সকাল থেকে উত্তেজনার ঘনঘটা। রোদ ঝলমলে আকাশের নিচে উখিয়া-টেকনাফ মহাসড়ক জুড়ে জমে উঠছে চাকরি হারানো শিক্ষকদের বিক্ষোভ। দাবির মুখে ক্লান্ত শিক্ষকরা দাঁড়িয়ে আছেন, আবারও আশঙ্কা ভর করছে—আজকের আন্দোলন হয়তো ছত্রভঙ্গ হবে। কারণ, পুলিশ, ও সেনাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত। স্থানীয়দের সাথে বাকবিতণ্ডা, সাংবাদিকদের সাথে উত্তেজনা, প্রশাসনের সাথে সংঘর্ষের সম্ভাবনা—সবকিছু যেন চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।
ঠিক সেই সময়, মানুষের ভিড়ের ভেতর থেকে এগিয়ে আসেন এক তরুণী। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে, চোখে দৃঢ়তা, হাতে কেবল সাহসের শক্তি—তিনি জিনিয়া শারমিন রিয়া। দিনের শুরু থেকেই তিনি ছুটে বেড়াচ্ছেন আন্দোলনের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। কখনো শিক্ষকদের পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, কখনো সাংবাদিকদের সাথে ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে দিচ্ছেন, কখনো পুলিশের সাথে উত্তেজনা প্রশমিত করছেন। এককভাবে তিনি যেন আন্দোলনের ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন।
সারাদিন রোদে পুড়ে যাওয়ার পরও তার মুখে ক্লান্তি নেই। বরং প্রতিটি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, তিনি যেন নিজেকে নয়—একটি বৃহত্তর সমাজকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। স্থানীয়রা যখন ভয়ে একপাশে সরে যাচ্ছিল, তখন জিনিয়া একাই এগিয়ে গেলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখে চোখ রেখে। তাদের কঠিন দৃষ্টি, গ্রেফতারের হুমকি, আন্দোলন ভাঙার প্রচেষ্টা—কোনো কিছুই তার সাহসকে নড়াতে পারেনি।
এমন সাহসী অবস্থানের পেছনে কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ ছিল না। কোনো দলীয় পরিচয় নয়, কোনো লোভ নয়—শুধু উখিয়া-টেকনাফের চাকরি হারানো মানুষগুলোর প্রতি দায়বদ্ধতা। তার কণ্ঠে ভেসে আসছিল, “আমি আছি সত্যের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে, আপনাদের পাশে। ভুল করলে ধরিয়ে দিন, অপরাধ করলে জবাবদিহিতা নিন—কিন্তু লড়াই থেকে সরানো যাবে না।”
চকরিয়ায় বৃত্তি পরীক্ষার নামে রমরমা বাণিজ্য, প্রতারনার শিকার শিক্ষার্থীরা, ১৪৫ বিদ্যালয়ে জরুরি নোটিশ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই তাকে নিয়ে ট্রল হয়, সমালোচনা হয়। কিন্তু রাজপথের বাস্তবতা অন্য কথা বলে। ৫ আগস্টের আগেই যখন রাজনীতির বড় নেতারা আলোচনায় ব্যস্ত ছিলেন, তখন কক্সবাজারের কালুরদোকান ও বাস টার্মিনালে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আগুন হাতে দাঁড়িয়েছিলেন এই তরুণী। আজও সেই ধারাবাহিকতায় তিনি দেখালেন—সাহস কাকে বলে।
বিকেলের দিকে আন্দোলন যখন স্থগিতের ঘোষণা আসে, তখনও শিক্ষকদের ভিড়ের ভেতর দেখা যায় তাকে। রোদে পোড়া মুখ, ক্লান্ত চোখ, কিন্তু দৃষ্টি তখনও অটল। উখিয়ার মানুষ বলছিল, “আমাদের একজন জিনিয়া আছে, তাই আমরা হারব না।”
আজকের দিনটি কেবল একটি আন্দোলনের দিন নয়। আজ ইতিহাস দেখেছে কিভাবে একজন তরুণী—অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ আর আত্মত্যাগ দিয়ে রাজপথে একক নেতৃত্ব দিয়েছেন। জুলাই আন্দোলনের সম্মুখযোদ্ধা জিনিয়া শারমিন রিয়া আজ কেবল একজন মানুষ নন, তিনি সাহসের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।




মন্তব্য করুন
পাঠকদের মন্তব্য (1)
আমাদের একজন জিনিয়া আছে।আমাদের ভয় নাই।