বৃহত্তর টরন্টোর একটি ছায়াঘেরা উপশহর মিসিসাগা। শহর নয়, যেন গৃহবাসীদের নিরব স্বপ্নের এক ছায়া-প্রাচীন ঠাঁই, যেখানে উঁচু অ্যাপার্টমেন্ট, স্কুলবাসের হলুদ আলো আর আকাশপানে তাকানো গির্জার চূড়া মিলেমিশে এক জীবনচিত্র আঁকে এখানে।
ডিসেম্বরের সকাল মানেই কুয়াশা ঘেরা হিমেল বাতাস, জমাটবাঁধা নিঃশ্বাস, আর নিস্তব্ধ রাস্তায় টুপটাপ বরফ পড়ার শব্দ। শহরের সীমানার এক কোণে ডেইরি রোড, আর হিথডেল ট্রেইলের ধারে একটি সাধারণ অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের নিচে সারি সারি পার্কিং লট।
সে ভোরে প্রতিটি গাড়ির জানালায় জমে উঠেছিল রাতের শিশির, কাচের ওপারে ধোঁয়াটে নিঃশ্বাসের কুয়াশা। ঠিক সেই পার্কিং লটের মাঝখানে পড়ে ছিলেন এক নারী। জ্যাকেটের নিচে গুটিয়ে রাখা হাত, মাথার পাশে ছড়িয়ে থাকা রক্তের ধারা তখন মাটি থেকে বরফের গায়ে গড়িয়ে যাচ্ছিল। তিনি ছিলেন এক বাংলাদেশি নারী। কানাডার নাগরিকত্ব তার ছিল, কিন্তু নিরাপত্তা ছিল না।
৭ নভেম্বর উপলক্ষে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের শ্রদ্ধা
জাহাঙ্গীর আলমের জন্ম নোয়াখালির সুবর্ণচরে, এক রক্ষণশীল পরিবারের চৌহদ্দিতে। মেধাবী ছাত্র না হলেও মাধ্যমিক পেরিয়ে পড়তে শুরু করেন মাইজদি কলেজে। কিন্তু ২০০১ সালে ভবিষ্যতের হাতছানি, একটি স্টুডেন্ট ভিসা পকেটে নিয়ে তিনি পাড়ি জমান কানাডায়—স্বপ্নের দেশে।
Sheridan College-এ ভর্তি হন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজিতে। ক্লাস আর কাজ—প্রথমে গ্যাস স্টেশনে, পরে Magna International-এ লাইন অ্যাসেম্বলারের কাজ পান। ২০০৫ সালে পিআর এবং ২০১০ নাগাদ কানাডীয় নাগরিকত্ব লাভ করেন।
রাবেয়া আলম। কুমিল্লার দাউদকান্দির এক সমাজবিজ্ঞান ছাত্রী। তার বাবা সিটি কর্পোরেশনে কর্মচারী, মা স্কুল শিক্ষিকা। রাবেয়া বড় হয়েছেন বই আর সংগঠনের মাঝে। ২০০৭ সালে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় জাহাঙ্গীরের সঙ্গে। স্বপ্ন নিয়ে আসেন কানাডায়, ২০০৮ সালে, স্বামীর স্পন্সরশিপে। প্রথমদিকে সবকিছু নতুন, সবকিছু অদ্ভুত সুন্দর। কিন্তু ধীরে ধীরে সম্পর্কে জমে উঠছিল অন্ধকারের ছায়া।
২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর। রাবেয়া বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন। তখনই জাহাঙ্গীরের হুমকি, “তালাক? তাহলে তুই মরবি।” পুলিশের কাছে একাধিক রিপোর্ট জমা পড়ে। স্থানীয় ওমেন শেল্টারে যোগাযোগ করেন রাবেয়া, কিন্তু দুই সন্তানের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নেন—আরেকবার চেষ্টা করবেন।
২০১৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর। তুষার ঢাকা সেই সকালে রাবেয়া বের হচ্ছিলেন ছেলেকে স্কুলে দিতে। পার্কিং লটেই অপেক্ষায় ছিলেন জাহাঙ্গীর, হাতে ছুরি। তিনি এগিয়ে যান, আর তারপর—ছুরিকাঘাত। বুক, পেট, ঘাড়। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, তার শরীরে ছিল ২৬টি ছুরির আঘাত। প্রতিবেশীর সিসিটিভিতে দেখা যায়, তিনি রক্তমাখা হাতে ফোন করছেন ৯১১-এ: “আমি আমার স্ত্রীকে মেরে ফেলেছি।”
অ্যাম্বুলেন্স আসে। পুলিশ আসে। কিন্তু রাবেয়া তখন নিঃশেষ। দুই শিশু জানে না, তাদের সকালটা পৃথিবী পাল্টে দেবে।
জাহাঙ্গীর আলমকে আটক করা হয়। প্রথমে অভিযোগ আনা হয় ফার্স্ট-ডিগ্রি মার্ডারের, পরে আদালতে তিনি দোষ স্বীকার করেন—দ্বিতীয়-ডিগ্রি মার্ডারে (মামলার নম্বর: Ontario Superior Court, R. v. Alam, 2017 ONSC 3482)। ২০১৭ সালের ২৬ মে, আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।
ডেইরি রোডের সেই পার্কিং লট আজও আছে। গাড়ি দাঁড়ায়, মানুষ আসে-যায়। সেই স্তব্ধ ভোর, আর দুই শিশুর অপূর্ণ প্রশ্ন—আজও বাতাসে ভেসে বেড়ায়।




মন্তব্য করুন