ম্যানচেস্টার শহর থেকে মাত্র দশ মাইল দূরে, টেমসাইড বরোর (Tameside Borough) দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে গড়ে উঠেছে এক শান্ত অথচ প্রাণবন্ত নগরী হাইড (Hyde)। শহরটি River Tame-এর তীরে, পার্শ্ববর্তী শহর স্টকপোর্ট ও অ্যাশটন-আন্ডার-লাইনের মাঝামাঝি অবস্থানে। ছোট শহর হলেও এর ইতিহাস, শিল্পঐতিহ্য, আর অভিবাসীদের অবদান একে করেছে বিশেষ। এই শহরের বাতাসে মিশে আছে নদীর ধারে সবুজ প্রান্তরের স্নিগ্ধতা, আর অভিবাসী জীবনের পরিশ্রম ও স্বপ্নের গল্প।
আজকের হাইড কেবল ম্যানচেস্টারের উপশহর নয়; এটি বহুজাতিক জীবনের এক প্রতিচ্ছবি, যেখানে স্থানীয় ব্রিটিশ সমাজের সঙ্গে সহাবস্থান করছে দক্ষিণ এশীয়, বিশেষত বাংলাদেশের মানুষ।
হাইড Tameside Metropolitan Borough Council-এর অধীনস্থ আটটি প্রধান শহরের একটি। কাউন্সিলটি শিক্ষা, সামাজিক সেবা, পরিবহন, আবাসন ও সংস্কৃতির দিক দেখাশোনা করে।
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভে ৫ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ

২০২৫ সালের মে মাসে হাইডসহ পুরো টেমসাইডে ইতিহাস সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের সিলেটে জন্ম নেওয়া কাউন্সিলর শিবলি আলম টেমসাইডের ৫০তম নাগরিক মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এটাই প্রথমবার কোনো বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী উত্তর ইংল্যান্ডের ইতিহাসে মেয়রের পদে অধিষ্ঠিত হলেন।
শিবলি আলম মাত্র আট বছর বয়সে যুক্তরাজ্যে আসেন। পরবর্তীতে টেমসাইডের Hyde Werneth Ward থেকে ২০১৯ সালে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। সততা, মানবিকতা ও নেতৃত্বগুণের কারণে তিনি দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁর স্বামী মোহাম্মদ খাইরুল আলম মেয়রাল সময়ের সহযোগী (Consort) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
শিবলি আলমের এই সাফল্য কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি উত্তর ইংল্যান্ডের বাংলাদেশি অভিবাসী সমাজের মর্যাদা ও নেতৃত্বের প্রতীক।

ফারুক আহমেদ রাজনৈতিকভাবেও যুক্তরাজ্যের মূলধারায় সক্রিয়—তিনি লেবার পার্টির সদস্য হিসেবে সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। সমাজসেবায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০২ সালে তিনি ব্রিটিশ রানির পক্ষ থেকে MBE (Member of the Order of the British Empire) সম্মাননা লাভ করেন। একই সঙ্গে তিনি Justice of the Peace (সম্মানিত ম্যাজিস্ট্রেট) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে স্থানীয় সমাজে ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বগুণ ও নিবেদন তাঁকে হাইডের বাংলাদেশি কমিউনিটির এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে। তাঁর জীবন প্রমাণ করে সত্যিকারের সমাজসেবা মানে শুধু সময় দেওয়া নয়, বরং একাগ্রতা, আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ দিয়ে মানুষের জীবন আলোকিত করা।
হাইডের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিসরে আরেক গর্বের নাম মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মিজান। যিনি ব্যবসা, সমাজসেবা ও মানবিক নেতৃত্বে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
১৯৯০ সালে যুক্তরাজ্যে আসার পর তিনি ক্যাটারিং শিল্পে কাজ শুরু করেন। বহু পরিশ্রমের পর প্রতিষ্ঠা করেন Adnan’s Hyde Limited, যা এখন স্থানীয়ভাবে সুপরিচিত একটি রেস্টুরেন্ট। পাশাপাশি তিনি Mizan Property Solution-এর স্বত্বাধিকারী এবং Just Help Foundation-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান।

তাঁর জীবন শুরু হয়েছিল খেলাধুলা দিয়ে। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ঢাকা আবাহনী লিমিটেড হকি দলের অধিনায়ক, নয় বছর খেলেছেন পেশাদারভাবে। মাঠের নেতৃত্বগুণই তাঁকে পরবর্তীতে ব্যবসা ও সমাজসেবায় সফল করে তোলে।
তিনি British Bangladesh Chamber of Commerce and Industry (BBCCI)-এর পরিচালক ও উত্তর-পশ্চিম আঞ্চলিক সভাপতি। এছাড়া তিনি Tameside Rotary Club-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও Hyde Boys Cricket Club-এর সভাপতি ছিলেন।

খেলাধুলা ও মানবসেবায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন ১০০টিরও বেশি ট্রফি ও পুরস্কার। বর্তমানে তিনি UK NRB Society-এর সদস্য এবং Hyde Mela-র যৌথ চেয়ারম্যান, যা প্রতিবছর দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতির উৎসবে পরিণত হয়।
২০২৫ সালে রাজা তৃতীয় চার্লসের জন্মদিন উপলক্ষে প্রকাশিত King’s Birthday Honours List-এ হাইডের আরেক বিশিষ্ট বাংলাদেশি সমাজনেতা মোহাম্মদ আব্দুল মুসাব্বির পেয়েছেন ব্রিটিশ রাজকীয় সম্মান এমবিই (Member of the Order of the British Empire)।
তিনি দীর্ঘদিন ধরে Hyde Bangladesh Welfare Association-এর চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করছেন এবং স্থানীয় সমাজে ঐক্য, সহযোগিতা ও উন্নয়নে অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন।

বিগত বছরগুলোতে তিনি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক দাতব্য কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের এক ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত অঞ্চলে একটি স্কুল নির্মাণে ২০,০০০ পাউন্ড অনুদান সংগ্রহ করেছেন।
এই রাজকীয় স্বীকৃতি প্রমাণ করে হাইডের অভিবাসী বাংলাদেশিরা শুধু অর্থনীতিতে নয়, মানবসেবাতেও যুক্তরাজ্যের মূলধারায় অমূল্য অবদান রেখে চলেছেন।
হাইডে বসবাসরত বাংলাদেশিদের বেশিরভাগই সিলেট, সুনামগঞ্জসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছেন। তারা স্থানীয় অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে মিশে গেছেন।

শহরে রয়েছে বেশ কয়েকটি মসজিদ, গ্রোসারি দোকান, রেস্টুরেন্ট। হাইড বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশন (Hyde Bangladeshi Association) ও স্থানীয় স্কুলগুলো অভিবাসী শিশুদের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি শেখানোর কাজ করছে।
প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় Hyde Mela, যা এখন কেবল বাংলাদেশিদের নয়; পুরো টেমসাইডের উৎসবে পরিণত হয়েছে। সংগীত, নাচ, খাবার ও ঐতিহ্যের মিলনে এটি অভিবাসী জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দমেলা।
হাইডের জীবনযাত্রা শান্ত ও পারিবারিক। শহরের চারপাশে রয়েছে পার্ক, ফুটবল মাঠ, কমিউনিটি সেন্টার ও স্কুল। স্থানীয়রা একে বলে “the friendly town” যেখানে প্রতিবেশী সম্পর্ক, পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক সৌহার্দ্য এখনো প্রাণবন্ত।

লন্ডনের তুলনায় জীবনযাত্রা এখানে সাশ্রয়ী, তাই অনেক নতুন প্রজন্মের অভিবাসী পরিবার হাইডে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছে।
হাইড শহরে বহু বছর ধরে শিকড় গেড়ে আছে আমার স্ত্রী’র পরিবার। সময়ের ধারায় এই পরিবারটি আজ দুই শতাধিক সদস্যে পরিণত। কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসা চালান, কেউ স্কুল-কলেজে শিক্ষাদান করেন, আবার অনেকেই তথ্যপ্রযুক্তি, আবাসন, হসপিটালিটি ও রিটেইল খাতে কর্মরত। নতুন প্রজন্ম বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে; তারা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কমিউনিটি উদ্যোগে নিয়মিত অংশ নেয়। ঈদ, পহেলা বৈশাখ কিংবা হাইড মেলার সময়ে এ পরিবারটি যেন পুরো কমিউনিটির সঙ্গে মিশে এক বৃহৎ আত্মীয়তার বৃত্ত হয়ে ওঠে। হাইডের মসজিদ, পার্ক, স্কুল ও কমিউনিটি সেন্টার সবখানেই তাদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। পরিবারের অনেকে হাইডেই থাকেন, বাকিরা ম্যানচেস্টার, স্টকপোর্ট, অ্যাশটন-আন্ডার-লাইনসহ যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে আছেন।

হাইড ছোট শহর, কিন্তু এর গল্প বড়। এ শহরের মাটিতে বাংলাদেশিদের পরিশ্রম, স্বপ্ন আর ভালোবাসা মিলেই রচিত হয়েছে নতুন এক ইতিহাস।




মন্তব্য করুন