পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের রাস্তায় একটি বিলবোর্ডে চোখ আটকে গেল। তাতে পর্তুগিজ ভাষায় লেখা—“ISTO NÃO É O Bangladesh”, অর্থাৎ “এটা বাংলাদেশ নয়।” পর্তুগালের বিরোধীদলীয় নেতা আন্দ্রে ভেনচুরা (Andre Ventura) তার দেশের সরকারকে উদ্দেশ্য করে এই কথাটি বলেছেন।
শব্দগুলো নিছক একটি রাজনৈতিক ব্যঙ্গ নয়; এর মধ্যে লুকিয়ে আছে এক জাতির প্রতি অবমাননা। শুধু পর্তুগাল নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আজ “বাংলাদেশ” নামটি দুর্নীতি আর অরাজকতার প্রতীক হয়ে উঠছে।
এআই দিয়ে সাজানো ছবি দিয়ে অপপ্রচার: জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ডিনার ফটোর সত্যতা ও গুজব উন্মোচন
মাতৃভূমি বাংলাদেশকে নিয়ে বরাবরই আমরা গর্ব করি। একসময় বিদেশি বন্ধুদের বলতাম, বাংলাদেশ কোনো পিছিয়ে পড়া দেশ নয়। ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করা এই জাতি প্রতিনিয়ত বিশ্বকে চমকে দিচ্ছে।
গর্ব হতো ভেবে যে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দক্ষ বাঙালি কর্মীরা নিজেদের মেধা ও পরিশ্রমে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছেন। বাংলাদেশি বিজ্ঞানীরা নাসায় গবেষণায় অবদান রাখছেন, আর বাঙালি শিক্ষার্থীরা পড়ছেন বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। আরও গর্বে বুক ভরে যেত যখন শুনতাম, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বহু উন্নয়নশীল দেশকে পেছনে ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
এ কথা মানতে হবে যে, আমরা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা কিংবা মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের দেশগুলোতে বসবাসরত বাঙালিরা সৎ, পরিশ্রমী ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। শত মতপার্থক্য থাকলেও, অন্য জাতিগোষ্ঠীর তুলনায় বাঙালিদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
বছর কয়েক আগের এক ঘটনা আজও আমার স্নায়ুতে দোলা দেয়। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার, আমার ছুটির দিন। দুপুরে টরন্টোর ব্যস্ততম এলাকায় ঘুরছিলাম। ঘুরতে ঘুরতে এক ইলেকট্রনিক্স দোকানে ঢুকলাম। দোকানে বাজছিল উচ্চস্বরে ক্যারিবিয়ান সংগীত। হঠাৎ গানের মাঝে শুনতে পেলাম ‘বাংলাদেশ’। চমকে উঠে ঐদিকে গেলাম। এক কৃষ্ণাঙ্গ সেলসম্যান গানের তালে তালে নাচছিল।
তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “এই গানটিতে কি বাংলাদেশের কথা বলা হচ্ছে?”
সে হেসে বলল, “অবশ্যই।”
আমি তাকে গানটি আবার প্লে করতে অনুরোধ করলাম, আর সে হাসিমুখে গানটি আবার চালাল। শুনলাম, সত্যিই বাংলাদেশের কথা এসেছে। কিন্তু ক্যারিবিয়ান ভাঙা ইংরেজিতে অর্থ বুঝতে পারলাম না। জানতে চাইলাম, এটি কোন দেশের গান। সেলসম্যান জানাল, এটি এন্টিগুয়ার (দক্ষিণ আমেরিকার ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে দেশটি অবস্থিত) গান, গেয়েছেন সেদেশের গণসংগীত শিল্পী Brother Emmanuel।

আমি কৌতূহলভরে জিজ্ঞেস করলাম, “গানে বাংলাদেশের নাম কেন এসেছে?”
সেলসম্যানের উত্তর আজও কানে বাজে। “Brother Emmanuel তাঁর দেশবাসীকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘হে আমার দেশের মানুষ, দেশকে ভালোবাসো, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি ত্যাগ করো, না হলে একদিন তোমাদের দেশও বাংলাদেশ হয়ে যাবে।’”
না, হতাশ হচ্ছি না। হতাশ হব না। স্বপ্ন দেখি, আবারও বাঙালি জেগে উঠবে; যেভাবে একদিন মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় জেগে উঠেছিল। যেদিন আমরা সৎ নেতৃত্ব বেছে নেব, দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলব, স্বজনপ্রীতির সংস্কৃতি ভাঙব তখন হয়তো আবার পৃথিবীর মানচিত্রে ‘বাংলাদেশ’ নামটি গর্বের প্রতীক হয়ে উঠবে। সেদিন বিশ্ববাসী আবার বলবে— “সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী আবার অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে-পুড়ে-মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়।”




মন্তব্য করুন