কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে ৩৩ টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প রয়েছে। এতে পনের লাখের কাছাকাছি রোহিঙ্গা বসবাস করছে।
এ গুলোর পাশাপাশি মিয়ানমার থেকে আরো ৫০ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে বলে সীমান্তে বসবাসকারী লোকজন জানিয়েছেন।
আজ ২৫ আগষ্ট রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আট বছর পূর্ন হবে। এ উপলক্ষে উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দিনব্যাপী নানান কর্মসূর্চী পালন করবেন। এর মধ্যে মসজিদে দোয়া মাহফিল ও রোহিঙ্গাদের নিয়ে সমাবেশ করার কথা রয়েছে। এখনো পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারের ফেরত পাঠানো যায়নি।
উল্টো উখিয়া-টেকনাফ-বান্দরবানের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে গত ১ বছরে আরো দেড় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছেন। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চারমাসের মধ্যে তিনটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
টেকনাফে সিএনজির বিশেষ চেম্বার থেকে ১৩ হাজার ইয়াবা উদ্ধার, চালক আটক
উক্ত সম্মেলনের আয়োজক জাতিসংঘ,বাংলাদেশ ও কাতর। মিয়ানমারের সামরিক জান্তার নির্যাতনের মুখে এদেশে পালিয়ে আসেন। এসব রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল বাড়াতে ও মিয়ানমারের রাখাইনে ফেরত পাঠাতে জোর তৎপর চালানো হচ্ছে।
স্হানীয়রা বলেছেন রোহিঙ্গা সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছেন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন করতে না পারলে এ অঞ্চলের ঝুঁকি বাড়তে পারে। দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের দাবী জানান।
আগামী ২৫ আগষ্ট সোমবার কক্সবাজারে ‘অংশীজন সংলাপ: রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে আলোচনার জন্য প্রাপ্ত বার্তা’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হবে।
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা যায়, কক্সবাজারে অনুষ্ঠেয় ওই সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
সম্মেলনে কয়েকটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, রোহিঙ্গাবিষয়ক কয়েকজন আন্তর্জাতিক দূত, বিদেশে বাংলাদেশ মিশন এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। কক্সবাজারের শিবিরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা এবং বিশ্বের কয়েকটি দেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরাও এই সম্মেলনে অংশ নেবেন। উক্ত সম্মেলনে অংশ নিতে সৌদি আরব, কাতার, চীন, তুরস্ক, ফিনল্যান্ড, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, গাম্বিয়াসহ অন্তত ১০টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
কক্সবাজারে আয়োজিত সম্মেলনটি মূলত তিন দিনের। ২৪, ২৫ ও ২৬ আগস্ট এই তিন দিন আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং শরণার্থীশিবির প্রদর্শনী থাকবে ওই আয়োজনে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ২৪ ও ২৫ আগস্ট পাঁচটি কর্ম অধিবেশন থাকছে। আলোচনার বিষয় রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা এবং তাদের রাখাইনে প্রত্যাবাসন শুরু করা। ২৬ আগস্ট রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করবেন অতিথিরা।
এ ব্যাপারে উখিয়ার সীমান্তবর্তী পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেছেন রোহিঙ্গা আমাদের জন্য বিষফোঁড়া। এদের কারনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি ঘটেছে। প্রতি নিয়ত চুরি-ছিনতাই ও অপহরণের মত ঘটনা ঘটে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বন্ধ। উল্টো প্রতিদিন বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করছে।
উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসকারী নুরুল আলম বলেন সেদিনের কথা গুলো মনে পড়তে কান্নায় ভেঙে পড়েন। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার সময় আমার এক ছেলে হারিয়ে যাই। এখনো ও বেঁচে আছে কিনা জানি না। বাংলাদেশে আর ভাল লাগে না। দ্রত নিজ দেশে ফিরে যেতে চায়।
একই রোহিঙ্গা ক্যাম্পের হেড মাঝি দিল মোহাম্মদ বলেন বর্তমানে মিয়ানমারের পরিস্থিতি ভাল না। এখন ও পর্যন্ত তাদের দাবী দাওয়া মেনে নেয়নি। উল্টো রাখাইনে রোহিঙ্গাদের উপর চরম নির্যাতন করছে বলে খবর পাচ্ছি।
উখিয়ার জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা আবুল কাশেম বলেন নিজেদের নাগরিকত্ব ফিরে দিলে নিজ দেশে ফেরত যাবেন। ২০১৭ সালে প্রথম এদেশে আসেন। তিনি আরো বলেন ক্যাম্পে কোন রকম জীবনযাপন করছি। বিভিন্ন দাতা সংস্থা কৃর্তক রেশন সামগ্রী পারছি। ইচ্ছা করলে ভাল মন্দ খেতে পারছি না।
একই রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইউসুফ বলেন এখানে উচ্চ শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ নেই। নিজ দেশে ফিরে গিয়ে পড়ালেখা করতে ইচ্ছুক। তার মতে অনেকেই মনে করেন মিয়ানমারের ফিরে যেতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
উখিয়ার লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা আয়েশা আকতার বলেন আরকানের কথা বেশি মনে পড়ছে। দিনে-রাতে কান্না করি।
একই ক্যাম্পের বাসিন্দা আবুল কালাম ও রশিদ উল্লাহ বলেন, ‘এখন আমাদের ফেরার সব পথ বন্ধ। ফিরে যেতে চাইলে আরাকান আর্মি গুলি চালাবে, অসংখ্য মানুষ মারা যাবে।’
উখিয়ার লম্বাশিয়া ক্যাম্পের মোবারক আলী বলেন, ‘আমরা নিরাপত্তা চাই, মর্যাদাসম্পন্ন প্রত্যাবাসন চাই। এখন রাখাইন তো আরাকান আর্মির দখলে, সেখানে কীভাবে নিরাপত্তা পাবো?’
বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন
‘প্রত্যাবাসন কোথায় হবে, কীভাবে হবে, তা পরিষ্কার নয়। এখন তো রাখাইন আরাকান আর্মির দখলে। মিয়ানমার সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে রয়েছে আরাকান আর্মির বিরোধ। নতুন করে অনুপ্রবেশ হচ্ছে। ফলে প্রত্যাবাসন কবে আলোর মুখ দেখবে বলা যাচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ চাইলে আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি রোডম্যাপ বা কর্মকৌশল তৈরি করতে পারে। এই সংকট দ্রুত সমাধান হবে না। তাই দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।’
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘দিন দিন জটিল হচ্ছে প্রত্যাবাসন। তবে সবকিছুর পরও প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’
মূলত ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতনের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এরপর থেকে আন্তর্জাতিক তৎপরতা, দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও জাতিসংঘের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও প্রত্যাবাসনের কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। এর মধ্যে আরাকান আর্মির দখল পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।




মন্তব্য করুন