টরন্টোর সন্ধ্যা এখন এক ভিন্ন দৃশ্য বহন করে। রাস্তার বাতির নিচে সারি সারি সাইকেল ও স্কুটার ছুটে চলে। তাদের পিঠে ঝুলে থাকে কালো, কমলা বা লাল রঙের থার্মাল ব্যাগ। এই ব্যাগগুলো শহরের গৃহস্থালির সঙ্গে এক অদ্ভুত সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। অফিস শেষে ক্লান্ত মানুষ, একা থাকা ছাত্রছাত্রী কিংবা বৃদ্ধ দম্পতিরা প্রতিদিন এই খাবার সরবরাহকারীদের অপেক্ষায় থাকেন।
গিগ ইকোনমি (freelance/on-demand) অর্থ এমন এক কর্মব্যবস্থা যেখানে মানুষ স্থায়ী চাকরির বদলে স্বাধীনভাবে স্বল্পমেয়াদি বা চুক্তিভিত্তিক কাজ করে আয় করে। গিগ ইকোনমির এই খাত এখন শুধু সুবিধা নয়, নতুন অভিবাসীদের জন্য হয়ে উঠেছে টিকে থাকার অবলম্বন। ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, ডিগ্রির স্বীকৃতি না পাওয়া কিংবা কানাডিয়ান কর্ম–অভিজ্ঞতার অভাবে অনেকেই এখানে খুঁজে পেয়েছেন জীবিকার প্রথম সুযোগ। তাই শহরের অর্থনীতি এবং অভিবাসী জীবনের মানচিত্রে এই ডেলিভারি ব্যাগগুলো এক অর্থে পরিশ্রম, স্থিতিশীলতা ও আশার প্রতীক।
কিন্তু এই আশার ভেতরেই প্রবেশ করেছে ভয় এবং অবিশ্বাসের ছায়া। সাম্প্রতিক সময়ে খাবার সরবরাহের পরিচয়ে সংঘটিত যৌন হয়রানির একাধিক ঘটনা শহরের মানুষের নিরাপত্তাবোধে গভীর আঘাত করেছে। আবাসিক ভবনের এলিভেটর বা লবিতে এমন ঘটনার পর অনেক বাসিন্দা এখন ডেলিভারি চালকদের সন্দেহের চোখে দেখেন। দরজার বেল বাজলে কেউ লবিতে নামতে ভয় পান, কেউ আবার সম্পূর্ণরূপে “নো কন্ট্যাক্ট ড্রপ” পদ্ধতি বেছে নিচ্ছেন। এক অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হচ্ছে ডেলিভারি কর্মী ও গ্রাহকের মাঝে।
ইনানীতে নিয়ন্ত্রণহীন গ্যাসের আগুন ঘিরে আতঙ্ক, বিদ্যুৎহীন ৩ হাজার ৮০০ পরিবার
গত ১৫ অক্টোবর ২০২৫ টরন্টোর পেপ অ্যাভিনিউ ও ড্যানফর্থ অ্যাভিনিউ এলাকার এক নারী খাবার অর্ডার করেছিলেন। দরজার বেল বাজলে তিনি নিচে নেমে আসেন অর্ডার নিতে। পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, খাবার পৌঁছে দিতে এসে ডেলিভারি চালক আনোয়ার মিয়া (৪৯) সেই নারীকে যৌন নিপীড়ন করেন।
পুলিশ পরে তাকে গ্রেপ্তার করে এবং যৌন নিপীড়নের অভিযোগে আদালতে হাজির করে। অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি, তবে ঘটনাটি শহরজুড়ে এক গভীর প্রশ্ন তুলেছে: “আমাদের দরজায় যে আসে, সে আসলেই কতটা নিরাপদ?”

গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ থেকে নতুন আগত এক রিফিউজি আবেদনকারী এজাজ আহমেদ বাবলু (৩৫) একই ধরনের অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন।
এর কয়েক মাস আগে (১১ মে ২০২৪) টরন্টোর বার্চমাউন্ট ও ড্যানফোর্থ এলাকার বার্চমাউন্ট কমিউনিটি সেন্টার পুলে আরেকটি যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানায়, জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত সাঁতারের সময় (public swim session) আব্দুল করিম (৩৪) নামে এক ব্যক্তি দুই কিশোরীর কাছে গিয়ে তাদের যৌন নিপীড়ন করেন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে।

এমডি আব্দুল করিম (৩৪) একজন বাংলাদেশি রিফুউজি আবেদনকারী। তার বিরুদ্ধে দুটি যৌন নিপীড়ন ও দুটি যৌন হস্তক্ষেপের অভিযোগ আনা হয়েছে। এই ঘটনাটি শহরে ক্রমবর্ধমান যৌন হয়রানির প্রবণতাকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে এবং কমিউনিটি পুলসহ জনসমাগমস্থলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, টরন্টো শহরের প্রায় সব ভবনেই সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা আছে, এমনকি এলিভেটরেও নিরাপত্তা ক্যামেরা সচল থাকে। পুলিশ জানিয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে প্রমাণ ছাড়া গ্রেপ্তার করা হয় না এবং প্রতিটি মামলাই দৃশ্যমান প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করা হয়।
এদিকে, নবাগতদের একটি অংশের বিরুদ্ধে টিটিসি (Toronto Transit Commission)-এর নিয়ম ভঙ্গের ঘটনাও ক্রমে বাড়ছে। অনেকে ভাড়া না দিয়ে সংরক্ষিত প্রবেশপথ দিয়ে সাবওয়েতে ঢুকে পড়েন, আবার কেউ কেউ বাস বা স্ট্রিটকারের পেছনের দরজা দিয়ে বিনা টিকিটে যাত্রা করেন। এসব কর্মকাণ্ড সাবওয়ের সিসিটিভি ক্যামেরায় নিয়মিত ধরা পড়ছে, এবং বাসচালকরাও ভাড়া না দিয়ে ওঠা যাত্রীদের শনাক্ত করতে পারছেন।
অভিজ্ঞ ইমিগ্রেশন আইনজীবীরা সতর্ক করে বলেছেন, এসব অভিযোগ যদি আদালতে প্রমাণিত হয়, তাহলে অভিযুক্তরা স্থায়ী বসবাসের অযোগ্য বিবেচিত হতে পারেন। এমন নজির অন্য আবেদনকারীদের মূল্যায়ন প্রক্রিয়াতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এসব ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় অনেক আবাসিক ভবনে ফুড ডেলিভারি কর্মীদের প্রবেশে নতুন নিয়ম চালু হয়েছে। এখন ডেলিভারিম্যানরা লবিতে খাবারের প্যাকেট রাখেন। ভবনের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি আর নেই।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, টরন্টোয় বর্তমানে প্রায় ৬০ হাজার ফুড ডেলিভারি কর্মী কাজ করছেন, যাদের অধিকাংশই দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত।#
যৌন হয়রানির মামলার পাশাপাশি টরন্টোর রাস্তায় ফুড ডেলিভারি কর্মীদের একটি অংশের বিরুদ্ধে অবৈধ সিগারেট বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।
ড্যানফর্থের বাংলা টাউন এলাকায় গত কয়েক মাসে কর্তৃপক্ষ একাধিকবার অভিযান চালিয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, কিছু চালক বাইকের পেছনে ঝুলানো থার্মাল ব্যাগে খাবারের বদলে ট্যাক্স ফ্রি সিগারেট বহন করেন। এই সিগারেটগুলো আদিবাসী রিজার্ভের জন্য তৈরি হলেও শহরে বিক্রি করা আইনত নিষিদ্ধ।
স্থানীয় এক ব্যবসায়ী জানান, “বিকেল হতেই এদের আনাগোনা বেড়ে যায়। ডেলিভারি ব্যাগের ভেতর থাকে সিগারেটের প্যাকেট। এদের কারণে এলাকার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
টরন্টো পুলিশ জানিয়েছে, তারা ফুড ডেলিভারি ছদ্মবেশে অবৈধ পণ্যের পরিবহন নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে।
উবার ইটস, ডোরড্যাশ ও স্কিপদ্যডিশেস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা যৌন হয়রানি বা সহিংসতার ঘটনায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে এবং পুলিশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।

অনেক ডেলিভারি কর্মী জানাচ্ছেন, তাদের আয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে ধস নেমেছে। টিপস পাওয়া কমে গেছে, এবং অনেক সময় গ্রাহক তাদের দিকে না তাকিয়েই খাবার গ্রহণ করেন।
টরন্টো নগরী গিগ ইকোনমির অন্যতম কেন্দ্র। প্রতিদিন হাজারো মানুষ খাবার, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করছেন এই শহরের প্রাণচক্রে। কিন্তু যখন সেই পেশার আড়ালে অপরাধ সংগঠিত হয়, তখন আঘাত লাগে সমাজের মূল আস্থায়।
কিছু ব্যক্তির অপরাধ আজ পুরো পেশার মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যৌন হয়রানির অভিযোগ, অবৈধ সিগারেট বাণিজ্য এবং নৈতিক অবক্ষয়ের এই ধারাবাহিকতা কেবল আইন প্রয়োগের বিষয় নয়; এটি আমাদের সামষ্টিক দায়িত্ববোধ, সামাজিক নীতি ও মানবিক মূল্যবোধেরও এক কঠিন পরীক্ষা।
এই পেশাকে ঘিরে যত বিতর্কই তৈরি হোক না কেন, ভুলে গেলে চলবে না যে প্রতিদিন এই শহরের রাস্তায় ছুটে চলা হাজারো ডেলিভারি কর্মীই নাগরিক জীবনের সুবিধা নিশ্চিত করছেন। আর প্রতিটি থার্মাল ব্যাগের ভেতরে শুধু খাবার থাকে না; সেখানে থাকে একেকজন মানুষের জীবিকা, তার পরিশ্রম, তার স্বপ্ন এবং বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম।
এখন সময় এসেছে সেই আস্থা পুনর্গঠনের, যেখানে সৎ শ্রমিক ফিরে পাবেন তার সম্মান, আর গ্রাহক অনুভব করবেন নিরাপত্তা। এই আস্থা পুনরুদ্ধারই আজ টরন্টোর সমাজ ও অভিবাসী জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্র:
Toronto Police Service (TPS) Media Releases




মন্তব্য করুন