বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য বিদেশি সহায়তা ক্রমেই কমছে, আর এর বোঝা চেপে বসছে সরাসরি সরকারের ঘাড়ে। এ বছর রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দিতে গিয়ে সরকারের ঋণ গ্রহণ বেড়েছে ভয়াবহভাবে—গত বছরের তুলনায় ২৬৩ শতাংশ বেশি। অথচ ১১ লাখ ৫৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গার জন্য বরাদ্দ বিদেশি তহবিল কমে যাওয়ায় এই বোঝা এখন রীতিমতো এক ভয়ংকর আর্থিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী এই পরিস্থিতিকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য সরাসরি হুমকি বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “সহায়তার নামে অপচয় আর বিলাসিতা বন্ধ না হলে, সরকারের ওপর ঋণের চাপ বাড়তেই থাকবে। এই ঋণ শেষ পর্যন্ত শোধ করতে হবে সাধারণ মানুষের করের টাকা দিয়ে। বিদেশি সংস্থাগুলোকে সাশ্রয়ী না করলে রোহিঙ্গা কার্যক্রম বাংলাদেশকেই রীতিমতো ধ্বংসের পথে ঠেলে দেবে।”
তিনি স্পষ্ট করে দেন, বিদেশি এনজিও ও ইউএন সংস্থাগুলোর অতিরিক্ত ‘ওভারহেড খরচ’ই হচ্ছে মূল সমস্যা। “একজন বিদেশি কর্মকর্তাকে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা বেতন দিতে হয়। তারা কক্সবাজারে বিলাসবহুল হোটেলে থাকেন, দামি গাড়ি ব্যবহার করেন। অথচ স্থানীয় তরুণদের ৫০-৬০ হাজার টাকা বেতন দিলেই একই কাজ তারা দক্ষতার সঙ্গে করতে পারে। আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম সবই রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মেলে। সেখানে বিদেশিদের জন্য আলাদা দোভাষী রাখতে হয়। এটি এক ধরনের অর্থ অপচয়ের ব্যবসা ছাড়া কিছু নয়।”
রেজাউল করিম বলেন, “কক্সবাজারে ইউএন ও বিদেশি এনজিওর অফিসগুলো আসলে ‘রিফিউজি ট্যুরিজমে’র মতো চলছে। শহরের ওপর চাপ তৈরি করছে, যানজট বাড়াচ্ছে। অথচ এই অফিসগুলো যদি উখিয়ায় সরিয়ে নেয়া হয়, খরচ অর্ধেক হয়ে যাবে। কক্সবাজারের ফাইভ স্টার হোটেলে বসে রোহিঙ্গা অপারেশন পরিচালনা করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।”
কেশম দ্বীপে মার্কিন হামলার কথা স্বীকার করলেন ট্রাম্প, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতির দাবিও
তিনি স্থানীয় পণ্যের ব্যবহারকেও অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন। “রোহিঙ্গাদের জন্য শুঁটকি মাছ থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা হচ্ছে, লবণ আনা হচ্ছে জাপান থেকে। অথচ কক্সবাজারেই শুঁটকি মাছ ও লবণ প্রচুর আছে। রোহিঙ্গারা থামি পড়ে, সেজন্য বিদেশ থেকে কাপড় আনার দরকার কী? সিরাজগঞ্জের লুঙ্গি দিলেই হয়। এতে ব্যয় যেমন কমবে, তেমনি স্থানীয় অর্থনীতিও শক্ত হবে। এভাবে যদি এগোনো যায়, রোহিঙ্গা সহায়তা কার্যক্রম টেকসই হবে এবং দেশের শিল্প-অর্থনীতিও লাভবান হবে।”
কোস্ট ফাউন্ডেশনের গবেষণা অনুযায়ী, একটি রোহিঙ্গা পরিবার প্রতি মাসে বাস্তবে যে সহায়তা পায় তার পরিমাণ ৭০ থেকে ৯১ ডলার। অথচ ওই পরিবারের জন্য বরাদ্দ হয় গড়ে ৩৫০ ডলার। বাকি টাকার বিশাল অংশ বিদেশি এনজিওদের ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও কর্মকর্তাদের বেতনের পেছনে চলে যায়। রেজাউল করিম প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, “সহায়তার নামে এত টাকা ঢুকছে, কিন্তু বাস্তবে রোহিঙ্গারা হাতে পাচ্ছে মাত্র এক-চতুর্থাংশ। বাকিটা কোথায় যাচ্ছে?”
তিনি জানান, রোহিঙ্গা সহায়তা প্রকল্পের ৬৩ শতাংশ তহবিল নিয়ন্ত্রণ করছে আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো। জাতীয় এনজিওগুলোর হাতে আছে ৩৩ শতাংশ, আর স্থানীয় এনজিওগুলোর হাতে কার্যত কিছুই নেই—মাত্র ২.৫ শতাংশ তহবিল। অথচ স্থানীয় এনজিওগুলোই কম খরচে কার্যকরভাবে কাজ করতে সক্ষম। রেজাউল করিম বলেন, “আমরা চাই স্থানীয় এনজিওগুলোকে অন্তত ৫০ শতাংশ সরাসরি তহবিল দেয়া হোক। এতে খরচ কমবে, স্বচ্ছতা বাড়বে, আর বাস্তবে রোহিঙ্গারা বেশি উপকৃত হবে।”
রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। “শুধু খাবার ও বস্ত্র দিয়ে তাদের বাঁচানো যাবে না। আয়বর্ধক প্রশিক্ষণ আর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। না হলে তারা অপরাধ প্রবণতায় জড়িয়ে পড়বে। সরকার বলে স্থানীয় শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সত্যি বলতে, যা ক্ষতি হওয়ার তা ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। কক্সবাজারে দিনমজুরেরা ২০০-৩০০ টাকায় কাজ করছে, যেখানে দেশের অন্য জায়গায় ৬০০ টাকা। রোহিঙ্গারা বাজারে ঢুকে পড়েছে, তাদের আটকে রাখা যায়নি। তাই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে এখনই কর্মসংস্থানের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।”
বিদেশি সহায়তার হ্রাসকেও তিনি ভয়ংকর আখ্যা দেন। যুক্তরাষ্ট্র তাদের অনুদান ৭২ শতাংশ কমিয়েছে, যুক্তরাজ্য কমিয়েছে ৪৮ শতাংশ। ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাতিসঙ্ঘের ঘোষিত বাজেটের মাত্র ৩৮ শতাংশ পাওয়া গেছে। “এটি সরাসরি ভয়াবহ সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যয় যাচ্ছে ব্যবস্থাপনায়, আর রোহিঙ্গারা পাচ্ছে মাত্র ৩০ শতাংশ সুবিধা। এভাবে চলতে থাকলে সহায়তা কার্যক্রম ভেস্তে যাবে,” বলেন রেজাউল করিম।
জরুরি সমাধান হিসেবে তিনি প্রস্তাব দেন, রোহিঙ্গা সহায়তা প্রকল্পে স্থানীয় এনজিওগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, ব্যবস্থাপনা ব্যয় অর্ধেকে নামিয়ে আনতে হবে, তহবিল ব্যবহারের জন্য একটি স্বচ্ছ ড্যাশবোর্ড তৈরি করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রভাব কমিয়ে স্থানীয় কনসোর্টিয়ামকে সামনে আনতে হবে।
তার ভাষায়, “সময় এসেছে রোহিঙ্গা সহায়তায় ভাসাভাসি নয়, বাস্তবসম্মত ও সাশ্রয়ী কাঠামো তৈরি করার। নইলে সরকারের ঋণের বোঝা বেড়েই চলবে, আর সেই বোঝা বহন করতে হবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকেই।”




মন্তব্য করুন