কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে টানা বর্ষণে পাহাড়ধসে একটি নারী মাদ্রাসা ও হেফজখানা ধসে অন্তত আট শিশু শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ১৪ জন, যাঁদের মধ্যে ছয়জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বুধবার (৮ জুলাই) দুপুর দুইটার দিকে ব্লক-৩ (এ-০৩) এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত চারজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাঁরা হলেন রাশিদা বেগম (১৩), উম্মে নেজাতুল (১৩), উম্মে সালমা (১২) ও উমাইসা বিবি (১৩)। উম্মে নেজাতুল ও উম্মে সালমা দুই বোন। তাঁরা ক্যাম্প-৩–এর বাসিন্দা। অপর দুজন ক্যাম্প-৫–এর বাসিন্দা। বাকি চারজনের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে। আহতদের মধ্যে আসরা (৯), বেগম জান (১৫) ও ফারেসা বিবি (১২)-এর পরিচয় জানা গেছে।
প্রশাসন জানিয়েছে, নিহত ও আহত ব্যক্তিদের সংখ্যা এবং পরিচয় যাচাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে কিছুটা ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেলেও প্রাথমিকভাবে আটজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, টানা বর্ষণে পাহাড়ের একটি অংশ ধসে খতিজাতুল মহিলা হেফজখানা এবং পাশের মসজিদুল কুবা মসজিদের দেয়ালের ওপর পড়ে। এতে দেয়াল ভেঙে হেফজখানার কক্ষটি ধসে যায়। সে সময় সেখানে শিক্ষার্থীরা পাঠ নিচ্ছিল।
টেকনাফে সিএনজির বিশেষ চেম্বার থেকে ১৩ হাজার ইয়াবা উদ্ধার, চালক আটক
স্থানীয় রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক রফিক বলেন, দুর্ঘটনার সময় মাদ্রাসায় প্রায় ৫০ জন ছাত্রী ছিল। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১০ জন বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। বাকিরা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে। বিকেলে প্রথমে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হলেও পরে উদ্ধার অভিযান শেষে মৃতের সংখ্যা আটজনে পৌঁছায়।
ক্যাম্প-৫–এর বাসিন্দা মৌলভি ইউনুস বলেন, ‘মাদ্রাসা ছুটি হওয়ার আর কয়েক মিনিট বাকি ছিল। এর মধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটে। মাটি ভরাট করে মাদ্রাসাটি নির্মাণ করা হয়েছিল।’
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা বলেন, পাহাড়ি ঢালের নিচে অবস্থিত মাদ্রাসাটির ওপর পাহাড়ের ঢাল ভেঙে পড়ে। স্থানীয় উদ্ধারকারী ও মেডিকেল ফোকালদের কাছ থেকে আটজনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা নিজেরা মরদেহ দেখেননি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং ঘটনাস্থলে নিহত দুই শিশুর লাশ দেখেন ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের খোঁজ খবর নেন।
তিনি বলেন, ‘আর কেউ নিহত হয়েছেন কি না, সেটি খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের দুটি দল উদ্ধারকাজ চালিয়েছে। উপজেলা প্রশাসন,জেলা প্রশাসন ও ক্যাম্প প্রশাসন সার্বিক তদারকি করছে।’ঘটনার বিষয়ে জেলা প্রশাসক অবগত রয়েছেন, তিনি ক্যাম্প কতৃপক্ষ ও উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে তদারকি ও মনিটরিং করে যাচ্ছেন।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, খবর পাওয়ার পর পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো উদ্ধার অভিযান শুরু করে। ফায়ার সার্ভিস ও ক্যাম্প প্রশাসনের সিসিসিএম স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায় বিকেল পাঁচটার দিকে উদ্ধার অভিযান শেষ হয়। পুরো কার্যক্রম আরআরআরসি কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন (আরআরআরসি) একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসের এই ঘটনায় মোট ১৩ জন শিশুকে উদ্ধার করা হয় যাদের মধ্যে আট জন শিশু মারা যায়। চার জন ঘটনাস্থলে ও চারজন হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যায় বলে জানায় তারা।
বাকি পাঁচ জন শিশুকে হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলেও আরআরআরসি জানিয়েছে।
কিন্ত ক্যাম্প ৫ এর ক্যাম্প-ইন-চার্জ (উপসচিব) মোহাম্মদ আবদুর রউফ প্রেরিত তালিকা অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ৫ জন।
এপিবিএন-১৪–এর প্রাথমিক তথ্যে বলা হয়েছে, দেয়াল ধসের ঘটনায় প্রথমে সাতজন ছাত্রী আহত হন। স্থানীয়রা তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে গেলে পাঁচজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পরে সমন্বিত উদ্ধার অভিযানে মোট ১৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়, যাঁদের মধ্যে ছয়জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
জেলা ও উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, অতিবর্ষণের ফলে এফডিএমএন ক্যাম্প-৫–এর ব্লক-৩ এলাকায় মসজিদুল কুবা মসজিদের দেয়াল ধসে পাশের নারী হাফেজখানাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনার পরপরই সিআইসি, উপজেলা ও জেলা প্রশাসন, আরআরআরসি কার্যালয়, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, এপিবিএন, ক্যাম্প প্রশাসন এবং স্থানীয় লোকজন যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন।
আরআরআরসি কার্যালয় ও উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বর্ষা শুরুর আগে থেকেই পাহাড়ধসের ঝুঁকি সম্পর্কে ক্যাম্পগুলোতে মাইকিং করে সচেতনতা সৃষ্টি করা হয়েছিল। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়। নিহত ব্যক্তিদের দাফনের কার্যক্রম চলছে।
স্থানীয় ও প্রশাসন সূত্র জানায়, মাদ্রাসাটিতে অন্তত ৫০ জন শিক্ষার্থী ছিলেন। অধিকাংশ বেরিয়ে যেতে পারলেও পাহাড়ঘেঁষা একটি কক্ষে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর হঠাৎ মাটি ধসে পড়লে তাঁরা আটকা পড়েন। নিহতদের অধিকাংশ ওই কক্ষেই ছিলেন।
এর আগে গত সোমবার (৬ জুলাই) দিবাগত রাতে উখিয়ার তিনটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক পাহাড়ধসে নারী ও শিশুসহ, ৯ জনের মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে গত তিন দিনে কক্সবাজারে ভারী বর্ষণজনিত বিভিন্ন ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২১ জন।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান জানান, মঙ্গলবার (৭ জুলাই) ভোর ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এরপর ভোর ৬টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত আরও ৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। সব মিলিয়ে ৩৩ ঘণ্টায় ১৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন দিনও ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে পাহাড়ধস ও ভূমিধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
রোহিঙ্গা কো-অর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্মের (আরসিপি) তথ্যমতে, ৪ জুলাই থেকে ৭ জুলাই সকাল পর্যন্ত উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ১০ জন। এ সময় ১৫ হাজার ৮১৩ জন ক্ষতিগ্রস্ত ও তিন হাজার ১৮২ জন বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। একই সময়ে ক্যাম্পগুলোতে ১৬০টি দুর্যোগজনিত ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৫২টি ভূমিধস, ১৪টি আকস্মিক বন্যা এবং ৮৩টি ঝড়ের ঘটনা রয়েছে। এ ছাড়া এক হাজার ৬১৪টি আশ্রয় আংশিক এবং ১০টি আশ্রয় সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভূমিধসে ৩৭ জন নিহত এবং অন্তত ৮০ জন আহত হয়েছেন। শুধু ২০২৪ সালেই ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে দুই দিন আগে আরেকটি পাহাড়ধসে নয়জন রোহিঙ্গার প্রাণহানি ঘটে।
সর্বশেষ ঘটনাটি আবারও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসের ঝুঁকি ও দুর্যোগ মোকাবিলার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে।




মন্তব্য করুন