বিশ্বের আর্থিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানো অপরাধ আজ আর কোনো সীমান্ত মানে না। এতে অস্ত্র লাগে না, লাগে না কোনো সংঘবদ্ধ বাহিনী। একটি ল্যাপটপ, কিছু সার্ভার আর ডিজিটাল দক্ষতাই এখন যথেষ্ট একটি দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল তদন্তকারীদের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে সেই বাস্তবতারই স্পষ্ট চিত্র সামনে এসেছে।
জাহিদ হাসান। ঢাকায় বসবাসরত ২৯ বছর বয়সী এক তরুণ। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, চার বছরের বেশি সময় ধরে তিনি এমন এক ডিজিটাল জালিয়াতি কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বহু দেশের আর্থিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভিত নড়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের অভিযোগপত্র অনুযায়ী, জাহিদ হাসান পরিচালনা করতেন একাধিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যার মধ্যে ছিল TechTreek, EGiftCardStoreBD এবং idtempl.com। নাম শুনলে এগুলোকে সাধারণ প্রযুক্তি বা ডিজিটাল পরিষেবা সংক্রান্ত সাইট বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু তদন্তকারীরা বলছেন, বাস্তবে এসব সাইট ছিল অপরাধীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সুপারমার্কেট।
সিলেট নগরীতে যান চলাচলে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও ট্রাফিক পুলিশের বিশেষ নির্দেশনা
এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে বিক্রি হতো যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্ট, সামাজিক নিরাপত্তা কার্ড এবং মন্টানা অঙ্গরাজ্যের ড্রাইভিং লাইসেন্সের অত্যন্ত নিখুঁত ডিজিটাল টেমপ্লেট। এসব টেমপ্লেট এমনভাবে তৈরি ছিল যে, অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো স্বয়ংক্রিয় যাচাই ব্যবস্থাও পাশ করতে সক্ষম হতো। এর ফলেই এসব নথি ব্যবহার করে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জের প্রোফাইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভুয়া পরিচয় এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রতারণার পথ খুলে যেত।

তদন্তে উঠে এসেছে এক বিস্ময়কর তথ্য। এই উচ্চমানের জাল নথির দাম ছিল অত্যন্ত কম। যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্টের টেমপ্লেট বিক্রি হতো মাত্র ১২ ডলারে, সামাজিক নিরাপত্তা কার্ড ৯ দশমিক ৩৭ ডলারে এবং মন্টানা ড্রাইভিং লাইসেন্স ১৪ দশমিক ০৫ ডলারে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ছোট বড় অপরাধী চক্র সহজেই এসব পণ্য কিনতে পারত।
এই কৌশলের ফলেই জাহিদ হাসান চার বছরের মধ্যে এক হাজার চারশোর বেশি গ্রাহকের কাছ থেকে মোট ২ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ আয় করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। প্রায় সব লেনদেনই সম্পন্ন হতো বিটকয়েনের মাধ্যমে, যা অপরাধীদের কাছে নিরাপত্তার একটি ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করলেও শেষ পর্যন্ত সেটিই তদন্তকারীদের জন্য অন্যতম সূত্রে পরিণত হয়।

এই মামলার তদন্ত ছিল দীর্ঘ ও জটিল। এফবিআইয়ের বিলিংস বিভাগ এবং সল্ট লেক সিটি সাইবার টাস্ক ফোর্স প্রথমে ডার্ক ওয়েব ও ওপেন ওয়েবে সন্দেহজনক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ শুরু করে। বিটকয়েন লেনদেনের ব্লকচেইন বিশ্লেষণের মাধ্যমে অর্থের প্রবাহ চিহ্নিত করা হয়।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই তদন্তে ঢাকার মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের সঙ্গে সরাসরি তথ্য বিনিময় হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সহযোগিতা শুধু তদন্তে নয়, ভবিষ্যতে প্রত্যর্পণ বা আইনি সহায়তার পথও উন্মুক্ত করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধ দমনে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানা জেলা আদালতে জাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে নয় দফা অভিযোগ গঠন করা হয়। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ছয়টি ভুয়া পরিচয়পত্র হস্তান্তর, দুটি ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহার এবং একটি সামাজিক নিরাপত্তা জালিয়াতির অভিযোগ।
প্রতিটি গুরুতর অভিযোগে সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। সব অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর সম্ভাব্য সাজা তাত্ত্বিকভাবে ১২৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে বলে আইনি বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। পাশাপাশি রয়েছে বিপুল অঙ্কের জরিমানা এবং ডিজিটাল সম্পদ জব্দের বিধান।
এই ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির অপরাধকাহিনি নয়। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিক অপরাধ আর বন্দুক বা ব্যাংক ডাকাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একটি ল্যাপটপ, কিছু সার্ভার আর ডিজিটাল দক্ষতা দিয়েই আজ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং নাগরিক আস্থাকে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব।
জাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হলে, এটি হবে বিশ্বের অন্যতম বড় ‘আইডেন্টিটি অ্যাজ আ সার্ভিস’ জালিয়াতি মামলার দৃষ্টান্ত। আর যদি প্রমাণিত না হয়, তবুও এই তদন্ত ইতিমধ্যে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে গেছে। ডিজিটাল অপরাধের জন্য বিশ্বে আর কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেই।
তথ্যসূত্র:
U.S. Department of Justice
Federal Bureau of Investigation (court filings and statements)
United States District Court for the District of Montana




মন্তব্য করুন