জেরুজালেম, ২১ মে – পবিত্র মক্কার কাবা শরিফ তাওয়াফ করবেন, স্বামীর হাত ধরে হজের আনুষ্ঠানিকতা সারবেন—এই একটি স্বপ্ন বুকে নিয়ে বছরের পর বছর টাকা জমিয়েছিলেন ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার বাসিন্দা নাজিয়া আবু লেহিয়ার। ২০২৪ সালে সেই সুযোগ এসেছিল, স্বামীর সঙ্গে হজের লটারিতে নামও উঠেছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সীমান্ত বন্ধ থাকায় সেবার যাওয়া হয়নি। আর এবার? এবার সীমান্ত তো বন্ধই, পাশে হাতটি ধরার মতো সেই স্বামীও আর বেঁচে নেই। গত বছর ইসরায়েলি বোমার আঘাতে উধাও হয়ে গেছে ঘরবাড়ি, কেড়ে নিয়েছে তাঁর আজীবনের সঙ্গীকেও।
বর্তমানে দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের একটি জীর্ণ তাঁবুতে বসে আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা এএফপির (AFP) কাছে নিজের এই বুকফাটা কষ্টের কথা শুনিয়েছেন ৬৪ বছর বয়সী এই বৃদ্ধা। তাঁর এই গল্প আজ পুরো গাজাবাসীর কান্নার প্রতিচ্ছবি।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আগামী সপ্তাহে আবুধাবিতে বৈঠকে বসছে রাশিয়া ও ইউক্রেন
নিজের ভাঙা মোবাইলের স্ক্রিনে মক্কার হজের ভিডিও ফুটেজ দেখতে দেখতে চোখ মুছছিলেন নাজিয়া। এএফপিকে তিনি বলেন, “আমি এবং আমার স্বামী ২০২৪ সালের হজের জন্য নাম নিবন্ধন করেছিলাম, সিলেক্টও হয়েছিলাম। কিন্তু এর মধ্যেই যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো, সীমান্ত বন্ধ হয়ে গেলো…আমাদের আর হজে যাওয়া হলো না। ভেবেছিলাম যুদ্ধ শেষ হলে সীমান্ত খুলে দেওয়া হবে; কিন্তু গত বছর এক বোমা হামলায় আমার স্বামী শহীদ হলেন।”
নাজিয়া আরও বলেন, “হজযাত্রীদের জন্য সীমান্ত বন্ধ রাখা হয়েছে, কিন্তু কেন? হজযাত্রীরা তো শুধু তাদের ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা পালন করতে চায়। আজ এই দিনে আমাদের মক্কায় থাকার কথা ছিল।” চোখে মৃত্যুর ভয় আর বুকে আল্লাহর ওপর ভরসা নিয়ে তিনি বলেন, মাঝে মাঝে ভয় হয় স্বামীর মতো তিনিও হয়তো কোনো বোমার আঘাতে মারা যাবেন, তবু আশা ছাড়েননি। যদি আল্লাহ চান, তবে একদিন তিনি ঠিকই কাবা শরিফে যাবেন।
যুদ্ধের আগে গাজার মানুষ রাফা ক্রসিং পেরিয়ে মিসর হয়ে সৌদি আরবে হজে যেতেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পরপরই গাজাবাসীদের এই একমাত্র ‘লাইফলাইন’ বন্ধ করে দেয় ইসরায়েল।
টানা ৩ বছর পশু কোরবানি ছাড়াই কাটবে গাজার ‘নিঃশব্দ’ ঈদ
আগামী ২৭ মে গাজায় উদযাপিত হবে পবিত্র ঈদুল আজহা। কিন্তু এবারের ঈদও গাজাবাসীর জন্য কোনো আনন্দ নিয়ে আসছে না। যুদ্ধের আগে প্রতি বছর কোরবানির জন্য গাজায় ১০ থেকে ২০ হাজার গরু-উট এবং ৩০ থেকে ৪০ হাজার ভেড়া-দুম্বা আমদানি করা হতো।
কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজায় জীবন্ত পশু আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ। ফলে টানা তৃতীয় বছরের মতো এবারও কোনো পশু কোরবানি ছাড়াই ঈদ পার করতে বাধ্য হচ্ছে ফিলিস্তিনিরা।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত মাসে তারা গাজায় ৮ হাজার টন প্রক্রিয়াজাত মাংস, মুরগি, ডিম ও দুধ প্রবেশের অনুমতি দিলেও কোরবানির জন্য জীবন্ত কোনো পশু গাজায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ফলে ঈদের দিন যেখানে গাজার প্রতিটি বাড়ি উৎসবে মাতোয়ারা থাকার কথা, সেখানে এবারও শুধু ত্রাণের প্যাকেট আর বুকভরা হাহাকার নিয়ে দিন কাটবে লাখো নাজিয়ার।




মন্তব্য করুন