বিশ্বের নানা প্রান্তে আজ বাঙালিদের পদচিহ্ন ছড়িয়ে পড়েছে সাফল্যের অগণিত কাহিনিতে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও বিচারব্যবস্থা সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতরা তাঁদের যোগ্যতা ও মেধায় জিতে নিচ্ছেন বিশ্বের আস্থা। যুক্তরাষ্ট্রও তার ব্যতিক্রম নয়। দেশটির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনা করেছেন নুসরাত জাহান চৌধুরী। প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ও প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বিচারকের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।
বাইডেন সরকারের শেষ পর্যায়ে, ২০২৩ সালের ১৫ জুন সিনেটের ভোটে অনুমোদন পাওয়ার পর নুসরাত চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বিচারক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। পরবর্তীতে ৫ জুলাই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন United States District Court for the Eastern District of New York–এ। দীর্ঘদিন American Civil Liberties Union (ACLU)–এর নাগরিক অধিকার বিষয়ক আইনজীবী হিসেবে কাজ করে ন্যায়, সমতা ও মানবাধিকারের পক্ষে যে দৃঢ় অবস্থান গড়ে তুলেছেন, তা-ই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার সর্বোচ্চ আসনে।
ইনানীতে নিয়ন্ত্রণহীন গ্যাসের আগুন ঘিরে আতঙ্ক, বিদ্যুৎহীন ৩ হাজার ৮০০ পরিবার

১৯৭৬ সালে শিকাগো শহরে জন্ম নেন নুসরাত চৌধুরী। তাঁর পিতা ড. নুর রহমান চৌধুরী ছিলেন প্রখ্যাত নিউরোলজিস্ট, প্রায় চার দশক যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত থেকে St. Mary of Nazareth Hospital–এর নিউরোলজি বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মা নাফিসা এ. চৌধুরী নর্থব্রুক এলাকার স্কুলগুলোতে ফুড সার্ভিস সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছেন।
নুসরাতের পিতা–মাতা বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দিয়েছিলেন। তাঁদের শেকড় বাংলাদেশের ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলার বাগডুবি গ্রামের চৌধুরী বাড়ি। সেই গ্রাম থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁদের অভিবাসনগাথা, যার উত্তরাধিকার বহন করছেন নুসরাত চৌধুরী।
শিক্ষা শেষে তাঁর আইনি জীবনের শুরু হয় বিচারকদের সহকারী (Law Clerk) হিসেবে। ২০০৬–২০০৭ সালে তিনি মার্কিন জেলা আদালতের বিচারক ডেনিস এল. কোটের সহকারী হিসেবে কাজ করেন, এরপর ২০০৭–২০০৮ সালে সেকেন্ড সার্কিট আপিল আদালতের বিচারক ব্যারিংটন ডি. পার্কার জুনিয়রের ল’ ক্লার্ক ছিলেন। এই সময়েই নুসরাত উপলব্ধি করেন, আদালত কেবল আইন প্রয়োগের স্থান নয়, এটি মানবিকতারও মঞ্চ।
২০০৮ সালে তিনি যোগ দেন American Civil Liberties Union (ACLU)–এ Marvin M. Karpatkin Fellow হিসেবে। পরবর্তী ১২ বছরে তিনি ধারাবাহিকভাবে স্টাফ অ্যাটর্নি, সিনিয়র স্টাফ অ্যাটর্নি এবং শেষ পর্যন্ত ডেপুটি ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০২০ সালে তিনি ACLU of Illinois–এর লিগ্যাল ডিরেক্টর হন। সেখানে ১৬ সদস্যের টিম পরিচালনা করে তিনি পুলিশি সংস্কার, বিচারব্যবস্থার উন্নয়ন ও কারাগারের মানবিকতা বিষয়ে ২৫টিরও বেশি মামলা তদারকি করেন।
এই ভোটের পর যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক প্রধান প্রধান সংবাদমাধ্যমে নুসরাতকে নিয়ে শিরোনাম হয়।
রয়টার্সের শিরোনাম ছিলো: “U.S. Senate confirms Nusrat Choudhury as first Muslim female federal judge” (“যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট নুসরাত চৌধুরীকে দেশের প্রথম মুসলিম নারী ফেডারেল বিচারক হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে।”)
এসোসিয়েটেড প্রেস (AP)-এর শিরোনাম ছিল: “Senate confirms 1st female Muslim federal judge in U.S. history” (“যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম নারী ফেডারেল বিচারক হিসেবে সিনেটের অনুমোদন পেলেন নুসরাত চৌধুরী।”)
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এর শিরোনাম ছিলো: “First Bangladeshi-American and Muslim woman confirmed as U.S. federal judge” (“প্রথম বাংলাদেশি–আমেরিকান ও মুসলিম নারী হিসেবে ফেডারেল বিচারকের পদে নিয়োগ পেলেন নুসরাত চৌধুরী।”)
দ্য গার্ডিয়ানের শিরোনাম ছিলো: “Bangladeshi-origin lawyer becomes first Muslim woman federal judge in the U.S.” (“বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আইনজীবী নুসরাত চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম মুসলিম নারী ফেডারেল বিচারক হিসেবে ইতিহাস গড়লেন।”)
বিচারক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নুসরাত চৌধুরী বারবার বলেছেন, “আইনের কাজ শুধু শাস্তি নয়, ন্যায়বিচার ও সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠা করা।” বিচারক হিসেবে তাঁর এই দর্শন ইতিমধ্যেই আদালতের ভেতরে–বাইরে প্রশংসিত হয়েছে। সহকর্মীরা বলেন, তাঁর সিদ্ধান্তে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও আইনের নির্ভুল প্রয়োগ একসঙ্গে কাজ করে।
নুসরাতের এই নিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ এশীয় নারীদের জন্য পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছে। অনেকেই বলছেন, “এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি যে বিচারব্যবস্থার শীর্ষ আসনেও আমাদের উপস্থিতি সম্ভব।”
নুসরাত জাহান চৌধুরীর গল্প কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়; এটি অধ্যবসায়, শিক্ষা এবং সততার গল্প। একজন অভিবাসী চিকিৎসক পিতার মেয়ে, একজন নিবেদিতপ্রাণ আইনজীবী, এবং এক সময়ের অধিকারকর্মী আজ যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতের বিচারক।
তিনি প্রমাণ করেছেন, অভিবাসনের গল্প শুধু সংগ্রামের নয়, এটি সম্ভাবনার গল্পও হতে পারে। তাঁর জীবন দেখিয়েছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন নারীও যুক্তরাষ্ট্রের আইনব্যবস্থার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখতে পারেন।




মন্তব্য করুন