টানা তিন দিনের ভারী বর্ষণ ও বৈরী আবহাওয়ায়
দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন, বাজার, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসংলগ্ন এলাকা ও আবাসিক জনপদ পানিতে তলিয়ে গিয়ে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে হাজারো পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
অপরিকল্পিত ড্রেন নির্মাণ,পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া, খাল- নালা দখল, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনাকে এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহল।
সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণে কক্সবাজার জেলার অন্তত ৩৩টি ইউনিয়ন প্লাবিত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করেছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। পাহাড়ি ঢল, নদীর পানি বৃদ্ধি ও টানা বর্ষণে মহেশখালীসহ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। ড্রেন আছে,কিন্তু পানি নামার পথ নেই স্থানীয়দের অভিযোগ, মহেশখালীর অধিকাংশ এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অপরিকল্পিত।
কোথাও সরু ড্রেন, কোথাও অসমাপ্ত নির্মাণকাজ, আবার কোথাও ড্রেনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় পানি চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। বহু এলাকায় রাস্তার চেয়ে ড্রেন উঁচু হওয়ায় পানি নিষ্কাশনের পরিবর্তে উল্টো পানি আটকে থাকছে। অভিযোগ রয়েছে,উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বিভিন্ন স্থানে ড্রেন নির্মাণ করা হলেও সেগুলোর কার্যকর নকশা, পানি প্রবাহের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা ছিল না। ফলে সামান্য অতিবৃষ্টিতেই সড়ক ও বসতঘর ডুবে যাচ্ছে।
উখিয়া থানা পুলিশের অভিযানে ১৫ জন গ্রেপ্তার
স্থানীয় প্রবীণরা জানান,আগে বৃষ্টির পানি দ্রুত খাল
ও প্রাকৃতিক ছড়ার মাধ্যমে সাগরে নেমে যেত। কিন্তু বছরের পর বছর অবৈধ দখল, ভরাট এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের কারণে সেই স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অনেক স্থানে প্রভাবশালী মহল খাল ও পানি চলাচলের পথ দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করায় জলাবদ্ধতা এখন স্থায়ী দুর্যোগে পরিণত হয়েছে।
বাজার, সড়ক ও বসতঘর পানির নিচে সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বাজার এলাকায় দোকানপাটে পানি ঢুকে ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
নিচু এলাকার ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে রান্না-বান্না বন্ধ হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার বিছানা ও আসবাবপত্র উঁচু স্থানে তুলে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও দিনমজুর পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে। কয়েকদিন ধরে কর্মহীন হয়ে পড়ায় তাদের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। শিশু, বৃদ্ধ ও নারীদের দুর্ভোগ আরও বেশি বেড়েছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে অন্ধকারে জনপদ জলাবদ্ধতার পাশাপাশি দীর্ঘ সময়ের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতায় জনদুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে পারছে না, ব্যবসা
প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতির মুখে পড়েছে।অনেকে মোবাইল চার্জ দিতে দূরবর্তী এলাকায় যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্যোগ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ বিভাগের জরুরি তদারকি ও সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় বাড়ছে ক্ষোভ, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসনের দৃশ্যমান তৎপরতা নিয়ে জনমনে অসন্তোষ বাড়ছে। কোথাও জরুরি পানি নিষ্কাশন কার্যক্রম,কোথাও ড্রেন পরিষ্কার কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা কার্যক্রম চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন,বর্ষা এলেই একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটে। কিন্তু সমস্যা চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বদলে বর্ষাকেন্দ্রিক সাময়িক উদ্যোগেই সীমাবদ্ধ থাকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো। জলবায়ু ঝুঁকির মুখে উপকূলীয় মহেশখালী।
বিশেষজ্ঞদের মতে,উপকূলীয় ও পাহাড়ঘেরা এলাকা হওয়ায় মহেশখালীতে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের প্রভাব একসঙ্গে কাজ করে। ফলে সামান্য অব্যবস্থাপনাও বড় ধরনের জলাবদ্ধতায় রূপ নেয়। আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পূর্বাভাসেও চলতি জুলাই মাসে চট্টগ্রাম ও উপকূলীয় অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণে কক্সবাজার জেলায় পাহাড়ধস, প্লাবন ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাও বেড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থায়ী সমাধানে মাস্টারপ্ল্যানের দাবি,সচেতন মহল বলছে, মহেশখালীর জলাবদ্ধতা এখন শুধু মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি অব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ধ্বংস ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের সম্মিলিত ফল। দ্রুত সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন, খাল ও ছড়া দখলমুক্ত করা, পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ পুনরুদ্ধার, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ এবং নিয়মিত ড্রেন রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মহেশখালীর জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তখন এই দ্বীপ উপজেলার জনজীবন,অর্থনীতি ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।




মন্তব্য করুন