ক্যারিবিয়ান সাগরের নীল জলরাশি আর দিগন্তজোড়া সবুজে ঘেরা এক দ্বীপরাষ্ট্র, কমনওয়েলথ অব ডোমেনিকা। একে বলা হয় ‘নেচার আইল্যান্ড অব দ্য ক্যারিবিয়ান’। শুধু পর্যটন নয়, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সম্পদশালী এবং ব্যবসায়ীদের কাছে এই দেশটি এক অনন্য আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এর কারণ ডোমেনিকার ‘সিটিজেনশিপ বাই ইনভেস্টমেন্ট’ বা বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব লাভের সুযোগ।
ডোমেনিকা কেবল একটি রাষ্ট্র নয়, প্রকৃতির এক বিস্তৃত জীবন্ত মিউজিয়াম। লেসার এন্টিলস দ্বীপপুঞ্জের এই আগ্নেয় দ্বীপে অসংখ্য নদীনালা, উত্তপ্ত ফুটন্ত হ্রদ (Boiling Lake) এবং ঘন রেইনফরেস্টের বিস্তার চোখে পড়ে। ১৪৯৩ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস প্রথম এই দ্বীপে পৌঁছান। ইতিহাসের পরিক্রমায় ফরাসি ও ব্রিটিশ শাসনের অধ্যায় পেরিয়ে ১৯৭৮ সালে দেশটি পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করে।
জাপানের সঙ্গে ২৩টি বড় চুক্তি ও স্মারক সই: ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ
রাজনৈতিকভাবে দেশটি একটি সংসদীয় গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র। ব্রিটিশ কমনওয়েলথের সদস্য হওয়ায় এর পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক মর্যাদা অত্যন্ত বেশি। এখানকার অর্থনীতি মূলত কৃষি এবং পর্যটন নির্ভর হলেও বর্তমানে ‘বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব’ প্রদান তাদের আয়ের একটি প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশের নাগরিকদের কাছে ডোমেনিকার নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রধান আকর্ষণ হলো এর ভ্রমণ সুবিধা। ডোমেনিকার পাসপোর্টধারী একজন ব্যক্তি বিশ্বের ১৪০টিরও বেশি দেশে ভিসা-মুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল ভিসায় যাতায়াত করতে পারেন। এছাড়া, কর সুবিধা এবং দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ থাকায় পাচারকৃত অর্থের নিরাপদ গন্তব্য বা সেকেন্ড হোম হিসেবেও অনেকের আগ্রহের তালিকায় এটি রয়েছে।
ডোমেনিকার নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়াটি তুলনামূলকভাবে কাঠামোবদ্ধ। সাধারণত দুটি বিনিয়োগ পথ বেশি আলোচিত। এক, অর্থনৈতিক উন্নয়ন তহবিল (Economic Diversification Fund)। এটি একটি সরাসরি অনুদান। সরকারের এই তহবিলে একজন আবেদনকারীকে সর্বনিম্ন ২,০০,০০০ মার্কিন ডলার জমা দিতে হয়। এই অর্থ অফেরতযোগ্য। দুই, সরকার অনুমোদিত রিয়েল এস্টেট প্রকল্পে নির্দিষ্ট মূল্যের (কমপক্ষে ২,০০,০০০ মার্কিন ডলার) বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগ অন্তত ৩ বছর ধরে রাখতে হয়।
বাংলাদেশে সরাসরি কোনো ডোমেনিকান লাইসেন্সধারী এজেন্ট নেই। তবে বেশ কিছু ইমিগ্রেশন কনসালটেন্সি ফার্ম দুবাই ভিত্তিক ফার্মের সাথে কাজ করে। কানাডার একশ্রেণীর ইমিগ্রেশন কনসালটেন্টদেরও যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে।
দুবাই (UAE) হলো এই প্রক্রিয়ার প্রধান হাব। বাংলাদেশি নাগরিকরা সাধারণত দুবাইয়ের মাধ্যমে রিমোটলি এই আবেদন সম্পন্ন করেন। আজকাল কেউ কেউ লাহোরের এজেন্টের মাধ্যমেও আবেদন করছেন। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া অথবা মধ্যপ্রাচ্যের যে কোনো দেশে বসেই আগ্রহীরা অথরাইজড এজেন্টের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে পারেন। বিশেষ সুবিধা হলো, আবেদনকারীকে সশরীরে ডোমেনিকা যেতে হয় না, এমনকি কাউকে সশরীরে কোনো এজেন্টের কাছেও যেতে হয় না। প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কেবল একটি ভার্চুয়াল ইন্টারভিউ নেওয়া হয় যা ঘরে বসেই দেওয়া সম্ভব। আবেদন জমা দেওয়ার পর থেকে নাগরিকত্ব সনদ এবং পাসপোর্ট হাতে পেতে সাধারণত ৩ থেকে ৬ মাস সময় লাগে। ‘সার্টিফিকেট অফ ন্যাচারালাইজেশন’ এবং ‘পাসপোর্ট’ সরাসরি কুরিয়ারের মাধ্যমে আবেদনকারীর ঠিকানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী নেটওয়ার্কের বিভিন্ন প্রতিবেদনে ডোমেনিকার এই ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন উঠে এসেছে, বিশেষ করে OCCRP (Organized Crime and Corruption Reporting Project) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ‘Dominica: Passports of the Caribbean’ শিরোনামের এক যৌথ অনুসন্ধানে বলা হয়, ডোমেনিকা কয়েক বছরে হাজার হাজার বিদেশি নাগরিককে এই কর্মসূচির আওতায় নাগরিকত্ব দিয়েছে। এই তালিকায় এমন অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছেন যারা নিজ দেশে আর্থিক কেলেঙ্কারি, বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ এমনকি মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডোমেনিকার এই গোপনীয়তার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা তাদের অবৈধ অর্থ সুরক্ষা দিতে দেশটিকে একটি নিরাপদ স্বর্গরাজ্য হিসেবে ব্যবহার করছে।
কিছু অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ‘মানি লন্ডারিং’ বা পাচারকৃত টাকা দিয়ে অনেক বাংলাদেশি নাগরিক ডোমেনিকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, অনেক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিবিদ এই দ্বিতীয় পাসপোর্টটিকে মূলত একটি ‘সেফটি নেট’ বা ‘ইনস্যুরেন্স পলিসি’ হিসেবে ব্যবহার করেন। দেশে কোনো বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি বা আকস্মিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটলে যাতে আইনি জটিলতা এড়িয়ে দ্রুত দেশত্যাগ করা যায় এবং বিদেশে বেনামে ব্যবসা পরিচালনা করা যায়, সেই লক্ষ্যেই তারা এই পথ বেছে নিয়েছেন। ডোমেনিকা দ্বৈত নাগরিকত্ব (Dual Citizenship) সমর্থন করায় নিজ দেশের নাগরিকত্ব বজায় রেখেই এই বিশেষ সুবিধা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ডোমেনিকা সরকার যেহেতু বিনিয়োগকারীদের নাম প্রকাশে গোপনীয়তা রক্ষা করে, তাই সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানা না গেলেও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইনভেস্টিগেটিভ গেজেট অনুযায়ী গত এক দশকে কয়েকশ বাংলাদেশি এই সুবিধা নিয়েছেন বলে ধারণা করা হয়।




মন্তব্য করুন