোন কল—গন্ধ বের হচ্ছে একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে। দরজা খুলে তারা আবিষ্কার করে একটি স্যুটকেস, যার ভিতরে ভরা ছিল রিনা আক্তারের নিথর দেহ। ময়নাতদন্ত জানায়, তাকে আগে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করা হয়, এরপর বাথরুমে নিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। তার গলায় ছিল প্লাস্টিক বন্ধনীর দাগ।
এই হত্যার নেপথ্যে পরিকল্পনা চলেছিল অন্তত ৪৮ ঘণ্টা। রিনার বাবা এবং মামা—দুজনেই প্রথমে অপরাধ অস্বীকার করলেও পরে পুলিশের ক্রস-প্রশ্নে এবং ফোন ট্যাপিং-এ ধরা পড়ে সব স্বীকার করেন।
আদালত এই মামলাকে First-Degree Murder হিসেবে বিবেচনা করে রিনার বাবা মুহাম্মদ পারভেজকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। সহযোগিতা করার জন্যে মামা ওয়াকিল চৌধুরীকে দেয় ১৫ বছরের কারাদণ্ড।
তিনি তার সাক্ষ্যে হত্যার পূর্ববর্তী দিন ও ঘটনাগুলোর বিবরণ তুলে ধরেন।
১) “হত্যার ৩ দিন আগে রিনা আপা বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলেন। বাবা তখন পুলিশে রিপোর্ট করেছিলেন যে তাকে ‘অপহরণ’ করা হয়েছে।”
২) “২৮ জুলাই সকালে বাবা তাকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘বাড়ি এসো, আমরা সব ভুলে যাব।’ কিন্তু আমি জানতাম, তারা মিথ্যা বলছে।”
৩) হত্যার দিনের ঘটনা: “আমি সেদিন বাড়িতে ছিলাম না, কিন্তু ফিরে দেখি অ্যাপার্টমেন্টের লিভিংরুমের কার্পেট নতুন করে পরিষ্কার করা হয়েছে।”
৪) “বাবা ও মামা আমাকে বলেছিলেন, ‘রিনা বাংলাদেশে চলে গেছে।’ কিন্তু তাদের চোখে আতঙ্ক দেখেছিলাম।”
৫) লাশ অপসারণের প্রমাণ: “পরের দিন আমি ডাস্টবিনে রক্তমাখা কাপড় ও গ্লাভস দেখতে পাই। মামা তা জোর করে আমার কাছ থেকে কেড়ে নেন।”
রিনার মৃত্যুর পর কানাডার গণমাধ্যমে এক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। CBC, Toronto Star, Vice Canada থেকে শুরু করে BBC অবধি এই ঘটনাকে ঘিরে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। Vice Canada একটি ডকুমেন্টারিও তৈরি করে—”The Tragic Case of Rina Akter” যেখানে প্রেমিকের সাক্ষাৎকার, গোপন অডিও রেকর্ডিং এবং কমিউনিটির নানা স্তরের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা হয়। Toronto Star-এর ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং এই কেসকে জাতীয় আলোচনায় এনেছিল।




মন্তব্য করুন