লন্ডনের পূর্ব প্রান্ত—বো, স্টেপনি, হ্যাকনি—নামগুলো যেন অভিবাসনের রঙে আঁকা বৈচিত্র্যের ক্যানভাস। এখানে ঘরবাড়িগুলো ঘনবসতি ও বাসের শব্দে চিরচেনা, দেশি গ্রোসারি দোকান, রেষ্টুরেন্ট আর বিকেল বেলা পার্কে টেমসের হাওয়া খেতে আসা বাঙালি নারীদের হাঁকডাক ও শিশুদের কলকাকলী। এইসব অভিবাসী-জীবনের দৃশ্যপটের ঠিক মাঝখানে, এক অন্ধকারময় ছায়ার মতোই জড়িয়ে আছে এপিং ফরেস্ট। যেখানে কুয়াশার চাদরে মোড়া পথে পা ফেললেই মনে হয় কেউ অনুসরণ করছে। প্রকৃতি আর রহস্যে মোড়ানো এ উপশহরী বনাঞ্চল, যেখানে মাঝে মাঝে ঘোড়া হাঁটে, পাখিরা ডাকে, আর কিছু কিছু মানুষ চিরতরে হারিয়ে যায়।
এই এপিং ফরেস্টেই, ২০০৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি, এক বিভীষিকাময় আগুন জ্বলে উঠেছিল। বনের ঘন ছায়া ভেদ করে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠেছিল আকাশে। গন্ধে ছিল কেবল শুকনো পাতার পোড়া ধোঁয়া নয়—ছিল পোড়া পোড়া মাংসের গন্ধ, যা বাতাসে মিশে লন্ডনের পূর্ব দিক ছুঁয়ে গিয়েছিল নিঃশব্দে। সে রাতে অনেকে ঘুম ভেঙে জানালা খুলেছিলেন; কেউ কিছু দেখেনি, কিন্তু অনুভব করেছিল—কোথাও যেন একটি কান্না লুকিয়ে কাঁদছে। এক অসহায় আত্মার চিৎকার কেউ শুনতে পায়নি তখন, কিন্তু পরে যখন সত্য বেরিয়ে আসে, তখন পুরো শহর স্তব্ধ হয়ে যায়।
শুরুটা হয়েছিল ভালোবাসা দিয়ে—বা বলা ভালো, মোহ দিয়ে। শাহ আফরুজ আলি, চল্লিশ বছরের নির্মাণ শ্রমিক ও ডেকোরেটর, তিন সন্তানের পিতা, জীবন গড়ার জন্য বাংলাদেশ থেকে ইংল্যান্ডে পাড়ি দিয়েছিলেন অনেক আগেই। কঠোর পরিশ্রমে গড়ে তুলেছিলেন একটা স্থিতিশীল জীবন। স্ত্রী, সন্তান, নিজের একটা বাড়ি—সবই ছিল। কিন্তু সেই সুখে বাসা বাঁধে পরকীয়া।
এবার মিরপুরে প্রাইভেটকার লক্ষ্য করে ককটেল বিস্ফোরণ, রাজধানীতে বাড়ছে নিরাপত্তা উদ্বেগ
সাত বছর আগে কোনো একদিন কাজের সূত্র ধরে আফরুজ আলি বো এলাকার হোয়াইট ল হাউসে যান। সেটি ছিল স্বামী পরিত্যক্তা এক নারীর বাসা। তার নাম জয়গুন নেছা। ঐ বাড়িতে সে তার একমাত্র সন্তানকে নিয়ে বসবাস করতেন। সেখান থেকেই পরিচয়। পরিচয়ের সূত্র ধরে গড়ে ওঠে প্রেমের সম্পর্ক।
আফরুজ আলি তার হৃদয় উজাড় করে দিয়েছিলেন জয়গুনের জন্য। গাড়ি, গয়না, টাকা—সব মিলিয়ে £২৭,০০০ পাউন্ড এর বেশি খরচ করেছিলেন তাকে খুশি রাখতে। এমনকি জয়গুনের ছেলের জন্য আরবি ভাষার ক্লাসের ব্যবস্থাও করেছিলেন। তার বন্ধুদের বলেছিলেন, “এটা কোনো সম্পর্ক না, এটা মোহ।” কিন্তু ভালোবাসা যখন একমুখী হয়, তখন তা বিষ হয়ে ওঠে।

জয়গুনের জীবনে তখন এসে গেছে নতুন প্রেম। প্রেমিকের নাম কফিল উদ্দিন। নতুন প্রেমের কাছে পুরোনো প্রেম হয়ে ওঠে বোঝা। তার আবির্ভাবে ঘটনা পরিস্থিতি ক্রমে জটিল হয়ে আসে। জয়গুন সিদ্ধান্ত নেন কফিলকে বিয়ে করবেন।

১২ ফেব্রুয়ারি সকাল। আফরুজ আলি স্ত্রীকে বলে যান তিনি গাড়ির নিলামে যাচ্ছেন। আদতে যাচ্ছেন জয়গুনের ডাকে। টাওয়ার হ্যামলেটসের এক স্কুলের কাছে দেখা হয় জয়গুন, খান আর রাজার সঙ্গে। সেখান থেকে একসাথে রওনা হন এপিং ফরেস্টের দিকে। জয়গুন রাস্তায় থেমে পেট্রোল কেনেন। তার ভাষায়, বারবিকিউর জন্য।
বনের ভেতর ছায়া ও পাখির ডাকের মাঝে, জয়গুন ও আজহর একটি কম্বল বিছিয়ে পিকনিকের অভিনয় করেন। আজহর সঙ্গে করে এনেছিলেন একটি সামুরাই তলোয়ার। হঠাৎ ঘাড় বরাবর নেমে এলো তলোয়ারের এক বিশাল ঘা—আলি রক্তাক্ত। ধাক্কা, চিৎকার, অন্ধকার। এরপর পেট্রোল ঢেলে আগুন—জীবন্ত মানুষটির দেহে আগুন ধরে যায়, আর্তনাদে কেঁপে ওঠে বন। মৃত, না কি তখনও নিঃশ্বাস ছিল, কেউ জানে না। হত্যার পর, তারা আলির টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যান এবং পরে সেটিতেও আগুন লাগিয়ে দেন।
তিন দিন পর, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৫, বাকহার্স্ট হিল কমিউনিটি সেন্টারের পক্ষে হাঁটার আয়োজন করা রোনাল্ড অ্যান্ড্রুজ ও তার স্ত্রী প্যাট্রিসিয়া বনভূমিতে একটি পোড়া মরদেহ খুঁজে পান। মরদেহটি এতটাই বিকৃত ছিল যে, তাকে শনাক্ত করতে ডেন্টাল রেকর্ড ব্যবহার করতে হয়। জানা গেলো শাহ আফরুজ আলি আর নেই।
ওল্ড বেইলি আদালতে বিচার শুরু হয়। জয়গুন নেসা, ২৭, এবং তার ভাই আজহর খান, ১৮—দুজনেই দোষী সাব্যস্ত হন খুনের দায়ে। যাবজ্জীবন কারাদন্ড। রেহান রেজা জানান, তিনি ভেবেছিলেন শুধু মারধোর হবে। কিন্তু আদালত মানেনি। তাকে গ্রিভিয়াস বডিলি হার্ম ষড়যন্ত্রের দায়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালত নেসাকে জানিয়ে দেয়, তাকে অন্তত ১৩ বছর ও তার ভাইকে অন্তত ১১ বছর কারাগারে থাকতে হবে। আদালতে রায় শোনার পর জয়গুন আদালতের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে কাঁদেন, কিন্তু কেউ তাকে সহানুভূতি দেখায়নি, নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে ধরে নিয়ে যান। আদালতের বিচারক জেরেমি রবার্টস বলেন, “এটি ছিল পরিকল্পিত খুন।”
এপিং ফরেস্টের সেই প্রান্তে আজও সকালে কুয়াশা নামে। গাছেরা দাঁড়িয়ে আছে এক নিঃসঙ্গ সাক্ষীর মতো।




মন্তব্য করুন