নিউইয়র্ক এমন এক শহর, যেখানে প্রতিদিনই ইতিহাস তৈরি হয়। তবু কিছু মুহূর্ত সময়ের সীমানা ছাপিয়ে ভবিষ্যতের দিকে ইশারা করে। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারির প্রথম প্রহরটি ছিল তেমনই একটি মুহূর্ত। ম্যানহাটনের বুকের নিচে, বহুদিন ধরে পরিত্যক্ত এক ঐতিহাসিক সাবওয়ে স্টেশনে, পবিত্র কোরআনের ওপর হাত রেখে শপথ নিলেন জোহরান মামদানি। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শহর পেল তার ইতিহাসের প্রথম মুসলিম মেয়র।
এই শপথ কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। এটি ছিল বিশ্বাস, পরিচয়, অভিবাসন ও অন্তর্ভুক্তির এক গভীর বার্তা। শহরের অধিকাংশ মানুষ তখনো ঘুমিয়ে, আর পুরোনো সিটি হল সাবওয়ে স্টেশনের খিলানযুক্ত ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে নতুন মেয়র বললেন, এটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মান ও সৌভাগ্যের মুহূর্ত।
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা নাজির আলমগীরের প্রভাবে দুর্নীতিবান্ধব উখিয়া ভূমি অফিস! টাকায় হয় ‘অসাধ্য সাধন’
এই শপথ কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। এটি ছিল বিশ্বাস, পরিচয়, অভিবাসন, নাগরিকতা এবং অন্তর্ভুক্তির এক শক্তিশালী বার্তা। নিউ ইয়র্ক শহরের মানুষ তখনো ঘুমিয়ে, আর পুরোনো সিটি হল সাবওয়ে স্টেশনের খিলানযুক্ত ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে নতুন মেয়র বললেন, এটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মান ও সৌভাগ্যের মুহূর্ত।
শপথ অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় ওল্ড সিটি হল সাবওয়ে স্টেশনে, যেটি নিউইয়র্কের প্রথম দিককার সাবওয়ে স্টেশনগুলোর একটি, যার নান্দনিক স্থাপত্য আজও নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইতিহাসবিদদের মুগ্ধ করে। নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস শপথ পাঠ করান তাঁর রাজনৈতিক সহযোগী মামদানিকে। ভূগর্ভের এই ব্যক্তিগত শপথের কয়েক ঘণ্টা পরই মামদানি আবার শপথ নেবেন প্রকাশ্যে। সিটি হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শপথ পাঠ করাবেন মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। এরপর ব্রডওয়ের ক্যানিয়ন অব হিরোজ এলাকায় হবে জনসমাবেশ, টিকার টেপ প্যারেডের ঐতিহ্যবাহী পথে নতুন মেয়রকে স্বাগত জানাবে নিউইয়র্ক।
মেয়র হিসেবে প্রথম বক্তব্যে মামদানি বলেন, এই পুরোনো সাবওয়ে স্টেশন শহরের প্রাণশক্তি ও স্বাস্থ্য রক্ষায় গণপরিবহনের গুরুত্বের এক জীবন্ত সাক্ষ্য। এই বক্তব্যের মধ্যেই তিনি ঘোষণা দেন নতুন পরিবহন কমিশনার মাইক ফ্লিনের নাম। প্রতীক যেন স্পষ্ট। শহরের নিচে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের চলাচলের দিকনির্দেশ।
জোহরান মামদানি কেবল প্রথম মুসলিম মেয়র নন। তিনি নিউইয়র্কের প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মেয়র, প্রথম আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া মেয়র এবং ৩৪ বছর বয়সে বহু প্রজন্মের মধ্যে শহরের সবচেয়ে কম বয়সী মেয়র। এই প্রতিটি পরিচয় নিউইয়র্কের অভিবাসী ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
তিনি জন্মগ্রহণ করেন উগান্ডার কাম্পালায়। তাঁর মা চলচ্চিত্র নির্মাতা Mira Nair এবং বাবা শিক্ষাবিদ ও লেখক Mahmood Mamdani। সাত বছর বয়সে পরিবারসহ নিউইয়র্কে আসেন তিনি। নাইন ইলেভেন পরবর্তী সময়ে বড় হওয়া এই শহরে মুসলমান পরিচয় অনেক সময় সহজ ছিল না। ২০১৮ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন।
রাজনীতিতে আসার আগে মামদানি নিউইয়র্কে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের প্রচারণায় কাজ করেন। ২০২০ সালে কুইন্সের একটি অংশ থেকে স্টেট অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হন। সেখান থেকেই তাঁর রাজনৈতিক উত্থান। তাঁর প্রচারণার মূল শব্দ ছিল জীবনযাত্রার ব্যয়। বিনামূল্যের শিশু পরিচর্যা, বিনামূল্যের বাস, প্রায় ১০ লাখ পরিবারের জন্য ভাড়া স্থগিত রাখা এবং সিটি পরিচালিত গ্রোসারি দোকানের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ তাঁর প্রতিশ্রুতির অংশ।
এই প্রতিশ্রুতিগুলো তাঁকে ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট হিসেবে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে আসে। একই সঙ্গে তিনি নিজের মুসলিম পরিচয় নিয়ে ছিলেন স্পষ্ট ও সোচ্চার। পাঁচ বরো জুড়ে মসজিদে মসজিদে গিয়ে তিনি কথা বলেছেন, শুনেছেন, আস্থা তৈরি করেছেন। তাঁর এই প্রচারণার মধ্য দিয়েই অনেক প্রথমবারের দক্ষিণ এশীয় ও মুসলিম ভোটার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন।
মামদানিকে কাজ করতে হবে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট Donald Trump-এর সঙ্গেও। নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন ফেডারেল অর্থায়ন বন্ধ করার। তবে পরে তিনি মামদানিকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানান এবং সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তবুও অভিবাসন নীতি নিয়ে মতবিরোধ আবার মাথাচাড়া দিতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। নিউইয়র্কের ইতিহাসে নতুন এই অধ্যায় এখন কেবল শুরু। এই শহর তার নতুন মেয়রের কাছে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব নেতৃত্বের অপেক্ষায়।
তথ্যসূত্র:
Associated Press (১ জানুয়ারি ২০২৬)
Reuters: (১ জানুয়ারি ২০২৬)




মন্তব্য করুন