কানাডার কনকনে শীতের সকালে যখন একজন অভিবাসী বা স্বল্প আয়ের মানুষ একবেলা খাবারের আশায় লাইনে দাঁড়ান, তখন তার একমাত্র সম্বল থাকে আস্থা। কিন্তু সেই আস্থায় যদি ফাটল ধরে, তবে তা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়, বরং পুরো মানবিক ব্যবস্থার জন্য একটি অশনিসংকেত। টরন্টোর অন্যতম প্রধান খাদ্য সহায়তা সংস্থা ‘ডেইলি ব্রেড ফুড ব্যাংক’ এবং ‘ফিড স্কারবোরো’র সাম্প্রতিক দ্বন্দ্ব আজ সেই প্রশ্নটিই বড় করে তুলেছে। আর্থিক অনিয়ম এবং অস্বচ্ছতার অভিযোগে দীর্ঘদিনের এই অংশীদারিত্ব ছিন্ন হওয়ার সংবাদে এখন কানাডার বাংলাভাষী কমিউনিটিসহ সর্বস্তরের মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন, দাতব্য কাজের আড়ালে কী ঘটছে?
কানাডার সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের একটি অপরিহার্য অংশ হলো ফুড ব্যাংক। এটি মূলত একটি অলাভজনক সংস্থা যা অনুদান হিসেবে প্রাপ্ত খাবার এবং অর্থ সংগ্রহ করে ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। কানাডায় প্রতি বছর কয়েক লাখ মানুষ ফুড ব্যাংকের ওপর নির্ভর করেন। গত কয়েক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বাড়ি ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারও এখন ফুড ব্যাংকের দ্বারস্থ হচ্ছে।
অস্কারজয়ী চিলিয়ান চলচ্চিত্র নির্মাতা সেবাস্তিয়ান লেলিও আর নেই

টরন্টোর ‘ডেইলি ব্রেড ফুড ব্যাংক’ একটি কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী সংস্থা বা হাব হিসেবে কাজ করে, যারা কয়েকশ ছোট বড় সদস্য সংস্থাকে খাবার ও আর্থিক অনুদান সরবরাহ করে। ‘ফিড স্কারবোরো’ তাদের এমনই একটি বড় সদস্য সংস্থা।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সিবিসি নিউজ যে নথি ও পুলিশের কাছে জমা দেওয়া রিপোর্ট পর্যালোচনা করেছে, এবং ডেইলি ব্রেড যে অভিযোগগুলো তুলেছে, তা সত্যিই উদ্বেগজনক। রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ফিড স্কারবোরোর সিইও সুমন রায়ের বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাত এবং ইনভয়েস সংক্রান্ত অনিয়মের একাধিক অভিযোগ উঠেছে।
প্রথমত, রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, প্রায় ১৮ হাজার ডলারের ইনভয়েস ডেইলি ব্রেডকে দেওয়া হয়েছিল এমন এক ভেন্ডরের নামে, যার কাছে ওই ইনভয়েসগুলোর কোনো রেকর্ড নেই বলে বলা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, অনুদানের ১০ হাজার ডলার ব্যয় দেখিয়ে সুমন রায় তার নিজের মালিকানাধীন গোরমেট অ্যালকেমি নামের প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে খাবার কেনার অভিযোগ উঠে এসেছে। তৃতীয়ত, ১ লক্ষ ১১ হাজার ডলারের বেশি ব্যয়ের দাবি তিনি নিজেই অনুমোদন করেছিলেন এবং নিজের নামেই চেক ইস্যু করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও তদারকির মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তবে এগুলো অভিযোগ, এখনো আদালতে পরীক্ষিত নয় এবং কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ গঠন হওয়ার তথ্যও সামনে আসেনি।

ফুড ব্যাংকগুলোর মূল চালিকাশক্তি হলো সাধারণ মানুষের দান এবং বিভিন্ন প্রকল্পভিত্তিক অনুদান। যখন এ ধরনের অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে, তখন দাতারা স্বাভাবিকভাবেই দ্বিধায় পড়েন, এবং সেই দ্বিধা পুরো ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। ‘ডেইলি ব্রেড’ ও তাদের সদস্য সংস্থাগুলো প্রতিবছর বড় অঙ্কের খাদ্য ও তহবিল ব্যবস্থাপনা করে।
হাজার হাজার সাধারণ মানুষ তাদের আয়ের একটি অংশ ক্ষুধার্তদের জন্য দান করেন। বড় বড় গ্রোসারি চেইন এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো অবিক্রিত খাবার ও নগদ অর্থ সহায়তা দেয়। একই সঙ্গে সরকারও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সামাজিক সহায়তা তহবিল দেয়। তাই স্বচ্ছতা এখানে শুধু একটি নীতি নয়, এটি ব্যবস্থাটির শ্বাসপ্রশ্বাস।

আর্থিক অনিয়মের প্রতিটি ডলার মানে হলো একজন মানুষের থালা থেকে খাবার কেড়ে নেওয়া। ডেইলি ব্রেডের সিইও নিল হেদারিংটন যথার্থই বলেছেন, “প্রতিটি ডলার যা অপচয় হয়, সেটি আসলে একেকটি আহার।”
‘ডেইলি ব্রেড’ জানিয়েছে, তারা অনিয়মের সন্দেহ ওঠার পর এক পর্যায়ে ‘ফিড স্কারবোরো’র অর্থায়ন স্থগিত করেছিল, তবে সাধারণ মানুষের ক্ষতি এড়াতে খাদ্য সরবরাহ চালু রেখেছিল। আর টরন্টো পুলিশও নিশ্চিত করেছে যে ডেইলি ব্রেডের করা একটি অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইমস ইউনিট তদন্ত করছে। তবে এখন পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হয়নি, তাই সব পক্ষের বক্তব্য ও প্রমাণ যাচাই না হওয়া পর্যন্ত এটিকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা উচিত।
স্কারবোরোর এই ফুড ব্যাংক বিতর্ক আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, সাহায্য করার সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়, বরং সংগৃহীত প্রতিটি পয়সার হিসাব রাখার সততাও থাকতে হবে। আমরা আশা করি, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে এবং স্কারবোরোর অভাবী পরিবারগুলো তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না।
তথ্যসূত্র:
CBC News (January 12, 2026)
CityNews (January 12, 2026)
Daily Bread Food Bank




মন্তব্য করুন