উখিয়া উপজেলা ভূমি অফিসে নামজারি, মিস মামলা, খাজনা আদায় ও রেকর্ড সংশোধনসহ বিভিন্ন ভূমিসেবা নিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা। তাঁদের অভিযোগ, একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালাল চক্রের যোগসাজশে নিয়মিত সেবা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলেও অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে দ্রুত কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। বিশেষ করে ভূমি অফিসের নাজির কাম ক্যাশিয়ার মো. আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে অনিয়ম, অর্থ আদায় এবং জমির রেকর্ড ও নামজারি-সংক্রান্ত কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের একাধিক অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নামজারি, মিস মামলা, খাজনা, জরিপ, মাঠ পর্চা ও রেকর্ড সংশোধনের মতো সাধারণ সেবা পেতে মাসের পর মাস ঘুরতে হচ্ছে। জমির বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও বিভিন্ন অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হচ্ছে। অন্যদিকে, নির্দিষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমে যোগাযোগ করে অতিরিক্ত অর্থ দিলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, একই জমি দুই পক্ষের নামে নামজারি, মালিকানা ও দখল না থাকা সত্ত্বেও কথিত ভুয়া দলিলের ভিত্তিতে একাধিক খতিয়ান সৃষ্টি এবং জমির প্রকৃত পরিমাণের চেয়ে বেশি জমি দেখিয়ে সৃজিত বিএস খতিয়ান তৈরির ঘটনাও অহরহ ঘটেছে উখিয়া ভূমি অফিসে। এসব ঘটনায় প্রকৃত মালিকেরা মিস মামলা করেও প্রত্যাশিত প্রতিকার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন।
স্থানীয়দের দাবি, চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল উখিয়া ভূমি অফিসে নাজির পদে মো. আলমগীর যোগদানের পর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জোরপূর্বক জমি দখল এবং জমির মালিকানা নিয়ে জটিলতা বেড়েছে। এসব ঘটনায় নাজিরের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইন্ধন থাকার অভিযোগও করেছেন তাঁরা।
ইনানীতে নিয়ন্ত্রণহীন গ্যাসের আগুন ঘিরে আতঙ্ক, বিদ্যুৎহীন ৩ হাজার ৮০০ পরিবার
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, একই জমি, খতিয়ান ও দাগের বিষয়ে নামজারি কার্যক্রমে একজন তহসিলদার যে প্রতিবেদন দেন, পরবর্তী সময়ে একই বিষয়ে মিস মামলা হলে কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই তহসিলদার ভিন্ন প্রতিবেদন দিচ্ছেন। এ ধরনের প্রতিবেদন তৈরিতে নাজির মো. আলমগীর সহকর্মীদের প্রভাবিত ও চাপ প্রয়োগ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নামজারি খতিয়ান তৈরি, ডিসিআর সংগ্রহ, খাজনা প্রদান, মিস মামলা দায়ের ও নিষ্পত্তি এবং রেকর্ড সংশোধনের ক্ষেত্রে সামান্য অসংগতির অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হয়। জমির বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও আবেদনকারীদের বারবার নতুন কাগজ জমা দিতে বলা হচ্ছে। সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং দালালের মাধ্যমে যোগাযোগে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে।
উখিয়ায় যোগদানের আগে কক্সবাজার সদর উপজেলা ভূমি অফিসে কর্মরত থাকাকালে মো. আলমগীরের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। ওই সময় তাঁকে ঘিরে অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সহকারী কমিশনারের (ভূমি) নাম ব্যবহার করে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হতো। উখিয়ায় যোগদানের পরও একইভাবে এসি ল্যান্ডের ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, নাজির মো. আলমগীরের বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সদ্য বিদায়ী সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কাছে একাধিক লিখিত ও মৌখিকভাবে অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানা যায়নি।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, মো. আলমগীর সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের হুইপ সাইমুম সরওয়ার কমলের সুপারিশে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং তিনি সাবেক ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। তাঁর স্থানীয় পরিচিতি ও প্রভাবের কারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি বলে তাঁদের অভিযোগ।
উখিয়া উপজেলার রত্নাপালং মৌজায় একই জমি দুই পক্ষের নামে নামজারি করে মালিকানা দেওয়ার অভিযোগে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হলেও এখনো সমাধান হয়নি বলে জানা গেছে।
নাজির মো: আলমগীরের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। ফলে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এম আবদুল মান্নান মুঠোফোনে বলেন, উখিয়া ভূমি অফিসের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী বিভিন্নভাবে মানুষকে হয়রানি করছেন। ভূমি অফিসের দুর্নীতি সাধারণ মানুষের জন্য বড় দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। এ বিষয়ে সরকার ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনেরর কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার মুঠোফোনে বলেন, উপজেলার প্রতিটি ভূমি অফিসে বহিরাগত দালালদের প্রবেশ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দালাল নির্মূলে প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনারও নির্দেশনা রয়েছে।
তবে ভূমি অফিসে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পক্ষ থেকে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
ভূমিসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে সেবাগ্রহীতারা বলছেন, সিএস, এসএ ও আরএস খতিয়ান, দলিল, নামজারি এবং ভূমি উন্নয়ন করের রসিদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও বিভিন্ন ভূমি সেবা নিতে গিয়ে তাঁদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
ভূমি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমি প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। একই সঙ্গে ভূমি নিয়ে সামাজিক বিরোধ ও মামলার সংখ্যাও বাড়তে পারে। এমনিতেই ভূমিসংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগে; অনেক ক্ষেত্রে এক প্রজন্ম মামলা চালালেও পরবর্তী প্রজন্মকে রায়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
তাই মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি দমন, দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ এবং অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
- উখিয়ায় জমি দখলচেস্টার অভিযোগ, ভুক্তভোগীকে নিয়ে অপপ্রচারের দাবি
- উখিয়ায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জবরদখলকৃত ৫ একর জমি উদ্ধার করেছে বন বিভাগ
❓ সাধারণ জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: উখিয়া ভূমি অফিসে নিয়মের চেয়ে অবৈধ ‘লেনদেন’ই বড়! সম্পর্কিত তথ্য কী?
উত্তর: উখিয়া উপজেলা ভূমি অফিসে নামজারি, মিস মামলা, খাজনা আদায় ও রেকর্ড সংশোধনসহ বিভিন্ন ভূমিসেবা নিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন । মূল সংবাদ থেকে বিস্তারিত জানুন।




মন্তব্য করুন