হোম ট্রেন্ডিং লাইভ অনুসন্ধান মেনু
প্রতি মুর্হুতের কক্সবাজারকে জানুন
🔔 নোটিফিকেশন সাবস্ক্রিপশন ×
🔔

নতুন খবর সবার আগে আপনার ফোনে পান!

ডাবলিনের আকাশে নীল রেখা – DesheBideshe

প্রতিবেদকের নাম:

প্রতিবেদকের নাম:

বুধবার, ২০ আগস্ট ২০২৫, ০৯:১২ অপরাহ্ন


আয়েশা আক্তারের কল্পিত ছবি

ডাবলিন। জর্জিয়ান ইমারতে নীরব ইতিহাস, পানশালায় গল্প, গির্জার ঘণ্টায় এক দীর্ঘশ্বাস, আর রাস্তাঘাটে পাঁচ মহাদেশের মুখ। এই শহরের বাতাসে মেশে সমুদ্রতীরের সগর্ব বিস্তৃতি, পুরোনো পথের ক্লান্তি, এবং আধুনিকতার ক্ষণিক তীব্রতা। গ্রীষ্মের সূর্য যখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে পশ্চিমে নেমে যায়, আকাশে আঁকা পড়ে মৃদু নীল রেখা; শহর তখন ধীরে ধীরে রাতের ভেতরে ঢুকে পড়ে—কিন্তু কোথাও কোনো জানালার আড়ালে, অদৃশ্য এক থমথমে অন্ধকার প্রতীক্ষা করে থাকে।

এই শহরেই, কোনো এক নির্মোহ সকালে, শেষ হয়ে গিয়েছিল এক নারীর জীবন। জন্ম দক্ষিণের এক নদীপ্রবাহের দেশে; নতুন স্বপ্নে ভর করে ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে আয়েশা আক্তার বাংলাদেশ থেকে আয়ারল্যান্ডে এসে পৌঁছান—স্টুডেন্ট ভিসায়, উদ্দেশ্য উচ্চতর পড়াশোনা ও নিজের জীবনের মানোন্নয়ন। প্রথমে ডাবলিনের ক্লোনসিলা (Clonsilla) এলাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় থাকেন; পরে পার্টটাইম কাজ শুরু হলে নিজেই ভাড়া বাসা নেন। শহরটাকে তিনি চিনতে শেখেন লিফি (River Liffey) নদীর ধারে হাঁটতে হাঁটতে, ভাষা কোর্সের শ্রেণিকক্ষে, সপ্তাহান্তের সস্তা বাজারে।

২০১৭ সালের জুন—ডাবলিনের “Spice of India” রেস্তোরাঁয় আয়েশা তখন ওয়েট্রেস। নিয়মিত এক গ্রাহক, ডেভিড ব্রায়ান, তার দিকে নজর দেন। জুলাই থেকে ডিসেম্বর—ফুল, ছোটখাটো উপহার, কয়েকটি রোমান্টিক ডেট; শুরুতে ডেভিড নাকি বাংলা শেখার চেষ্টা করতেন, ইসলামি সংস্কৃতির প্রতিও আগ্রহ দেখিয়েছিলেন—বন্ধুরা পরে বলেছিলেন, “ও খুব মন দিয়ে শুনত।” ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ডেভিডের প্রস্তাবে আয়েশা উঠে যান ডেভিডের ব্যালিগ্যাল্গান (Ballygalgan) বাসায়।

আরও পড়ুন

কক্সবাজারে সদর থানা পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার ৩২

২০১৯ সালের মার্চে জন্ম নেয় এক পুত্রসন্তান। নাম রাখা হয় জ্যাক। পরিবারের একাংশ বিয়ের আগেই সন্তান আসায় অখুশি হন। আয়েশা এক অদ্ভুত চাপের ভেতর দিয়ে যান। অবশেষে দুই ধাপে বিয়ে হয় তাদের—প্রথমে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ডাবলিন সিভিল রেজিস্ট্রি অফিসে (Civil Registry Office) আইরিশ সিভিল ম্যারেজ; পরে ঢাকায় পরিবারের উপস্থিতিতে ইসলামি বিয়ে; যদিও ডেভিড ইসলামি রীতিতে অংশ নেননি।

শুরুটা ছিল মৃদু; দুপুরের রোদে কফিশপ, রবিবারের মার্কেট, ছোটখাটো হাসিমুখ। কিন্তু হাসির আড়ালেই জমতে থাকে অদৃশ্য পাথর—নিয়ন্ত্রণ, ঈর্ষা, সন্দেহ, এবং ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসা এক নারীর পৃথিবী। রান্নাঘরের আলমারিতে পবিত্র কোরআন, দুপুরে নিঃশব্দে নামাজ, উৎসবে শাড়ির কোমল বুনন—নিজের চিহ্নটুকু বাঁচিয়ে রাখতে চাইতেন আয়েশা।

অন্যদিকে ডেভিড চাইত পরিচয়ের একরঙা দেয়াল—“এখানে ঐসবের দরকার নেই”—সংক্ষিপ্ত তিরস্কার, দীর্ঘশ্বাসের রূঢ় ইশারা। খাবার নিয়েও রূঢ়তা—বাংলা রান্নাকে হেয় করা, একাধিকবার শুয়োরের মাংস খেতে বাধ্য করার চাপ। ২০২০ সালের রমজানে আয়েশা রোজা রাখলে—পানি খাওয়ানোর জোরাজুরি।

২০২১-এর অক্টোবরের দশ তারিখ। শরতের ভোরে শহর তখনও পুরোটা জাগেনি। ডাবলিনের আকাশে হিমের আভাস। শহর থেকে একটু দূরের এক বাড়িতে, ডেভিড খাটের পাশে দাঁড়িয়ে—জানালার কপাট টেনে দেওয়া, কার্পেট টান টান; বেডসাইড টেবিলে সাদা বালিশ, ড্রয়ারে গুঁজে রাখা টেপ আর সরু নাইলনের দড়ি। ভেতরে ঘন, পুরু নীরবতা—যেন কোনো শিকারি প্রাণী; ধীরে এগোয়, হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে—তারপর শব্দ থেমে যায়।

আয়েশা ঘুমিয়ে ছিলেন নিজের শোবার ঘরেই। ভোরের ঝাপসা আলোতে খুব কাছে থেকে অনুভব করেন উষ্ণ নিঃশ্বাস—তারপর বরফ-ঠান্ডা কণ্ঠ: “আজ তোমার শেষ দিন।” বিশ্বাস করতে পারেন না; গলা শুকিয়ে যায়, শব্দ বেরোয় না।

ডেভিড দু’কাঁধ চেপে তাকে পাশ ফিরিয়ে ফেলেছে। এক মুঠো কাপড় ঠেলে দেয় মুখে—শব্দ আটকে যায়; পিঠের দিকে হাত দু’টি টেনে শক্ত করে বেঁধে ফেলে। বালিশটি সোজা মুখ–নাক জুড়ে বসে; একই সঙ্গে গলায় সরু রশির টান—প্রথমে আঁট, তারপর আরও কষে, আরও। চিৎকার কোথাও পৌঁছায় না। সাদা চাদরটা নিঃশব্দে শোকের কক্ষে রূপ নেয়; দেয়ালগুলো কেবল দাঁড়িয়ে থাকে—সাক্ষী হতে পারে না।

ডেভিড থামে না। জরুরি নম্বরে কল নয়—বরং ফোন আনলক, বার্তাগুলো মুছে ফেলা, কল–লগ সাফ, বাড়ির ছোট ক্যামেরার মেমোরি কার্ড খুলে নেওয়া—ঠান্ডা মাথায় চিহ্ন মুছির কাজ। বাইরে তখন ধীরে ধীরে সকাল নামছে।

ফরেনসিক দল খাট, বালিশের কভার, নরম কাপড় আর ফ্লোর–রাগ থেকে নমুনা তোলে। ময়নাতদন্ত জানায়—শ্বাসরোধজনিত মৃত্যু (asphyxia): নাক–মুখের ভেতরে নরম তন্তুর ক্ষুদ্র চিহ্ন, চোখের পাতায় পিটিকিয়া (petechiae), গলায় সরু বৃত্তাকার দাগ—সব মিলিয়ে বালিশ দিয়ে মুখ–নাক চেপে ধরা ও লিগেচার (ligature)–এর সংকোচন–চাপের লক্ষণ। কোনো পোড়ার দাগ নেই, কোনো দুর্ঘটনাজনিত পড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত নেই। ডিজিটাল টিম পরে ডেভিডের ডিভাইস থেকে উদ্ধার করে সাম্প্রতিক অনুসন্ধান: “চিহ্ন না রেখে শ্বাসরোধ”, “অচেতন হওয়ার আগে শরীরের প্রতিক্রিয়া”—শীতল প্রশ্ন, যেগুলো টাইপ করার মুহূর্তেই কলুষিত হয়ে যায়। বাড়ির রাউটার–লগ, ক্যামেরার অপসারিত মেমোরি কার্ড, আর ফোনের মুছে–ফেলা বার্তার ‘রেসিডুয়াল’ ডেটাও তদন্তে জুড়তে থাকে—একটি সুপরিকল্পিত নীরবতার নকশা হিসেবে। প্রতিবেশীদের সাক্ষ্যে উঠে আসে আগের রাতের তর্ক, দরজার বাইরে কান্না; আর পুলিশ ফাইলে দেখা যায়—পূর্বের সেই অভিযোগপত্র, দু’দিনের মাথায় গুটিয়ে নেওয়া কাগজ।

আয়েশার দেহ সিটি মর্গে রাখা হয়—ফরেনসিক পরীক্ষা শেষে দাফন নিয়ে টানাপোড়েন। আয়েশার পরিবার চান লাশ দেশে নেওয়া হোক; ডেভিডের পরিবার আইরিশ কোর্টে আপত্তি তোলে—বীমা অর্থ–নিয়ে বিবাদও ছায়া ফেলে। শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালের ডিসেম্বর—ডাবলিনের মুসলিম গোরস্থান নিউল্যান্ডস ক্রস সিমেট্রি (Newlands Cross Cemetery)–তেই আয়েশার দাফন সম্পন্ন হয়; জানাজায় ৩০০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি–আইরিশ মানুষ অংশ নেন।

কোর্টের করিডোরে কাগজের গন্ধ, আইনজীবীদের স্থির কণ্ঠ, মাঝেমধ্যে চাপা গুঞ্জন। ডেভিডের আইনজীবীর যুক্তি—“এটি সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব; দুই ভিন্ন জগতের সংঘর্ষ।” রাষ্ট্রপক্ষের কণ্ঠে সংযত ধাতু—“পার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু যে প্রস্তুতি, যে সময়সাপেক্ষ নিষ্ঠুরতা, যে শ্বাসরোধের চিহ্ন—এগুলো কোনো ‘দ্বন্দ্ব’ নয়; এগুলো নিয়ন্ত্রণ ও রোষের দলিল।”

প্রমাণে উঠে এল আরেকটি স্তর—সিভিল ম্যারেজের দিন রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে “ভুল অনুবাদ”–এর সুযোগে ডেভিড দাবি করেছিল, আয়েশা নাকি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছেন; আদালত পরে এটিকে সোজাসাপ্টা জালিয়াতি বলে সাব্যস্ত করে।

বিচারকের মন্তব্য ছিল নির্দিষ্ট—“এটি কোনো ‘সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব’ নয়; এটি পরিকল্পিত, নিয়ন্ত্রণনির্ভর অপরাধ। বিবাহে পার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু তাই বলে কারও মুখ বেঁধে শ্বাসরোধ করা যায় না, গলায় ফাঁস লাগানো যায় না। এখানে ‘অস্ত্র’ ছিল বালিশ ও লিগেচার—যা শাস্তি ও হেনস্থার উন্মত্ত মানসিকতা প্রকাশ করে।” রায় ঘোষিত—ডেভিড দোষী; শাস্তি—যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

হত্যার পরপরই জ্যাককে নিয়ে নেয় আইরিশ চাইল্ড প্রোটেকশন এজেন্সি—টুসলা (TUSLA)। ২০২২ সালে ঢাকায় থাকা আয়েশার ভাই ইমরান হোসেন অভিভাবকত্বের জন্য আদালতে আবেদন করেন। ডেভিডের মা প্যাট্রিসিয়া পাল্টা দাবি তোলেন—“জ্যাকের খ্রিস্টান পরিচয়ের সুরক্ষা দরকার।” ২০২৪ সালে টুসলা জ্যাককে এক বাংলাদেশি–আইরিশ দম্পতির কাছে ফস্টার কেয়ারে রাখার সিদ্ধান্ত জানায়।


coxsbazarpost

coxsbazarpost

কক্সবাজারের স্থানীয় সাংবাদিকতা ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের বিশ্বস্ত লেখক।

সত্যতা যাচাই: এই সংবাদটি সম্পাদকীয় নীতি অনুসরণ করে বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

সংবাদ কিউআর কোড

নিচের QR কোডটি স্ক্যান করে যেকোনো মোবাইলে সংবাদটি সরাসরি ওপেন করুন।

ফটোকার্ড স্টুডিও

২য় লীড নিউজ
Card Image

ডাবলিনের আকাশে নীল রেখা – DesheBideshe

www.coxsbazarposts.com সত্যের সন্ধানে অনুক্ষণ

প্রিন্ট প্রিভিউ

Logo www.coxsbazarposts.com

ডাবলিনের আকাশে নীল রেখা – DesheBideshe

প্রতিবেদক: প্রতিবেদকের নাম: | প্রকাশিত: বুধবার, ২০ আগস্ট ২০২৫, ০৯:১২ অপরাহ্ন
Print Image
[ad_1] আয়েশা আক্তারের কল্পিত ছবিডাবলিন। জর্জিয়ান ইমারতে নীরব ইতিহাস, পানশালায় গল্প, গির্জার ঘণ্টায় এক দীর্ঘশ্বাস, আর রাস্তাঘাটে পাঁচ মহাদেশের মুখ। এই শহরের বাতাসে মেশে সমুদ্রতীরের সগর্ব বিস্তৃতি, পুরোনো পথের ক্লান্তি, এবং আধুনিকতার ক্ষণিক তীব্রতা। গ্রীষ্মের সূর্য যখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে পশ্চিমে নেমে যায়, আকাশে আঁকা পড়ে মৃদু নীল রেখা; শহর তখন ধীরে ধীরে রাতের ভেতরে ঢুকে পড়ে—কিন্তু কোথাও কোনো জানালার আড়ালে, অদৃশ্য এক থমথমে অন্ধকার প্রতীক্ষা করে থাকে।এই শহরেই, কোনো এক নির্মোহ সকালে, শেষ হয়ে গিয়েছিল এক নারীর জীবন। জন্ম দক্ষিণের এক নদীপ্রবাহের দেশে; নতুন স্বপ্নে ভর করে ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে আয়েশা আক্তার বাংলাদেশ থেকে আয়ারল্যান্ডে এসে পৌঁছান—স্টুডেন্ট ভিসায়, উদ্দেশ্য উচ্চতর পড়াশোনা ও নিজের জীবনের মানোন্নয়ন। প্রথমে ডাবলিনের ক্লোনসিলা (Clonsilla) এলাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় থাকেন; পরে পার্টটাইম কাজ শুরু হলে নিজেই ভাড়া বাসা নেন। শহরটাকে তিনি চিনতে শেখেন লিফি (River Liffey) নদীর ধারে হাঁটতে হাঁটতে, ভাষা কোর্সের শ্রেণিকক্ষে, সপ্তাহান্তের সস্তা বাজারে।২০১৭ সালের জুন—ডাবলিনের “Spice of India” রেস্তোরাঁয় আয়েশা তখন ওয়েট্রেস। নিয়মিত এক গ্রাহক, ডেভিড ব্রায়ান, তার দিকে নজর দেন। জুলাই থেকে ডিসেম্বর—ফুল, ছোটখাটো উপহার, কয়েকটি রোমান্টিক ডেট; শুরুতে ডেভিড নাকি বাংলা শেখার চেষ্টা করতেন, ইসলামি সংস্কৃতির প্রতিও আগ্রহ দেখিয়েছিলেন—বন্ধুরা পরে বলেছিলেন, “ও খুব মন দিয়ে শুনত।” ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ডেভিডের প্রস্তাবে আয়েশা উঠে যান ডেভিডের ব্যালিগ্যাল্গান (Ballygalgan) বাসায়।২০১৯ সালের মার্চে জন্ম নেয় এক পুত্রসন্তান। নাম রাখা হয় জ্যাক। পরিবারের একাংশ বিয়ের আগেই সন্তান আসায় অখুশি হন। আয়েশা এক অদ্ভুত চাপের ভেতর দিয়ে যান। অবশেষে দুই ধাপে বিয়ে হয় তাদের—প্রথমে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ডাবলিন সিভিল রেজিস্ট্রি অফিসে (Civil Registry Office) আইরিশ সিভিল ম্যারেজ; পরে ঢাকায় পরিবারের উপস্থিতিতে ইসলামি বিয়ে; যদিও ডেভিড ইসলামি রীতিতে অংশ নেননি।শুরুটা ছিল মৃদু; দুপুরের রোদে কফিশপ, রবিবারের মার্কেট, ছোটখাটো হাসিমুখ। কিন্তু হাসির আড়ালেই জমতে থাকে অদৃশ্য পাথর—নিয়ন্ত্রণ, ঈর্ষা, সন্দেহ, এবং ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসা এক নারীর পৃথিবী। রান্নাঘরের আলমারিতে পবিত্র কোরআন, দুপুরে নিঃশব্দে নামাজ, উৎসবে শাড়ির কোমল বুনন—নিজের চিহ্নটুকু বাঁচিয়ে রাখতে চাইতেন আয়েশা।অন্যদিকে ডেভিড চাইত পরিচয়ের একরঙা দেয়াল—“এখানে ঐসবের দরকার নেই”—সংক্ষিপ্ত তিরস্কার, দীর্ঘশ্বাসের রূঢ় ইশারা। খাবার নিয়েও রূঢ়তা—বাংলা রান্নাকে হেয় করা, একাধিকবার শুয়োরের মাংস খেতে বাধ্য করার চাপ। ২০২০ সালের রমজানে আয়েশা রোজা রাখলে—পানি খাওয়ানোর জোরাজুরি।২০২১-এর অক্টোবরের দশ তারিখ। শরতের ভোরে শহর তখনও পুরোটা জাগেনি। ডাবলিনের আকাশে হিমের আভাস। শহর থেকে একটু দূরের এক বাড়িতে, ডেভিড খাটের পাশে দাঁড়িয়ে—জানালার কপাট টেনে দেওয়া, কার্পেট টান টান; বেডসাইড টেবিলে সাদা বালিশ, ড্রয়ারে গুঁজে রাখা টেপ আর সরু নাইলনের দড়ি। ভেতরে ঘন, পুরু নীরবতা—যেন কোনো শিকারি প্রাণী; ধীরে এগোয়, হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে—তারপর শব্দ থেমে যায়।আয়েশা ঘুমিয়ে ছিলেন নিজের শোবার ঘরেই। ভোরের ঝাপসা আলোতে খুব কাছে থেকে অনুভব করেন উষ্ণ নিঃশ্বাস—তারপর বরফ-ঠান্ডা কণ্ঠ: “আজ তোমার শেষ দিন।” বিশ্বাস করতে পারেন না; গলা শুকিয়ে যায়, শব্দ বেরোয় না।ডেভিড দু’কাঁধ চেপে তাকে পাশ ফিরিয়ে ফেলেছে। এক মুঠো কাপড় ঠেলে দেয় মুখে—শব্দ আটকে যায়; পিঠের দিকে হাত দু’টি টেনে শক্ত করে বেঁধে ফেলে। বালিশটি সোজা মুখ–নাক জুড়ে বসে; একই সঙ্গে গলায় সরু রশির টান—প্রথমে আঁট, তারপর আরও কষে, আরও। চিৎকার কোথাও পৌঁছায় না। সাদা চাদরটা নিঃশব্দে শোকের কক্ষে রূপ নেয়; দেয়ালগুলো কেবল দাঁড়িয়ে থাকে—সাক্ষী হতে পারে না।ডেভিড থামে না। জরুরি নম্বরে কল নয়—বরং ফোন আনলক, বার্তাগুলো মুছে ফেলা, কল–লগ সাফ, বাড়ির ছোট ক্যামেরার মেমোরি কার্ড খুলে নেওয়া—ঠান্ডা মাথায় চিহ্ন মুছির কাজ। বাইরে তখন ধীরে ধীরে সকাল নামছে।ফরেনসিক দল খাট, বালিশের কভার, নরম কাপড় আর ফ্লোর–রাগ থেকে নমুনা তোলে। ময়নাতদন্ত জানায়—শ্বাসরোধজনিত মৃত্যু (asphyxia): নাক–মুখের ভেতরে নরম তন্তুর ক্ষুদ্র চিহ্ন, চোখের পাতায় পিটিকিয়া (petechiae), গলায় সরু বৃত্তাকার দাগ—সব মিলিয়ে বালিশ দিয়ে মুখ–নাক চেপে ধরা ও লিগেচার (ligature)–এর সংকোচন–চাপের লক্ষণ। কোনো পোড়ার দাগ নেই, কোনো দুর্ঘটনাজনিত পড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত নেই। ডিজিটাল টিম পরে ডেভিডের ডিভাইস থেকে উদ্ধার করে সাম্প্রতিক অনুসন্ধান: “চিহ্ন না রেখে শ্বাসরোধ”, “অচেতন হওয়ার আগে শরীরের প্রতিক্রিয়া”—শীতল প্রশ্ন, যেগুলো টাইপ করার মুহূর্তেই কলুষিত হয়ে যায়। বাড়ির রাউটার–লগ, ক্যামেরার অপসারিত মেমোরি কার্ড, আর ফোনের মুছে–ফেলা বার্তার ‘রেসিডুয়াল’ ডেটাও তদন্তে জুড়তে থাকে—একটি সুপরিকল্পিত নীরবতার নকশা হিসেবে। প্রতিবেশীদের সাক্ষ্যে উঠে আসে আগের রাতের তর্ক, দরজার বাইরে কান্না; আর পুলিশ ফাইলে দেখা যায়—পূর্বের সেই অভিযোগপত্র, দু’দিনের মাথায় গুটিয়ে নেওয়া কাগজ।আয়েশার দেহ সিটি মর্গে রাখা হয়—ফরেনসিক পরীক্ষা শেষে দাফন নিয়ে টানাপোড়েন। আয়েশার পরিবার চান লাশ দেশে নেওয়া হোক; ডেভিডের পরিবার আইরিশ কোর্টে আপত্তি তোলে—বীমা অর্থ–নিয়ে বিবাদও ছায়া ফেলে। শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালের ডিসেম্বর—ডাবলিনের মুসলিম গোরস্থান নিউল্যান্ডস ক্রস সিমেট্রি (Newlands Cross Cemetery)–তেই আয়েশার দাফন সম্পন্ন হয়; জানাজায় ৩০০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি–আইরিশ মানুষ অংশ নেন।কোর্টের করিডোরে কাগজের গন্ধ, আইনজীবীদের স্থির কণ্ঠ, মাঝেমধ্যে চাপা গুঞ্জন। ডেভিডের আইনজীবীর যুক্তি—“এটি সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব; দুই ভিন্ন জগতের সংঘর্ষ।” রাষ্ট্রপক্ষের কণ্ঠে সংযত ধাতু—“পার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু যে প্রস্তুতি, যে সময়সাপেক্ষ নিষ্ঠুরতা, যে শ্বাসরোধের চিহ্ন—এগুলো কোনো ‘দ্বন্দ্ব’ নয়; এগুলো নিয়ন্ত্রণ ও রোষের দলিল।”প্রমাণে উঠে এল আরেকটি স্তর—সিভিল ম্যারেজের দিন রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে “ভুল অনুবাদ”–এর সুযোগে ডেভিড দাবি করেছিল, আয়েশা নাকি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছেন; আদালত পরে এটিকে সোজাসাপ্টা জালিয়াতি বলে সাব্যস্ত করে।বিচারকের মন্তব্য ছিল নির্দিষ্ট—“এটি কোনো ‘সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব’ নয়; এটি পরিকল্পিত, নিয়ন্ত্রণনির্ভর অপরাধ। বিবাহে পার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু তাই বলে কারও মুখ বেঁধে শ্বাসরোধ করা যায় না, গলায় ফাঁস লাগানো যায় না। এখানে ‘অস্ত্র’ ছিল বালিশ ও লিগেচার—যা শাস্তি ও হেনস্থার উন্মত্ত মানসিকতা প্রকাশ করে।” রায় ঘোষিত—ডেভিড দোষী; শাস্তি—যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।হত্যার পরপরই জ্যাককে নিয়ে নেয় আইরিশ চাইল্ড প্রোটেকশন এজেন্সি—টুসলা (TUSLA)। ২০২২ সালে ঢাকায় থাকা আয়েশার ভাই ইমরান হোসেন অভিভাবকত্বের জন্য আদালতে আবেদন করেন। ডেভিডের মা প্যাট্রিসিয়া পাল্টা দাবি তোলেন—“জ্যাকের খ্রিস্টান পরিচয়ের সুরক্ষা দরকার।” ২০২৪ সালে টুসলা জ্যাককে এক বাংলাদেশি–আইরিশ দম্পতির কাছে ফস্টার কেয়ারে রাখার সিদ্ধান্ত জানায়। [ad_2]

ডাইরেক্ট মেসেজ

Telegram Direct Message WhatsApp Direct Message

বাংলা ফন্ট কনভার্টার (বিজয় ⇄ ইউনিকোড)

×

তথ্য

×