মহাসমুদ্র পাড়ি দিয়ে মানুষ বিদেশে আসে স্বপ্ন আর আত্মমর্যাদা নিয়ে। নিউইয়র্কের জ্যামাইকা, জ্যাকসন হাইটস কিংবা এস্টোরিয়ার মতো ব্যস্ত জনপদে অভিবাসী বাংলাদেশিদের পরিশ্রম আর সততার যে দীর্ঘ পথচলা, সাম্প্রতিক এক মামলার খবরে সেটি বিব্রতকর প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কুইন্স ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি অফিসের ভাষ্য অনুযায়ী, কোভিড মহামারির সময় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য থাকা সহায়তা কর্মসূচিতে ভুয়া ব্যবসা ও কাল্পনিক ক্ষতির দাবি দেখিয়ে নয়জন বাংলাদেশি মোট প্রায় ২,২৫০,৩০৮ ডলার হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হন। এই জালিয়াতির খবর যখন প্রভাবশালী মার্কিন গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়, তখন লাখো বাংলাদেশির মাথা অপমানে নিচু হয়ে যায়।
তথ্য অনুযায়ী, এই জালিয়াতি চক্রটি ২০২০ সালের জুন মাসে তাদের তৎপরতা শুরু করে। তারা মূলত নিউইয়র্ক স্টেটের Empire Development Pandemic Small Business Recovery Grant Program এবং ফেডারেল Economic Injury Disaster Loan (EIDL) কর্মসূচিকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। অভিযুক্তরা অস্তিত্বহীন কিংবা অনেক আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যবসার নামে ডজনখানেক আবেদনপত্র জমা দেন। প্রতিটি আবেদনে তারা অঙ্গীকার করেছিলেন যে, এই অর্থ ব্যবসার বেতন, দোকান ভাড়া কিংবা ইউটিলিটি বিল পরিশোধের জন্য ব্যয় করা হবে। অথচ অর্থ পাওয়ার পরপরই আসামিরা সেই টাকা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তাদের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে সরিয়ে নেন।
ইসরায়েল নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট এগিয়ে, জয়ের পেছনে নিজের সমর্থনকে কৃতিত্ব দিলেন ট্রাম্প
২০২৪ সালের মে মাসে নিউইয়র্ক স্টেট ইনস্পেক্টর জেনারেলের দপ্তর এই ভয়াবহ জালিয়াতি শনাক্ত করে এবং মামলাটি কুইন্স ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির দপ্তরে পাঠায়। এরপর ২০২৫ সালের ৬ মে থেকে ৯ মে এর মধ্যে আসামিরা আলাদা আলাদা ভাবে আত্মসমর্পণ করেন।
এই মামলায় নয়জন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরন এক নয়, কারও বিরুদ্ধে স্টেট গ্র্যান্ট, কারও বিরুদ্ধে ফেডারেল লোন কর্মসূচি জালিয়াতির অভিযোগও রয়েছে। কমিউনিটিতে এদের পরিচিতি ও শিকড় নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে। সূত্র অনুযায়ী, আসামিদের সম্পর্কে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে তা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. জাকির চৌধুরী (৫৯): জ্যামাইকার গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল পার্কওয়ের এই বাসিন্দা বর্তমানে কমিউনিটিতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত। তার দেশের বাড়ি নোয়াখালি জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলায়। নিজেকে যুক্তরাষ্ট্র যুবদলের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচয় দেওয়া এই ব্যক্তি ৬টি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ২ লক্ষ ৮৭ হাজার ৬০৮ ডলার আত্মসাৎ করেছেন। আদালতে দোষ স্বীকারের পর তিনি গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর এক লক্ষ ডলার এবং ২৩ ডিসেম্বর আরও ৭৫ হাজার ডলার ফেরত দিয়েছেন। বাকি ৭৫ হাজার ডলার আগামী ২৩ মার্চের মধ্যে পরিশোধ করার শর্তে তিনি বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
৪. তানভীর মিলন (৫৫): লং আইল্যান্ডের ফার্মিডেলের বাসিন্দা তানভীর মিলনের বিরুদ্ধে অভিযোগ সবচেয়ে বড়। ৯টি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি প্রায় ২.৭ মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তানভীরের আদি নিবাস ঢাকা বিক্রমপুর অঞ্চলে বলে জানা গেছে। দোষী সাব্যস্ত হলে তার ২৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
৫. মোহাম্মদ চৌধুরী ওরফে খোকন আশরাফ (৬৮): জ্যাকসন হাইটসের এই প্রবীণ ব্যক্তির দেশের বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। তিনি ৫টি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ২ লক্ষ ২৯ হাজার ডলার চুরির দায়ে অভিযুক্ত। একসময় তিনি জাকির চৌধুরির পার্টনার ছিলেন।
৬. মোহাম্মদ খান (৪৯): জ্যামাইকা হিলসের বাসিন্দা মোহাম্মদ খানের দেশের বাড়ি সিলেট সদর এলাকায়। তিনি ৭টি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৬ লক্ষ ডলার হাতিয়ে নিয়েছেন। তাকে ১৫ বছরের কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে পারে।
৭. নাদিম শেখ (৫৬): নিউ হাইড পার্কের বাসিন্দা নাদিম শেখের বাড়ি ফরিদপুর জেলায়। তিনি দুটি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ১ লক্ষ ডলার আত্মসাৎ করেছেন।
৯. মাহবুব মালিক (৪১): এস্টোরিয়ার বাসিন্দা মাহবুব মালিক, যিনি ইতিমধ্যে দোষ স্বীকার করে তিন বছরের জন্য শর্তসাপেক্ষ মুক্তি পেয়েছেন। তার দেশের বাড়ি পাবনা জেলায়।
জালিয়াতির এই ঘটনা কেবল নিউ ইয়র্ক সিটির আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নথিতে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন আমেরিকার মূলধারায় বাংলাদেশিদের ইমেজের ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি মেলিন্ডা কাটজ ক্ষোভের সাথে বলেছেন যে, মহামারির মতো নজিরবিহীন সংকটের সময় মানুষের সেবার জন্য বরাদ্দ অর্থ নিজের পকেটে ভরা কেবল অপরাধ নয়, এটি চরম নির্লজ্জতা।
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে কুইন্স ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি অফিস জানায়, নয়জন আসামি বিভিন্ন সময়ে দোষ স্বীকার করেছেন এবং কুইন্স সুপ্রিম কোর্টের আদেশে মোট ১,০৯১,৭২০ ডলার রেস্টিটিউশন নির্ধারিত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৭৬০,০০০ ডলার ইতিমধ্যে ফেরত এসেছে।
নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির সাধারণ মানুষ জালিয়াতির এই ঘটনায় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। অনেকের আশঙ্কা, এ ধরনের অপরাধ কমিউনিটির ভাবমূর্তির ওপর অযাচিত সন্দেহের ছায়া ফেলে। বিশেষ করে ছোট ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এর পরিণতিতে বাংলাদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরকারি নজরদারি ও হয়রানির চাপ বেড়ে যেতে পারে। কমিউনিটিতে একটি কথাই ঘুরে ফিরে আসছে, বিদেশের মাটিতে সম্মান গড়তে সময় লাগে, কিন্তু তা নষ্ট হতে সময় লাগে না।
তথ্যসূত্র:
১. কুইন্স ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি অফিস প্রেস রিলিজ: (আপডেটেড ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬)
২. নিউইয়র্ক স্টেট ইনস্পেক্টর জেনারেল অফিসিয়াল রিপোর্ট: (১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬)
৩. Newsday Exclusive: (১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬)




মন্তব্য করুন