বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হলে প্রতিধ্বনিত হয় একজন মানুষের নাম।‘স্বাধীনতা’ শব্দটি যিনি শুধু উচ্চারণ করেননি; বাঙালির হাতে তুলে দিয়েছেন তা সম্মানের পতাকা হয়ে, সাহসের দীপ্ত অক্ষর হয়ে। যে শব্দ একদিন ছিল অভিধানের নিস্তরঙ্গ পাতায়, তিনি সেটিকে বসিয়েছেন বাঙালির চেতনার মর্মস্থলে, খোদাই করেছেন হৃদয়ের গভীরে।
যাঁর এক অঙ্গুলির ইশারায় একদিন সাড়ে সাত কোটি মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তির অভিযাত্রায়। যার কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে ৩০ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়ে হয়েছিল শহীদ; আর আরও কয়েক কোটি মানুষ প্রাণ দেওয়ার প্রস্তুতিতে ছিল অটল; মুক্তির মন্ত্রে, অদম্য বিশ্বাসে, অপরাজেয় প্রতিজ্ঞায়। তিনি বাংলাদেশের স্থপতি, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান—আপাদমস্তক একজন বাঙালি।
কেশম দ্বীপে মার্কিন হামলার কথা স্বীকার করলেন ট্রাম্প, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতির দাবিও
স্বাধীনতার ব্যাকরণ রচিত হয় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দানে। উত্তাল জনসমুদ্রের সামনে বঙ্গবন্ধুর উদাত্ত কন্ঠে সেদিন ঘোষিত হয়—“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। এটি শুধু স্লোগান ছিল না; এটি ছিল এক অবরুদ্ধ জাতির আত্মমুক্তির মহান ম্যানিফেস্টো। বাংলার আকাশে সেই বিকেলের শব্দ তরঙ্গে যেন জেগে ওঠে বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্ন।
ইউনেসকোর ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ রেজিস্টারে ২০১৭ সালে অন্তর্ভুক্ত এই ভাষণ কেবল বাংলাদেশের নয়, আজ বিশ্ব-ইতিহাসেরও এক অনন্য দলিল। ৭ মার্চ তাই শুধু একটি তারিখ নয়; মানবসভ্যতার স্মৃতি-ভাণ্ডারে সাহস, প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের এক অনন্য পাঠ।

তালিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক, সুভাষচন্দ্র বসুসহ বহু ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব স্থান পান। সার্বিক মূল্যায়নে দেখা যায়, রাষ্ট্রগঠন ও স্বাধীনতার নেতৃত্বের কারণে বঙ্গবন্ধুই বাঙালির রাজনৈতিক–ঐতিহাসিক পরিচয়ের কেন্দ্রস্থ প্রতীক হিসেবে শীর্ষে উঠে আসেন।
বিবিসির চূড়ান্ত মূল্যায়ন ছিল—”বঙ্গবন্ধু কোনো সাধারণ নেতা নন—তিনি বাঙালির কলেক্টিভ কনশাসনেস (সমষ্টিগত চৈতন্য)। তাঁর জীবনী বাংলাদেশের জন্মকথার মহাকাব্য।”
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সৃষ্টিকর্মের ব্যাপ্তি লক্ষণীয়। তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে কেন্দ্র করে বাংলা, ইংরেজি, আরবিসহ বহু ভাষায় হাজারেরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে—এবং ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব রচনাগুলো—‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’, ‘আমার দেখা নয়াচীন’ ইত্যাদি বহু ভাষায় অনূদিত হয়ে বৈশ্বিক পাঠকমহলে এক স্বতন্ত্র সাহিত্যিক–রাজনৈতিক স্বর গড়ে তুলেছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে রচিত হয় ইতিহাসের অন্যতম মর্মন্তুদ অধ্যায়। থামিয়ে দেয়া হয় এক মহান কণ্ঠ, জাতির পিতার কণ্ঠ—যে কণ্ঠ ‘স্বাধীনতা’ শব্দটিকে বসিয়েছিল বাঙালির হৃদয়ের স্থায়ী আসনে।




মন্তব্য করুন