উখিয়ায় গত ১৬ বছরে বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের দখলে চলে গেছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ একর সংরক্ষিত বনভূমি। দীর্ঘদিন ধরে দখল, পাহাড় কাটা, বালু উত্তোলন ও স্থাপনা নির্মাণে ধ্বংস হয়েছে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল।
এ অবস্থায় উপজেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের যৌথ অভিযানে গত পাঁচ মাসে উদ্ধার করা হয়েছে ১৫০ একরেরও বেশি বনভূমি এবং উচ্ছেদ করা হয়েছে পাঁচ শতাধিক অবৈধ স্থাপনা। একই সঙ্গে সংরক্ষিত বনে স্থাপিত চার শতাধিক অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে নজির স্থাপন করেছে প্রশাসন ও বন বিভাগ।
উখিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা আবদুল মান্নান জানান, অনেক স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলেও এখনো কয়েকজন প্রভাবশালী দখলদার ধরাছোঁয়ার বাইরে। পাহাড় কেটে শ্রেণি পরিবর্তন, আমবাগান থেকে শুরু করে পোল্ট্রি–ডেইরি ফার্ম, দোকানপাট ও ভাড়া বাড়ি—সবই রয়েছে এসব দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী, র্যাব ও বন বিভাগকে সঙ্গে নিয়ে টাস্কফোর্সের মাধ্যমে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উখিয়া উপজেলার সাবেক ও বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত অর্ধশতাধিক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত বনে বসতবাড়ি, দোকানপাট, বাণিজ্যিক প্রকল্প ও এনজিও অফিস নির্মাণ করে কোটি টাকার দখল বাণিজ্য চালিয়ে আসছেন। এনজিও ডব্লিউএফপি, মুক্তি, জাগরণী চক্র, হোপ, ব্র্যাকসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় পর্যন্ত তৈরি হয়েছে সংরক্ষিত বনের ভেতর, যেখানে ভাড়া বাবদ মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন কথিত ভূমিদস্যুরা।
হাসপাতালে ভর্তি শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী
সংরক্ষিত বনভূমিতে অবৈধ বসতঘর ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে উখিয়া পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের দেওয়া ১ হাজার ৫৫৩টি অবৈধ সংযোগের তথ্য উদঘাটন করেছে বন বিভাগ। রেঞ্জ কর্মকর্তার চিঠির পর ৬৯টি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং সম্প্রতি বন্য হাতি হত্যার ঘটনার পর একদিনে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে আরও ৩৫০টি সংযোগ। গত ১৮ নভেম্বর রাজাপালংয়ের খয়রাতিপাড়ায় অবৈধ বিদ্যুৎ লাইনের ফাঁদে পড়ে একটি হাতির মৃত্যু ঘটে; গত নয় মাসে উখিয়ার বনাঞ্চলে এভাবে তিনটি হাতির মৃত্যু পরিবেশবাদীদের গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বছরের ১৮ জুন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে রেঞ্জ কর্মকর্তা আবদুল মান্নান বনভূমি দখল, পাহাড় কাটা ও বালি উত্তোলনের অভিযোগে ৫৩টি বন মামলা ও একটি জিআর মামলায় মোট ২৫৪ জনকে আসামি করেছেন। জব্দ করা হয়েছে চারটি ডাম্পার, উচ্ছেদ করা হয়েছে আটটি অবৈধ করাতকল। সর্বশেষ উখিয়ার বালুখালী মরা গাছতলায় বছরের সবচেয়ে বড় অভিযান পরিচালনা করে উপজেলা প্রশাসন ও বন বিভাগ; যেখানে উচ্ছেদ করা হয় প্রায় ২৫০টি দোকানপাট ও বসতঘর।
পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান গফুর উদ্দীন চৌধুরী অভিযোগ করেন, অতীতে আওয়ামী লীগের পরিচয়ে যারা পাহাড় কাটা, বালি উত্তোলন ও দখল বাণিজ্য চালাতেন, তারা এখন বিএনপি সহ বিভিন্ন দলের ট্যাগ লাগিয়ে একই কাজ করছে। অনেকেই আবার ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত বলে দাবি তার। অন্যদিকে উখিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরওয়ার জাহান চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটে যত বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার চেয়ে বেশি জমি দখল করেছে স্থানীয় আওয়ামী নেতাকর্মীরা। এখনই এসব জমি উদ্ধার করে বনায়ন ও ইকোপার্ক গড়ে তোলার সময়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল হোসেন চৌধুরী জানান, বনভূমি বা সরকারি জমি দখলকারীরা যত বড় প্রভাবশালীই হোক, ছাড় নেই। অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে, দলবদল বা রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে রেহাই মিলবে না। সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষায় নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।




মন্তব্য করুন