নভেম্বরের শেষ ক’টা দিন—অটোয়া তখন শীতের আগমনী সুরে রূপ বদলাচ্ছে। হিমেল বাতাসে কাঁপে গাছের শাখা, আর পাতাঝরা রাস্তা যেন এক নিঃশব্দ অভিপ্রায় নিয়ে ঝরে পড়ে ক্লান্ত সূর্যের আলোয়। গাছের পাতার মতোই কিছু মুখ হারিয়ে যায় শহরের ব্যস্ততার আড়ালে—অদৃশ্য, অথচ অনুপস্থিতির ভারে প্রকৃতি যেন আরও নীরব হয়ে ওঠে।
সাউথ কিজ স্টেশনের পাশ ঘেঁষে চলে গেছে যে পথটা, সেটা শহরের এক নির্জন করিডোরের মতো—স-মিল ক্রিক পাথওয়ে। এখানে হাঁটতে হাঁটতে ভাবনাগুলো কুয়াশায় জড়িয়ে পড়ে। কোনো দিন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, কোনো দিন কেবল পাইনগাছের নিচে শুকনো পাতার স্তূপ। শহরের কোলাহলের মাঝে এমন নিঃস্তব্ধ জায়গাগুলোই হয়তো বেশি টানে অভিবাসীদের।
তৌসিফ চৌধুরী। বাংলাদেশি বংশদ্ভূত এক তরুণ। দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের সাথে থাকত সৌদি আরবে। ২০০৮ সালে এডমিশন নিয়ে আসে অটোয়ার কার্লটন ইউনিভার্সিটিতে। পড়ত ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। প্রখর মেধার অধিকারী এই তরুণ ছাত্র শুধু পরীক্ষার খাতায় নয়, বন্ধুদের হৃদয়েও ছিল অতি আপন।
হাসপাতালে ভর্তি শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জীবন বরফের মতো—উপরে হাসি, ভেতরে চাপা চাপা টেনশন। ক্লাস, চাকরি, বাসাভাড়া, টিউশন ফি—সবকিছু সামলে আবার সকাল ৯টার ক্লাসে উপস্থিত।
তৌসিফও ছিল তেমনই এক ছাত্র। সাউথ এশিয়ান কমিউনিটির যারা তাকে চিনত, তারা বলত—সে খুব স্মার্ট, কিন্তু বিনয়ী; খুব বন্ধুবৎসল, কিন্তু নিজের কথা খুব বেশি বলত না। তৌসিফ শুধু পরীক্ষায় নয়, বন্ধুত্বেও ছিল অনন্য। তার হাসি যেন অটোয়ার শীতেও উষ্ণতা ছড়াত। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল একাকীত্বের গভীর ছায়া—একটি অভিবাসী তরুণের অদৃশ্য যুদ্ধ।

একসময় মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছিল। হয়তো হতাশা, হয়তো একাকীত্ব, অথবা অতিরিক্ত চাপ—তাই ২০১১ সালে কার্লটন ছেড়ে চলে যায় উইন্ডসর, তারপর কিংস্টনে কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে। কিন্তু শহর বদলালে তো সব বদলায় না। অবশেষে ২০১৪ সালের শরতে আবার ফিরে আসে অটোয়ায়—পুরনো বন্ধু, পুরনো শহর, নতুন আশার আলো নিয়ে। সে বলত, “আমার সব বন্ধু তো এখানেই।” তৌসিফ হান্ট ক্লাব এলাকায় চারজন রুমমেটের সঙ্গে থাকত।
এতটা নিঃশব্দ অথচ নির্মম মৃত্যু যেন এক মুহূর্তেই ভেঙে দেয় বিশ্বাসের ভিত্তি। বন্ধু খালিদ হালিম বলেন, “সে ফিরে এসেছিল নতুন আশায়, যেন পুরনো শহর তাকে আবার ডাকছে বলে।” মুনির, তার এক সময়ের রুমমেট, কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমরা পুলিশ স্টেশনে গিয়ে যখন নিশ্চিত হলাম… মনে হচ্ছিল সবকিছু থেমে গেছে।”
তাকে যারা চিনত, তারা বলে—তৌসিফ শুধু একজন ছাত্র ছিল না—ছিল পুত্র, ভাই, বন্ধু, স্বপ্নদ্রষ্টা। FIFA গেমসে বার্সেলোনার হয়ে খেলা, তিন রাত না ঘুমিয়ে ভিডিও গেম খেলা, রাতের খাবার খেতে খেতে রাজনীতির কথা বলা—এ সবকিছুই যেন অদৃশ্য হয়ে গেল এক বিকেলের মেঘে।
এই মৃত্যু এক শীতল প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে পড়ে ছিল বন্ধুদের মনে—কে করল এমন? কেন? পুলিশ বলল, এটা ছিল টার্গেটেড অ্যাটাক। হত্যার আগে তৌসিফ ব্যাংক থেকে টাকা তুলেছিল, হয়তো কাউকে দেখা করতে গিয়েছিল। নাকি তাকে ডেকে নেওয়া হয়েছিল কৌশলে? কেউ জানত না।
তৌসিফের বন্ধুরা তখন ভাগ হয়ে গিয়েছিল—কেউ পুলিশি তদন্তে, কেউ জানাজার আয়োজনে, কেউ তার মা-বাবার সাথে কথা বলার সাহস খুঁজছিল। হালিম বলেন, “তৌসিফের বাবা যেন ভেঙে পড়েছিলেন, আর মা—তিনি জানতেনই না কিছু।”
হলরুমে বসে থাকা কিছু শিক্ষার্থী কান্না থামাতে পারছিল না। কুইন্স ইউনিভার্সিটি থেকে যারা তাকে চিনত, তারা টুইট করেছিল, “Faculty mourns the loss of former student Tausif Chowdhury.” কেউ কেউ নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় তার ছবি পোস্ট করেছিল, লেখা ছিল—”Super smart, humble, and gone too soon.”
পুলিশ তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছিল—সাউথ কিজ ট্রানজিটওয়ে স্টেশনের ও সাউথ কিজ শপিং সেন্টারের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছিল। ধারণা করা হয়েছিল, কারো সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল তৌসিফ। এটা একটা আকস্মিক অ্যাটাক ছিল না, বরং পূর্বপরিকল্পিত লেনদেন অথবা ব্ল্যাকমেইলের মতো কিছু হতে পারে—এমনটাই ধারণা পুলিশের।
তদন্তে ধরা পড়ে স্টিভেন কোজিয়েলো ও জন রুচ—দুই কানাডীয় তরুণ, বয়স মাত্র ১৯। তারা উভয়েই দায় স্বীকার করে নেয় এবং বলে, সেই রাতে তারা তৌসিফের টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে সাক্ষাৎ করেছিল। তাদের হাতে ছিল হাতুড়ি। ঝগড়া হয়, তারপর ঘটে ভয়াবহ সেই হত্যাকাণ্ড।
২০১৬ সালের ৬ এপ্রিল—তারা দুইজনই দোষ স্বীকার করে নিল। আদালত কোজিয়েলোকে দিল ৫ বছর ৬৬ দিনের কারাদণ্ড, রুচ পেল সাড়ে তিন বছর।
কিন্তু এ রায় যেন বন্ধুবান্ধবদের হৃদয়ে এক অপূর্ণ ক্ষত হয়ে থেকে গেল—কারণ পাঁচ বছর, তিন বছর—এই সময়গুলো কি একটি তরুণ প্রাণের সমানুপাতিক বিচার হতে পারে?
তৌসিফের জানাযা হলো অটোয়ার মসজিদে। বন্ধুরা তার কফিন কাঁধে নিল। ১৬ ডিসেম্বর তারিখে তার লাশ পাঠানো হলো—বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে।
অটোয়ার শীত শুধু তাপমাত্রায় সীমাবদ্ধ থাকে না—এটা একটা অনুভব, একটা মনস্তাত্ত্বিক চাদর, যা ধীরে ধীরে মনের কোণে জমে ওঠে। সেই শীতে প্রতিটি ছাত্র তার নিজস্ব লড়াই বয়ে বেড়ায়—হোক তা ক্লাসের ফাইনাল এক্সাম, অথবা একাকীত্বে ডুবে থাকা রাতে পরিবারের জন্য কান্না। কিন্তু কেউ ভাবেনি, এ শহরের নিঃসঙ্গ কোনো পথ একদিন হয়ে উঠবে মৃত্যুর চিহ্ন।
তৌসিফ চৌধুরী হয়তো আজ আর কারও দৈনন্দিন স্মৃতির অংশ নয়, কিন্তু সে থেকে গেছে এক প্রতীক হয়ে। আমাদের সন্তানদের, ভাইদের, কিংবা প্রিয় বন্ধুর গল্পে সে বারবার ফিরে আসে—একজন ছিল, খুব মেধাবী, খুব নম্র; নাম ছিল তৌসিফ।
হয়তো কোনো একদিন, অটোয়ার এক হেমন্তের বিকেলে, কোনো তরুণ শিক্ষার্থী হাঁটবে সেই একই পথ দিয়ে—হাঁটতে হাঁটতে থেমে যাবে, অনুভব করবে বাতাসে এক শূন্যতা। সে জানবে না তৌসিফের নাম, জানবে না কার রক্ত মিশে আছে এই মাটিতে—তবু বুকের ভেতর হঠাৎ জেগে উঠবে এক অচেনা বিষণ্নতা। হয়তো সে ফিরে তাকাবে একবার, তারপর হাঁটা শুরু করবে আবার—মনের গভীরে রেখে যাবে এক প্রশ্ন, যার উত্তর সে কখনও জানবে না।




মন্তব্য করুন