রংপুর, ৯ মার্চ – রংপুরে আলুর বাজারে ব্যাপক ধস দেখা দেওয়ায় চরম হতাশায় পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। সরকারিভাবে আলুর দর কেজিপ্রতি ২২ টাকা নির্ধারণ করা হলেও হিমাগারের আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে কৃষকের পকেটে যাচ্ছে মাত্র পাঁচ টাকা। ফলে প্রতি কেজি আলুতে বিপুল অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে চাষিদের।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে চলতি মৌসুমে শুধু রংপুর জেলাতেই প্রায় ৬৬ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে প্রায় ২০ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। তবে এই বিপুল উৎপাদনের বিপরীতে সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। জেলায় থাকা মাত্র ৪০টি হিমাগারের মোট ধারণক্ষমতা প্রায় চার লাখ ৬০ হাজার টন যা উৎপাদনের চার ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম।
রক্ষণাবেক্ষণ শেষে সামিটের এলএনজি টার্মিনাল থেকে আবারও গ্যাস সরবরাহ শুরু
খোঁজ নিয়ে জানা যায় রংপুর সদর উপজেলা, মিঠাপুকুর, পীরগঞ্জ, গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, পীরগাছা, বদরগঞ্জ এবং তারাগঞ্জ এলাকায় এবার আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। বিশেষ করে গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তার চর সংলগ্ন এলাকাগুলোতে ফলন সবচেয়ে বেশি। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে জেলার ৪০টি হিমাগারে বর্তমানে চার লাখ ৬১ হাজার ৭৪৭ টন আলু সংরক্ষিত আছে।
এর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র এক লাখ এক হাজার ৫৯৪ টন আলু বের করা সম্ভব হয়েছে। বাজারে আলুর চাহিদা কম থাকায় হিমাগার থেকে আলু তোলার হারও তুলনামূলকভাবে বেশ কম। আগামী অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই নতুন মৌসুমের আলু আবাদ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে এবং মাত্র ৬০ দিনের মধ্যেই সেই নতুন আলু বাজারে চলে আসবে।
এমন পরিস্থিতিতে হিমাগারে থাকা বিপুল পরিমাণ অবিক্রীত আলু পচে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে এক কেজি আলু উৎপাদনে ১৮ থেকে ২০ টাকা খরচ হয়। এর সঙ্গে বস্তা, পরিবহন ও হিমাগারে সংরক্ষণের খরচ যোগ করলে প্রতি কেজির মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৩০ টাকার ওপরে।
কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ প্রায় ২০ টাকা হলেও মৌসুমের শুরুতে বাজারদর ভালো থাকায় তিনি ৭০০ বস্তা আলু হিমাগারে রাখেন। গত মাসে বাধ্য হয়ে ১২ টাকা দরে ৩০০ বস্তা আলু বিক্রি করলেও কেজিপ্রতি হিমাগার ভাড়া ছয় টাকা ৭৫ পয়সা কেটে নেওয়ায় তার হাতে এসেছে মাত্র পাঁচ টাকা ২৫ পয়সা। রংপুরের এনএন হিমাগারেও প্রায় দুই লাখ ৬০ হাজার বস্তা আলু মজুত থাকলেও এখন পর্যন্ত বের হয়েছে মাত্র ৪৫ হাজার বস্তা।
তারাগঞ্জ উপজেলার কৃষক বাদল মিয়া হতাশা প্রকাশ করে বলেন এক কেজি আলু উৎপাদনে তাদের ২০ টাকা এবং আনুষঙ্গিক মিলিয়ে প্রায় ৩০ টাকা খরচ হয়। বাজারে সাত থেকে আট টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় তাদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামীতে অনেক কৃষক আলু চাষ ছেড়ে দেবেন বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানান সরকারি উদ্যোগে রংপুর অঞ্চল থেকে আলু কেনা হলে কৃষকরা কিছুটা লাভবান হতেন তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা আসেনি।
তারা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের পরিকল্পিতভাবে আবাদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবেই প্রতি বছর এমন অস্থিরতা দেখা দেয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সময়মতো সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে কৃষকরা আলু চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন।




মন্তব্য করুন