হোম ট্রেন্ডিং লাইভ অনুসন্ধান মেনু
প্রতি মুর্হুতের কক্সবাজারকে জানুন
🔔 নোটিফিকেশন সাবস্ক্রিপশন ×
🔔

নতুন খবর সবার আগে আপনার ফোনে পান!

নিউ ইয়র্কে ‘লাল সোনা’ ও রক্তের পৈশাচিক জালিয়াতি

প্রতিবেদকের নাম:

প্রতিবেদকের নাম:

রবিবার, ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২৪ অপরাহ্ন


রাত বারোটা। নিউ ইয়র্কের ব্রঙ্কসের একটি জরাজীর্ণ ভবনের বেসমেন্ট। বাইরে হিমশীতল হাওয়া আর ভেতরে ভ্যাপসা গন্ধ। একদল মানুষ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কারও পরনে তালি মারা কোট, কারও চোখে মাদকের নেশার ঘোর, আবার কেউ সদ্য বাংলাদেশ থেকে আসা দিশেহারা যুবক। একে একে তারা একটি নোংরা চেয়ারে গিয়ে বসছে। মরচে ধরা সূঁচ হাতে এক টেকনিশিয়ান অবলীলায় টেনে নিচ্ছে তাদের শরীর থেকে ‘লাল সোনা’। মাত্র ১০ বা ১৫ ডলারের বিনিময়ে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে এক ব্যাগ রক্ত। এই রক্তই পরে চলে যাচ্ছে বড় বড় ব্লাড ব্যাংকে, আর সেখান থেকে নামী হাসপাতালে। কিন্তু কেউ জানে না, এই রক্তের বোতলে লুকিয়ে আছে এক মরণঘাতী সত্য।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে নিউ ইয়র্ক শহর এমন এক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিল, যা কেবল আমেরিকার জনস্বাস্থ্যকেই হুমকির মুখে ফেলেনি, বরং অভিবাসী সমাজের এক ভয়ংকর অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছিল। অর্থের লালসায় মানুষ কতটা নিচে নামতে পারে, তার ভয়াবহ বাস্তবতা হয়ে উঠেছিল এই ‘ব্লাড ট্রেড’।

আরও পড়ুন

৭ নভেম্বর উপলক্ষে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের শ্রদ্ধা

সেই সময়ে নিউ ইয়র্কে বাণিজ্যিক ব্লাড ব্যাংকগুলোর মধ্যে এক অঘোষিত প্রতিযোগিতা চলত। বড় বড় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালগুলোর রক্তের চাহিদা ছিল আকাশচুম্বী। বিশেষ করে ‘ব্লাড প্লাজমা’ থেকে দামী ওষুধ তৈরির জন্য এই অবৈধ সেন্টারগুলো হয়ে উঠেছিল একেকটি ‘রক্তের খনি’। ক্র্যাক-কোকেনের দাপটে অস্থির সেই সময়ে মাদক কেনার টাকার জন্য মাদকাসক্তরা দিনের পর দিন রক্ত দিতে আসত। নিয়ম অনুযায়ী বছরে কয়েকবারের বেশি রক্ত দেওয়া নিষিদ্ধ হলেও, এই চক্রগুলো দিনে দুবারও একই মানুষের রক্ত নিত। দাতাদের একটি বড় অংশই মারাত্মক সংক্রামক রোগে আক্রান্ত থাকায় সংগৃহীত রক্তের মান ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

এই ব্যবসার একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করত কিছু অসাধু বাংলাদেশি এবং দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী। জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা এবং ব্রঙ্কসের বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকায় এমন কিছু ছোট ছোট ‘ল্যাবরেটরি’ বা ‘ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ গড়ে উঠেছিল, যেগুলোর আড়ালে চলত এই অমানবিক কারবার।

বাংলাদেশি মিডলম্যানরা মূলত নতুন আসা নথিপত্রহীন অসহায় অভিবাসী বাংলাদেশিদের টার্গেট করত। “সহজে ডলার আয় করার উপায়” হিসেবে তাদের এই মরণকূপে টেনে আনা হতো। এই দালালরা প্রতি ব্যাগের জন্য ৫ থেকে ১০ ডলার কমিশন পেত। স্বজাতির রক্ত বিক্রি করে পকেট ভারী করতে তাদের বিবেক বিন্দুমাত্র কাঁপেনি।

এই চক্রের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নাম ছিল মোহাম্মদ সোহেল খান। সেই সময় মেডিকেইড জালিয়াতি ও অবৈধ রক্ত ব্যবসার তদন্তে তার নাম বারবার উঠে আসে। ফেডারেল তদন্ত নথিতে তাকে এই অবৈধ নেটওয়ার্কের মূল সংগঠক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

আগাপে ব্লাড সেন্টার গৃহহীনদের কাছ থেকে রক্ত কিনে তা ‘প্লাজমা’ হিসেবে বড় ওষুধ কোম্পানির কাছে বিক্রি করত। এইচআইভি বা হেপাটাইটিস পজিটিভ রক্তেও তারা ভুয়া লেবেল লাগিয়ে ‘নেগেটিভ’ হিসেবে বাজারে ছাড়ত। রক্ত সংগ্রহের নথিপত্র ছিল সম্পূর্ণ জাল। দাতার নাম ও ঠিকানা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া রাখা হতো, যাতে কোনো সংক্রমণের সূত্র খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।

সিলেট থেকে ভাগ্য অন্বেষণে যুক্তরাষ্ট্রে আসা যুবক রফিক (ছদ্মনাম) হয়েছিলেন এই চক্রের শিকার। রফিক জবানবন্দিতে বলেছিলেন, “আমি যখন রক্ত দিতাম, তখন ল্যাবের পরিবেশ দেখে মনে হতো কসাইখানা। একবার রক্ত দেওয়ার পর আমি অজ্ঞান হয়ে যাই, কিন্তু তারা আমাকে সাহায্য করার বদলে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় বের করে দেয়।” রফিকের মতো শত শত বাংলাদেশি যুবক তখন এই পৈশাচিক ব্যবসার কাঁচামালে পরিণত হয়েছিল।

১৯৯২ সালের মাঝামাঝি সময়ে নিউ ইয়র্কের বেশ কিছু হাসপাতালে রক্ত নেওয়ার পর রোগীদের অবস্থা রহস্যজনকভাবে খারাপ হতে থাকে। তখনই নড়েচড়ে বসে ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (FBI)। এক ভোরে শুরু হয় ‘অপারেশন ব্লাড ব্রাদার্স’। ব্রঙ্কস ও ম্যানহাটনের একাধিক ক্লিনিকে এফবিআই এবং স্বাস্থ্য বিভাগের শত শত এজেন্ট একযোগে হানা দেয়। দরজার তালা ভেঙে ভেতরে ঢোকার পর এজেন্টরা স্তম্ভিত হয়ে যান। রেফ্রিজারেটরে পচা খাবারের পাশেই রাখা ছিল রক্তের ব্যাগ। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল শত শত ব্যবহৃত সিরিঞ্জ। সেখান থেকেই উদ্ধার হয় মোহাম্মদ সোহেল খানের জালিয়াতির অকাট্য নথিপত্র। তদন্তে দেখা যায়, এই চক্রটি মেডিকেইড জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ৮০ লাখ ডলার হাতিয়ে নিয়েছে।

প্রতিটি সংবাদপত্রের শিরোনাম ছিল, “Is Your Blood Safe?” (আপনার রক্ত কি নিরাপদ?)। বাংলাদেশি কমিউনিটি পত্রিকাগুলোও তখন এই কলঙ্কজনক অধ্যায় নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যা অভিবাসীদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও লজ্জার সৃষ্টি করে।

নিউ ইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট আদালতের এজলাস। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ডক্টর আর্নেস্ট ওয়েট এবং সোহেল খান। প্রসিকিউটর যখন এইচআইভি আক্রান্ত রক্তের ব্যাগগুলো প্রমাণ হিসেবে পেশ করলেন, তখন আদালত কক্ষে উপস্থিত মানুষের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে যায়।

এক ল্যাব টেকনিশিয়ান আদালতে স্বীকার করেন, “মালিকরা জানতেন এই রক্তে জীবাণু আছে, কিন্তু তারা বলতেন, ‘ওরা তো জঞ্জাল (homeless), ওদের রক্তে কী বা আসে যায়!’”

বিচারক ব্রুস স্টালিং তার ঐতিহাসিক রায়ে বলেন, “আপনারা কেবল আইন ভাঙেননি, আপনারা মানুষের বিশ্বাস এবং পবিত্র রক্তকে অপবিত্র করেছেন।” ডক্টর ওয়েটকে ১০ বছর এবং সোহেল খানকে দীর্ঘমেয়াদী জেল ও কয়েক মিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়।

নব্বই দশকের সেই রক্ত কেলেঙ্কারি আজও মনে করিয়ে দেয় যে, অর্থলিপ্সা মানুষকে পশুর চেয়েও নিচে নামাতে পারে। সেই অসাধু ব্যবসায়ীরা ডলারের জন্য যা হারিয়েছে, তা হলো একটি জাতির সম্মান। সেই বিষাক্ত রক্ত কোনো মুমূর্ষু শিশু কিংবা গর্ভবতী মায়ের শরীরে প্রবেশ করতে পারে এই ন্যূনতম মানবিক বোধটুকুও তাদের ছিল না। নিউ ইয়র্কের এই ব্লাড স্ক্যাম মানুষের আদিম লোভ আর নিষ্ঠুরতার এক চরম ও নির্মম দলিল হয়ে থাকবে।

তথ্যসূত্র:
Federal Bureau of Investigation (FBI) investigation files, 1992
The New York Times, archival reports (1991–1993)
The New York Post, investigative coverage (1992)
New York City Department of Health, enforcement and sanction records

বি. দ্র.
এই প্রতিবেদনটি একটি অনুসন্ধানমূলক ও ঐতিহাসিক বর্ণনা, যা সংশ্লিষ্ট সময়ের আদালতের নথি, গণমাধ্যম প্রতিবেদন, সরকারি তদন্ত দলিল এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।

নব্বইয়ের দশকে নিউ ইয়র্কের বাঙালি কমিউনিটি যখন ধীরে ধীরে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শুরু করছিল, তখন এই ধরনের লোমহর্ষক ঘটনাগুলো কমিউনিটির জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে। একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি প্রত্যক্ষ করেছি, কীভাবে ব্যক্তিগত লালসা পূরণের জন্য কিছু মানুষের কর্মকাণ্ড একটি পুরো জাতিগোষ্ঠীর ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।

পাঠককে মানবিক উপলব্ধির আলোকে এই প্রতিবেদনটি পাঠ করার অনুরোধ জানাচ্ছি।


coxsbazarpost

coxsbazarpost

কক্সবাজারের স্থানীয় সাংবাদিকতা ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের বিশ্বস্ত লেখক।

সত্যতা যাচাই: এই সংবাদটি সম্পাদকীয় নীতি অনুসরণ করে বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

সংবাদ কিউআর কোড

নিচের QR কোডটি স্ক্যান করে যেকোনো মোবাইলে সংবাদটি সরাসরি ওপেন করুন।

ফটোকার্ড স্টুডিও

২য় লীড নিউজ
Card Image

নিউ ইয়র্কে ‘লাল সোনা’ ও রক্তের পৈশাচিক জালিয়াতি

www.coxsbazarposts.com সত্যের সন্ধানে অনুক্ষণ

প্রিন্ট প্রিভিউ

Logo www.coxsbazarposts.com

নিউ ইয়র্কে ‘লাল সোনা’ ও রক্তের পৈশাচিক জালিয়াতি

প্রতিবেদক: প্রতিবেদকের নাম: | প্রকাশিত: রবিবার, ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২৪ অপরাহ্ন
Print Image
[ad_1] রাত বারোটা। নিউ ইয়র্কের ব্রঙ্কসের একটি জরাজীর্ণ ভবনের বেসমেন্ট। বাইরে হিমশীতল হাওয়া আর ভেতরে ভ্যাপসা গন্ধ। একদল মানুষ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কারও পরনে তালি মারা কোট, কারও চোখে মাদকের নেশার ঘোর, আবার কেউ সদ্য বাংলাদেশ থেকে আসা দিশেহারা যুবক। একে একে তারা একটি নোংরা চেয়ারে গিয়ে বসছে। মরচে ধরা সূঁচ হাতে এক টেকনিশিয়ান অবলীলায় টেনে নিচ্ছে তাদের শরীর থেকে ‘লাল সোনা’। মাত্র ১০ বা ১৫ ডলারের বিনিময়ে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে এক ব্যাগ রক্ত। এই রক্তই পরে চলে যাচ্ছে বড় বড় ব্লাড ব্যাংকে, আর সেখান থেকে নামী হাসপাতালে। কিন্তু কেউ জানে না, এই রক্তের বোতলে লুকিয়ে আছে এক মরণঘাতী সত্য।নব্বইয়ের দশকের শুরুতে নিউ ইয়র্ক শহর এমন এক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিল, যা কেবল আমেরিকার জনস্বাস্থ্যকেই হুমকির মুখে ফেলেনি, বরং অভিবাসী সমাজের এক ভয়ংকর অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছিল। অর্থের লালসায় মানুষ কতটা নিচে নামতে পারে, তার ভয়াবহ বাস্তবতা হয়ে উঠেছিল এই ‘ব্লাড ট্রেড’।সেই সময়ে নিউ ইয়র্কে বাণিজ্যিক ব্লাড ব্যাংকগুলোর মধ্যে এক অঘোষিত প্রতিযোগিতা চলত। বড় বড় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালগুলোর রক্তের চাহিদা ছিল আকাশচুম্বী। বিশেষ করে ‘ব্লাড প্লাজমা’ থেকে দামী ওষুধ তৈরির জন্য এই অবৈধ সেন্টারগুলো হয়ে উঠেছিল একেকটি ‘রক্তের খনি’। ক্র্যাক-কোকেনের দাপটে অস্থির সেই সময়ে মাদক কেনার টাকার জন্য মাদকাসক্তরা দিনের পর দিন রক্ত দিতে আসত। নিয়ম অনুযায়ী বছরে কয়েকবারের বেশি রক্ত দেওয়া নিষিদ্ধ হলেও, এই চক্রগুলো দিনে দুবারও একই মানুষের রক্ত নিত। দাতাদের একটি বড় অংশই মারাত্মক সংক্রামক রোগে আক্রান্ত থাকায় সংগৃহীত রক্তের মান ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।এই ব্যবসার একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করত কিছু অসাধু বাংলাদেশি এবং দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী। জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা এবং ব্রঙ্কসের বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকায় এমন কিছু ছোট ছোট ‘ল্যাবরেটরি’ বা ‘ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ গড়ে উঠেছিল, যেগুলোর আড়ালে চলত এই অমানবিক কারবার।বাংলাদেশি মিডলম্যানরা মূলত নতুন আসা নথিপত্রহীন অসহায় অভিবাসী বাংলাদেশিদের টার্গেট করত। “সহজে ডলার আয় করার উপায়” হিসেবে তাদের এই মরণকূপে টেনে আনা হতো। এই দালালরা প্রতি ব্যাগের জন্য ৫ থেকে ১০ ডলার কমিশন পেত। স্বজাতির রক্ত বিক্রি করে পকেট ভারী করতে তাদের বিবেক বিন্দুমাত্র কাঁপেনি।এই চক্রের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নাম ছিল মোহাম্মদ সোহেল খান। সেই সময় মেডিকেইড জালিয়াতি ও অবৈধ রক্ত ব্যবসার তদন্তে তার নাম বারবার উঠে আসে। ফেডারেল তদন্ত নথিতে তাকে এই অবৈধ নেটওয়ার্কের মূল সংগঠক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।আগাপে ব্লাড সেন্টার গৃহহীনদের কাছ থেকে রক্ত কিনে তা ‘প্লাজমা’ হিসেবে বড় ওষুধ কোম্পানির কাছে বিক্রি করত। এইচআইভি বা হেপাটাইটিস পজিটিভ রক্তেও তারা ভুয়া লেবেল লাগিয়ে ‘নেগেটিভ’ হিসেবে বাজারে ছাড়ত। রক্ত সংগ্রহের নথিপত্র ছিল সম্পূর্ণ জাল। দাতার নাম ও ঠিকানা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া রাখা হতো, যাতে কোনো সংক্রমণের সূত্র খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।সিলেট থেকে ভাগ্য অন্বেষণে যুক্তরাষ্ট্রে আসা যুবক রফিক (ছদ্মনাম) হয়েছিলেন এই চক্রের শিকার। রফিক জবানবন্দিতে বলেছিলেন, “আমি যখন রক্ত দিতাম, তখন ল্যাবের পরিবেশ দেখে মনে হতো কসাইখানা। একবার রক্ত দেওয়ার পর আমি অজ্ঞান হয়ে যাই, কিন্তু তারা আমাকে সাহায্য করার বদলে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় বের করে দেয়।” রফিকের মতো শত শত বাংলাদেশি যুবক তখন এই পৈশাচিক ব্যবসার কাঁচামালে পরিণত হয়েছিল।১৯৯২ সালের মাঝামাঝি সময়ে নিউ ইয়র্কের বেশ কিছু হাসপাতালে রক্ত নেওয়ার পর রোগীদের অবস্থা রহস্যজনকভাবে খারাপ হতে থাকে। তখনই নড়েচড়ে বসে ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (FBI)। এক ভোরে শুরু হয় ‘অপারেশন ব্লাড ব্রাদার্স’। ব্রঙ্কস ও ম্যানহাটনের একাধিক ক্লিনিকে এফবিআই এবং স্বাস্থ্য বিভাগের শত শত এজেন্ট একযোগে হানা দেয়। দরজার তালা ভেঙে ভেতরে ঢোকার পর এজেন্টরা স্তম্ভিত হয়ে যান। রেফ্রিজারেটরে পচা খাবারের পাশেই রাখা ছিল রক্তের ব্যাগ। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল শত শত ব্যবহৃত সিরিঞ্জ। সেখান থেকেই উদ্ধার হয় মোহাম্মদ সোহেল খানের জালিয়াতির অকাট্য নথিপত্র। তদন্তে দেখা যায়, এই চক্রটি মেডিকেইড জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ৮০ লাখ ডলার হাতিয়ে নিয়েছে।প্রতিটি সংবাদপত্রের শিরোনাম ছিল, “Is Your Blood Safe?” (আপনার রক্ত কি নিরাপদ?)। বাংলাদেশি কমিউনিটি পত্রিকাগুলোও তখন এই কলঙ্কজনক অধ্যায় নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যা অভিবাসীদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও লজ্জার সৃষ্টি করে।নিউ ইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট আদালতের এজলাস। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ডক্টর আর্নেস্ট ওয়েট এবং সোহেল খান। প্রসিকিউটর যখন এইচআইভি আক্রান্ত রক্তের ব্যাগগুলো প্রমাণ হিসেবে পেশ করলেন, তখন আদালত কক্ষে উপস্থিত মানুষের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে যায়।এক ল্যাব টেকনিশিয়ান আদালতে স্বীকার করেন, “মালিকরা জানতেন এই রক্তে জীবাণু আছে, কিন্তু তারা বলতেন, ‘ওরা তো জঞ্জাল (homeless), ওদের রক্তে কী বা আসে যায়!’”বিচারক ব্রুস স্টালিং তার ঐতিহাসিক রায়ে বলেন, “আপনারা কেবল আইন ভাঙেননি, আপনারা মানুষের বিশ্বাস এবং পবিত্র রক্তকে অপবিত্র করেছেন।” ডক্টর ওয়েটকে ১০ বছর এবং সোহেল খানকে দীর্ঘমেয়াদী জেল ও কয়েক মিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়।নব্বই দশকের সেই রক্ত কেলেঙ্কারি আজও মনে করিয়ে দেয় যে, অর্থলিপ্সা মানুষকে পশুর চেয়েও নিচে নামাতে পারে। সেই অসাধু ব্যবসায়ীরা ডলারের জন্য যা হারিয়েছে, তা হলো একটি জাতির সম্মান। সেই বিষাক্ত রক্ত কোনো মুমূর্ষু শিশু কিংবা গর্ভবতী মায়ের শরীরে প্রবেশ করতে পারে এই ন্যূনতম মানবিক বোধটুকুও তাদের ছিল না। নিউ ইয়র্কের এই ব্লাড স্ক্যাম মানুষের আদিম লোভ আর নিষ্ঠুরতার এক চরম ও নির্মম দলিল হয়ে থাকবে।তথ্যসূত্র:Federal Bureau of Investigation (FBI) investigation files, 1992The New York Times, archival reports (1991–1993)The New York Post, investigative coverage (1992)New York City Department of Health, enforcement and sanction recordsবি. দ্র.এই প্রতিবেদনটি একটি অনুসন্ধানমূলক ও ঐতিহাসিক বর্ণনা, যা সংশ্লিষ্ট সময়ের আদালতের নথি, গণমাধ্যম প্রতিবেদন, সরকারি তদন্ত দলিল এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।নব্বইয়ের দশকে নিউ ইয়র্কের বাঙালি কমিউনিটি যখন ধীরে ধীরে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শুরু করছিল, তখন এই ধরনের লোমহর্ষক ঘটনাগুলো কমিউনিটির জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে। একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি প্রত্যক্ষ করেছি, কীভাবে ব্যক্তিগত লালসা পূরণের জন্য কিছু মানুষের কর্মকাণ্ড একটি পুরো জাতিগোষ্ঠীর ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।পাঠককে মানবিক উপলব্ধির আলোকে এই প্রতিবেদনটি পাঠ করার অনুরোধ জানাচ্ছি। [ad_2]

ডাইরেক্ট মেসেজ

Telegram Direct Message WhatsApp Direct Message

বাংলা ফন্ট কনভার্টার (বিজয় ⇄ ইউনিকোড)

×

তথ্য

×