হোম ট্রেন্ডিং লাইভ অনুসন্ধান মেনু
প্রতি মুর্হুতের কক্সবাজারকে জানুন
🔔 নোটিফিকেশন সাবস্ক্রিপশন ×
🔔

নতুন খবর সবার আগে আপনার ফোনে পান!

কানাডার বাংলাদেশি ল’ইয়ারদের ডায়েরি

প্রতিবেদকের নাম:

প্রতিবেদকের নাম:

শুক্রবার, ২২ আগস্ট ২০২৫, ০১:০৯ পূর্বাহ্ন


মানুষ যখন বিপদে পড়ে, তখন হাত বাড়ায় আইনের দিকে। আদালতের দরজা তখন হয় তার শেষ আশ্রয়, আর আইনজীবী হয়ে ওঠেন একমাত্র ভরসার মুখ। যেন নিভু নিভু প্রদীপের নিচে দাঁড়িয়ে, মানুষ বিশ্বাস করে—এই লোকটি আলো দেখাবে। কিন্তু যদি সেই আলো নিজেই হয় বিভ্রান্তির? যদি ন্যায়বিচারের দ্বাররক্ষক পরিণত হন প্রতারণার প্রকৌশলী তাহলে?

একটি সভ্য দেশের রক্তচিহ্নহীন নরক গঠনের জন্য যুদ্ধ লাগে না, বুলেট লাগে না—লাগে কিছু স্মার্ট কাগজ, কিছু জাল সাক্ষর, কিছু বিকৃত বিবেক আর আইনজীবীর পোশাকে বসে থাকা ঠান্ডা মাথার প্রতারক।

আরও পড়ুন

কক্সবাজার রুটে ট্রেন বন্ধ ৫ দিন, ফেরত টিকিটে ক্ষতি ৮৮ লাখ টাকা

কানাডা এমন একটি দেশ যেখানে আইন ন্যায়ের প্রতীক। যেখানে আদালতের চূড়ান্ত কথাই হয় গণতন্ত্রের শেষ শব্দ। অথচ এই দেশেই এমন সব বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় আইনজীবী আছেন, যারা ক্লায়েন্টের আস্থা, স্বপ্ন, এমনকি জীবনের সঞ্চয়কে নিজের লোভের থাবায় ছিঁড়ে খাচ্ছেন।

এরা আমাদেরই লোক। ভাষায় এক, সংস্কৃতিতে এক, ধর্মে, রঙে, বর্ণে এক। তাই আমরা মনে করি, “তিনি তো নিজেদের লোক!” কিন্তু এই ‘নিজেদের লোক’ ছদ্মবেশে যখন স্বজনের রক্ত শুষে নেয়, তখন কানাডার মতো ন্যায়ভিত্তিক সমাজেও মানুষের মধ্যে জন্ম নেয় অবিশ্বাসের বিষাক্ত বীজ।

এই প্রতিবেদনে আমরা তুলে ধরেছি সেইসব মুখোশধারী ‘ল’ইয়ার’দের কাহিনি—যারা আদালতের ভাষা জানেন না, জানেন কেবল প্রতারণার ব্যাকরণ। যারা ক্লায়েন্টের কান্নাকে ব্যবসার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেন। ২০২১ থেকে ২০২৪—এই তিন বছরে কানাডায় কিছু বাংলাদেশি আইনজীবীর নামে যেসব প্রতারণা প্রকাশ্যে এসেছে, এই প্রতিবেদন তারই নির্ভরযোগ্য দলিল।

২০২৩ সালের ঘটনা। একটি চাইল্ড কাস্টডি কেসে ক্লায়েন্টের কাছ থেকে চার দফায় মোট $১২,০০০ আদায় করেন ব্যারিষ্টার হোসেন আলী (কল্পিত) নামে এক আইনজীবী। প্রথমে বলেন, “আপনার স্বামীর ব্যাকগ্রাউন্ড রিপোর্ট পেতে সময় লাগবে”, পরে “সাইকোলজিকাল ইভ্যালুয়েশন জরুরি”, এরপর “আপনার সন্তানের স্কুল রিপোর্ট চাইবে কোর্ট”…। প্রতিটি ধাপে ইমেইল ও ফোনকলে বিল করতেন ঘণ্টাপিছু $২০০ হারে।

শেষে যখন ক্লায়েন্ট আর টাকা দিতে অপারগ হন, তখন আইনজীবী নিজেই কোর্টে হাজির না হয়ে ‘উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে’ হেরে যান কেসটি। ফলাফল: ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করে ল সোসাইটি এগিয়ে আসে। তারা ক্ষতিপূরণ আদায়ে ক্লায়েন্টকে সহায়তা করে; ব্যারিষ্টার সাহেব $১৫,০০০ ফেরত দিতে বাধ্য হন।

২০২৩ সালের ঘটনা। জাভেদ ইকবাল নামে এক তরুণ বাংলাদেশি যুবক সামান্য একটি মারামারির অভিযোগে ধরা পড়লেন। আইনজীবী নীহারিকা মল্লিক (কল্পিত) তার পরিবারকে বলেন, “এ ঘটনায় নির্ঘাৎ ১০ বছর জেল হয়ে যাবে। তবে $৩০,০০০ দিলে আমি প্রসিকিউটরের সাথে ডিল করব, জামিন করিয়ে আনব।” অথচ কেসটি ছিল একেবারেই জামিনযোগ্য, যা অন্য একজন আইনজীবী দুদিনেই মিটিয়ে ফেলেন $৩,৫০০–এ।

২০২১ সালের ঘটনা। ডিভোর্স মামলায় দুই পক্ষের দুই আইনজীবী গোপনে চুক্তি করেন—প্রতিটি শুনানির জন্য অতিরিক্ত $৩,০০০ করে বিল করা হবে। এমন করে ১২টি শুনানির বিল তোলা হয়। তারা ক্লায়েন্টদের বলেন, “আদালতের পক্ষ থেকেই ডিলে হচ্ছে।” পর্দার পেছনে বসে তারা ঠিক করে নেন, মামলাটি কতদিন চলবে, কত ফি তোলা যাবে? অবশেষে তাদের এ পূর্বপরিকল্পিত নাটকটি ধরা পড়ে। ফলাফল: উভয়ের লাইসেন্স এক বছরের জন্য স্থগিত, $৫০,০০০ জরিমানা।

কিছু প্যারালিগ্যাল আজ পরিণত হয়েছে এক ধরনের ছদ্মবেশী প্রতারকে—যারা আকারে ছোট, কিন্তু ছোবলে বিষাক্ত। তারা আইনের ভেতরে নয়—আইনের ফাঁকে ফাঁকে ঘাপটি মেরে বসে থাকে, আর অপেক্ষা করে কখন কোনো হতভাগা অভিবাসী ক্লায়েন্টকে ফাঁদে ফেলা যাবে।

২০২৩ সালের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। রিনা আক্তার নামে এক প্যারালিগেল নিজেকে ‘ফ্যামিলি ল’ এক্সপার্ট’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশি নারীদের কাছ থেকে ডিভোর্স ফাইলিং বাবদ $১০,০০০ করে নেন। ব্যবহার করেন জাল Affidavit, বলেন—”আমি জজের রায় লিখি”। পরে দেখা যায় ক্লায়েন্টের আদালতের ডেট পর্যন্ত তিনি জানতেন না। ফলাফল: লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল, $১২,০০০ জরিমানা।

ইমিগ্রেশন কনসালটেন্টদের দাপট আরও এক ডিগ্রি উপরে। অফিসের সজ্জা, দেয়ালে ফ্রেম করা সার্টিফিকেট, হাতে অ্যাপল ওয়াচ, কথাবার্তায় চাতুর্য। ভাবে-সাবে এরা ব্যারিস্টারদেরও ব্যারিস্টার! তারা নিজেদের পরিচয় দেন “লাইসেন্সড ইমিগ্রেশন প্রফেশনাল,” কিন্তু আচরণে যেন ক্লায়েন্টরা তাদের বাপ-দাদার গোলাম। প্রথম সাক্ষাতে আদর-আপ্যায়ন আর আনলিমিটেড সহযোগিতার আশ্বাস। কিন্তু টাকা নেয়ার পর পাল্টে যায় দৃশ্যপট। তখন তারা ব্যস্ত হয়ে যান; এমন ব্যস্ত যে অ্যাপোয়েন্টমেন্ট তো দূরের কথা, ফোন ধরার সময়ও তাদের থাকে না।

সালেহ আহমেদ নামের এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ি, যিনি পরিবারসহ কানাডা এসেছেন ভিজিটর ভিসায়। এদেশে কিভাবে থাকা যায় পরামর্শের জন্য তিনি আব্দুল মালেক (কল্পিত) নামে এক ইমিগ্রেশন কনসালটেন্টের দ্বারস্থ হন। তাকে বুদ্ধি দেয়া হয় রিফুউজি ক্লেইম করার জন্যে। ১২ হাজার ডলারে পিআর কার্ড পাওয়া পর্যন্ত মৌখিক চুক্তি হয়। পরবর্তীতে কেইস লেখার জন্য আরও ২ হাজার ডলার নেন।

একাধিক ভুল তথ্য থাকার কারণে সালেহ আহমেদ-এর আবেদন রিজেক্ট হয়। দেখা যায় অন্য আরেক আবেদনকারীর কেইস হুবহু কপি করে পেষ্ট করা হয়েছে।

অবশেষে সালেহ আহমেদ সরাসরি IRCC তে যোগাযোগ করে নিজের ফাইল নতুন করে একজন অভিজ্ঞ ল’ইয়ারের মাধ্যমে জমা দেন, যা তাঁকে সময় ও অর্থ—উভয়ক্ষেত্রেই দ্বিগুণ ক্ষতির মুখে ফেলে।

আব্দুল মালেক নামের সেই কনসালটেন্টের বিরুদ্ধে পরবর্তীতে ICCRC তে অভিযোগ জমা দেন সালেহ। তদন্ত শেষে দেখা যায়—এই একই ফরম্যাটে আরও অন্তত ১৭ জনের ফাইল বানিয়ে দিয়েছেন তিনি, যার বেশিরভাগই বাতিল হয়েছে।

কানাডার ইমিগ্রেশন আইনে, ক্লায়েন্টের অজান্তে ভুল তথ্য প্রদান কিংবা প্রতারণা উদ্দেশ্যে কনসালট্যান্টের দ্বারা কপি-পেস্ট করা অ্যাফিডেভিট ব্যবহার Section 91 of the Immigration and Refugee Protection Act (IRPA) অনুযায়ী একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

CICC-এর ডিসিপ্লিনারি ট্রাইব্যুনাল এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে আব্দুল মালেককে শোকজ করে এবং শুনানির মাধ্যমে প্রমাণিত হয়—তিনি ন্যূনতম প্রফেশনাল দায়িত্বও পালন করেননি।

ফলস্বরূপ: তার লাইসেন্স এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়। ১৫,০০০ ডলার জরিমানা ধার্য করা হয় (Administrative Penalty)। ক্ষতিগ্রস্ত ক্লায়েন্টদের পূর্ণ অর্থ ফেরতের নির্দেশ দেওয়া হয়।

কিছু ধান্দাবাজ ইন্টারপ্রিটারও নানান কৌশলে হাজার হাজার ডলার কামিয়ে নিচ্ছেন। জানা যায়, নতুন আগত ইংরেজি না জানা রিফুউজি ক্লায়েন্টদেরকে তারা ভাগিয়ে নিয়ে তাদের নিজস্ব ঘরানার আইনজীবীর কাছে হস্তান্তর করেন। এতে ক্লায়েন্ট প্রতি তারা একহাজার থেকে দেড়হাজার ডলার কমিশন লাভ করেন। একটি ঘটনায় দেখা গেছে, নাজনীন বেগম (কল্পিত) নামে এক ইন্টারপ্রিটার এক মাসে ১২ জন ক্লায়েন্টকে নির্দিষ্ট ল’ফার্মে পাঠিয়ে কয়েক হাজার ডলার কমিশন নিয়েছেন।

প্রতারক ব্যারিস্টারদের কাহিনীর যেন শেষ নেই। প্রতিটি ঘটনার পেছনে লুকিয়ে আছে বিশ্বাসভঙ্গের এক একটি নির্মম পর্ব। ব্যারিস্টার আসাদ নূর (কল্পিত)—টরন্টোর একজন বাংলাদেশি ব্যারিস্টার—একজন ক্লায়েন্টকে বাড়ি কেনার ক্লোজিংয়ে আশ্বাস দেন, “অতিরিক্ত কিছু ফি দিলে মর্টগেজ রেট কমিয়ে আনতে পারবেন”—যা সম্পূর্ণ বেআইনি। তদ্ব্যতীত, তিনি একটি ভুয়া Power of Attorney ব্যবহার করে ক্লায়েন্টের পক্ষে চুক্তি সম্পাদন করেন, যা পরে আদালতে ধরা পড়ে।

এই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে শুরু হয় তদন্ত। ফলাফল: লাইসেন্স এক বছরের জন্য স্থগিত, $১৫,০০০ জরিমানা, এবং ক্ষতিপূরণ আদায়।

সেদিন ক্লায়েন্ট আদালতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন—আমি তাঁকে নিজের দেশের মানুষ ভেবে বিশ্বাস করেছিলাম। ভাবিনি, এই মানুষটাই আমার জীবনের সবকিছু এক ঝটকায় কেড়ে নেবেন।

২০২৩ সালে অন্টারিওর একটি আলোচিত তদন্তে উঠে আসে বিস্ময়কর এক প্রতারণার চিত্র। অভিযোগের কেন্দ্রে ছিলেন আমিনুল ইসলাম নামে এক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আইনজীবী, যিনি শতাধিক রিফিউজি ক্লেইমের জন্য বানোয়াট নির্যাতনের গল্প রচনা করেন।

শুধু তাই নয়, প্রতিটি ক্লায়েন্টের জন্য তিনি জাল ‘মেডিকেল রিপোর্ট’, রাজনৈতিক সংগঠনের ভুয়া সদস্যপদ এবং পুলিশ রিপোর্ট বানিয়ে জমা দিতেন। অধিকাংশ আবেদনেই প্রায় একই রকম ভাষা, প্লট ও নাটকীয় বিবরণ—যা তদন্তকারীদের সন্দেহ জাগায়।

ক্লায়েন্টদের তিনি বলতেন, “জজ আমার ব্যক্তিগত বন্ধু। আমার নাম দেখলেই কেস ক্লিয়ার করে দেন।” এ কথার উপর বিশ্বাস রেখে অনেক আবেদনকারি ৮ থেকে ১৫ হাজার ডলারের বিনিময়ে তাঁর কাছে ভিজিটর ভিসা থেকে পিআর-এর স্বপ্নে আশ্রয় খুঁজে আসতেন।

এভাবেই তৈরি হয়েছিল একটি ‘টেমপ্লেট ভিত্তিক রিফিউজি ইন্ডাস্ট্রি’। IRCC এবং CBSA-এর যৌথ তদন্তে এসব বানোয়াট আবেদনের সূত্র খুঁজে পেয়ে প্রথম দফায় ৩০ জন ক্লায়েন্টকে ডিপোর্টেশন নোটিশ ইস্যু করা হয়। অনেকেই বলেন, তাঁরা জানতেনই না, যে কাহিনি তাঁদের নামে আদালতে জমা পড়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

ফলাফল: এক আইনজীবীর প্রতারণায় অনেক জীবন ছিন্নভিন্ন। ল’ সোসাইটি অফ অন্টারিও আমিনুল ইসলামের লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করে। তার বিরুদ্ধে ডিসিপ্লিনারি প্রসিডিং শুরু হয়। চলমান তদন্ত শেষে ফৌজদারি চার্জ গঠন ও লাইসেন্স বাতিলের সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ঘটনায় IRCC আমিনুলের পূর্ববর্তী ১০০টিরও বেশি ফাইল পুনঃমূল্যায়ন করে। কমিউনিটিতে তৈরি হয় ভয়, ক্ষোভ ও একটি অনির্বচনীয় হতাশা।

ব্যারিস্টার আসিফ আব্দুল্লাহ (কল্পিত)। যিনি আইনের পোশাক পরে কানাডার আদালতে দাঁড়ালেও তার অন্তরে বাস করত প্রতারণার কৌশল। অভিযোগ উঠেছে—তিনি অন্তত ১৭ জন ক্লায়েন্টের ট্রাস্ট ফান্ড থেকে অর্থ সরিয়ে তা বিনিয়োগ করেন ক্রিপ্টোকারেন্সিতে। একটি বাড়ির বিক্রয় প্রক্রিয়ায় তিনি নিজের নামেই জাল Power of Attorney তৈরি করে সম্পূর্ণ লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করেন।

এর চেয়েও গুরুতর বিষয়—তিনি বহুবার আদালতে উপস্থিত হননি, যার ফলে একাধিক কেস ধ্বংস হয়ে যায়। তদন্তে বেরিয়ে আসে—৪১টি মামলায় অমিল ফাইলিং, ৩টি ‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ রেকর্ড, এবং অন্তত ১৫টি অবৈধ কন্টিনজেন্সি ফি—যা বার অ্যাসোসিয়েশনের কঠোর নিয়মভঙ্গ।

ফলাফল: লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত। ল সোসাইটি মন্তব্য করে—“এই কেসটি শুধু বাংলাদেশি কমিউনিটিতেই নয়, বরং পুরো অন্টারিও বার ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন প্রতারণার দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে।”

ল সোসাইটি অব অন্টারিওর ২০২৩ রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৮% বাংলাদেশি ল’ইয়ার ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশনের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৬৮% ক্ষেত্রে ফাইন্যান্সিয়াল ফ্রড ছিল।

আদালত প্রাঙ্গণে, এমনকি বার কাউন্সিলের কফিকর্ণারে বাংলাদেশি ব্যারিস্টারদের ইংরেজি ভাষায় অদক্ষতা এবং তাদের চাতুর্যপূর্ণ অপেশাদার কর্মকাণ্ড মুখরোচক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিচারপ্রার্থীরা নয়, বরং আইনজীবীরাই যখন বিচারকের কথাবার্তা বুঝতে হিমশিম খান, তখন আদালতের আবহাওয়ায় গুমোট একটা অস্বস্তি নেমে আসে। অনেক সময় বিচারকরাও তাঁদের উচ্চারণ ও শব্দচয়ন বুঝতে পারেন না—ফলে সৃষ্টি হয় বিভ্রান্তি, বিলম্ব ও বিরক্তি।

বিভিন্ন মামলার শুনানিতে দেখা গেছে, বিচারকরা খোলাখুলি বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। একজন বিচারক মন্তব্য করেন—“আমরা ক্লায়েন্টের জন্য ইন্টারপ্রিটারের ব্যবস্থা করি, কিন্তু আইনজীবীদের জন্য নয়।”

আরেকজন বিচারক আরও কঠোরভাবে বলেন—“আপনার ইংরেজি ভাষায় অদক্ষতা এই মামলার সুবিচারে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনি আপনার ক্লায়েন্টের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ।”

এই ধরণের মন্তব্য শুধু ব্যক্তিগত নয়—এটি গোটা কমিউনিটির পেশাদারিত্ব, সম্মান ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ফলে, বিচারক থেকে শুরু করে সহকর্মী, এমনকি ক্লায়েন্টদের মধ্যেও জন্ম নিচ্ছে একধরনের হতাশা ও অবিশ্বাস।

‘চাতুর্যপূর্ণ অপেশাদারতা’—এই শব্দবন্ধটি যেন কিছু বাংলাদেশি আইনজীবীর নতুন পেশাগত দর্শন। এখানে আইন নয়, কৌশলই মুখ্য। কেউ ফেক ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ তৈরি করেন, কেউ ট্রাস্ট ফান্ড থেকে টাকা তুলে নেন চোখের পলকে। ক্লায়েন্টের অজান্তেই ‘সেটেলমেন্ট’-এর নামে কৌশলে টাকা নিজের পকেটে তুলে নেন অনেকেই। এমনকি কোর্টে হাজির না হয়েও কাগজে সই দিয়ে মামলার শুনানি চালিয়ে যাওয়ার কসরতও দেখা গেছে।

আবার এমন ঘটনাও আছে—তিন বছর ধরে কেস চলছে, অথচ সেই ব্যারিস্টার এখনো জানেন না, এটি ‘সিভিল’ মামলা নাকি ‘ক্রিমিনাল’!

এইসব ঘটনা নিছক কিছু বিচ্ছিন্ন ব্যত্যয় নয়—বরং প্রতিটি কাহিনি একেকটি সতর্কবার্তা, যা আমাদের কমিউনিটির পেশাদার মূল্যবোধকে গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। এসব ঘটনা মনে করিয়ে দেয়—সুদর্শন অফিস, দামি গাড়ি আর চকচকে বিজনেস কার্ড দিয়ে পেশার সৌন্দর্য তৈরি হয় না। তার আড়ালেও লুকিয়ে থাকতে পারে ভয়ঙ্কর অপেশাদারতা, শঠতা এবং দায়িত্বহীনতার এক অন্ধকার জগৎ।

লম্বা পাঞ্জাবি পরলেই যেমন কেউ আলেম হয় না; তেমন আইনের পোশাক গায়ে দিলেই কেউ সৎ মানুষ হয়ে যায় না। কানাডার মতো সুশৃঙ্খল দেশেও, কিছু মুখোশধারী আইনজীবী ন্যায়ের নাম দিয়ে অন্যায়কে বৈধতা দিতে চায়। তারা আদালতে যায় ঠিকই, কিন্তু চোখে থাকে ডলার চিহ্ন। তারা কলম চালায়, কিন্তু তাতে থাকে প্রতারণার কালি।

“একজন সৎ আইনজীবী কখনই আপনার আশঙ্কাকে উপেক্ষা করবেন না। যদি আপনার সন্দেহ হয়, তাৎক্ষণিকভাবে ল সোসাইটিকে জানান। প্রতিটি রিপোর্ট আমাদের লিগ্যাল সিস্টেমকে আরও নিরাপদ করে তোলে।”
—জাস্টিস মেরি টি. নর্টন, অন্টারিও সুপিরিয়র কোর্ট

দ্রষ্টব্য: আইনি সীমাবদ্ধতা ও নৈতিক কারণে এ প্রতিবেদনের সকল নাম কল্পিত।

তথ্যসূত্র:
1. Law Society of Ontario (LSO) ডিসিপ্লিনারি রিপোর্ট: https://www.lso.ca
2. কানাডিয়ান লিগ্যাল ইনফরমেশন ইনস্টিটিউট (CanLII): https://www.canlii.org
3. CBC News (২০২৩): “How Fake POAs Are Fueling Real Estate Fraud in Toronto”
4. The Globe and Mail (২০২৪): “Disciplinary Actions Against Immigrant Lawyers Rise by 40%”


coxsbazarpost

coxsbazarpost

কক্সবাজারের স্থানীয় সাংবাদিকতা ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের বিশ্বস্ত লেখক।

সত্যতা যাচাই: এই সংবাদটি সম্পাদকীয় নীতি অনুসরণ করে বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

সংবাদ কিউআর কোড

নিচের QR কোডটি স্ক্যান করে যেকোনো মোবাইলে সংবাদটি সরাসরি ওপেন করুন।

ফটোকার্ড স্টুডিও

আন্তর্জাতিক
Card Image

কানাডার বাংলাদেশি ল’ইয়ারদের ডায়েরি

www.coxsbazarposts.com সত্যের সন্ধানে অনুক্ষণ

প্রিন্ট প্রিভিউ

Logo www.coxsbazarposts.com

কানাডার বাংলাদেশি ল’ইয়ারদের ডায়েরি

প্রতিবেদক: প্রতিবেদকের নাম: | প্রকাশিত: শুক্রবার, ২২ আগস্ট ২০২৫, ০১:০৯ পূর্বাহ্ন
Print Image
[ad_1] মানুষ যখন বিপদে পড়ে, তখন হাত বাড়ায় আইনের দিকে। আদালতের দরজা তখন হয় তার শেষ আশ্রয়, আর আইনজীবী হয়ে ওঠেন একমাত্র ভরসার মুখ। যেন নিভু নিভু প্রদীপের নিচে দাঁড়িয়ে, মানুষ বিশ্বাস করে—এই লোকটি আলো দেখাবে। কিন্তু যদি সেই আলো নিজেই হয় বিভ্রান্তির? যদি ন্যায়বিচারের দ্বাররক্ষক পরিণত হন প্রতারণার প্রকৌশলী তাহলে?একটি সভ্য দেশের রক্তচিহ্নহীন নরক গঠনের জন্য যুদ্ধ লাগে না, বুলেট লাগে না—লাগে কিছু স্মার্ট কাগজ, কিছু জাল সাক্ষর, কিছু বিকৃত বিবেক আর আইনজীবীর পোশাকে বসে থাকা ঠান্ডা মাথার প্রতারক।কানাডা এমন একটি দেশ যেখানে আইন ন্যায়ের প্রতীক। যেখানে আদালতের চূড়ান্ত কথাই হয় গণতন্ত্রের শেষ শব্দ। অথচ এই দেশেই এমন সব বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় আইনজীবী আছেন, যারা ক্লায়েন্টের আস্থা, স্বপ্ন, এমনকি জীবনের সঞ্চয়কে নিজের লোভের থাবায় ছিঁড়ে খাচ্ছেন।এরা আমাদেরই লোক। ভাষায় এক, সংস্কৃতিতে এক, ধর্মে, রঙে, বর্ণে এক। তাই আমরা মনে করি, “তিনি তো নিজেদের লোক!” কিন্তু এই ‘নিজেদের লোক’ ছদ্মবেশে যখন স্বজনের রক্ত শুষে নেয়, তখন কানাডার মতো ন্যায়ভিত্তিক সমাজেও মানুষের মধ্যে জন্ম নেয় অবিশ্বাসের বিষাক্ত বীজ।এই প্রতিবেদনে আমরা তুলে ধরেছি সেইসব মুখোশধারী ‘ল’ইয়ার’দের কাহিনি—যারা আদালতের ভাষা জানেন না, জানেন কেবল প্রতারণার ব্যাকরণ। যারা ক্লায়েন্টের কান্নাকে ব্যবসার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেন। ২০২১ থেকে ২০২৪—এই তিন বছরে কানাডায় কিছু বাংলাদেশি আইনজীবীর নামে যেসব প্রতারণা প্রকাশ্যে এসেছে, এই প্রতিবেদন তারই নির্ভরযোগ্য দলিল।২০২৩ সালের ঘটনা। একটি চাইল্ড কাস্টডি কেসে ক্লায়েন্টের কাছ থেকে চার দফায় মোট $১২,০০০ আদায় করেন ব্যারিষ্টার হোসেন আলী (কল্পিত) নামে এক আইনজীবী। প্রথমে বলেন, “আপনার স্বামীর ব্যাকগ্রাউন্ড রিপোর্ট পেতে সময় লাগবে”, পরে “সাইকোলজিকাল ইভ্যালুয়েশন জরুরি”, এরপর “আপনার সন্তানের স্কুল রিপোর্ট চাইবে কোর্ট”…। প্রতিটি ধাপে ইমেইল ও ফোনকলে বিল করতেন ঘণ্টাপিছু $২০০ হারে।শেষে যখন ক্লায়েন্ট আর টাকা দিতে অপারগ হন, তখন আইনজীবী নিজেই কোর্টে হাজির না হয়ে ‘উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে’ হেরে যান কেসটি। ফলাফল: ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করে ল সোসাইটি এগিয়ে আসে। তারা ক্ষতিপূরণ আদায়ে ক্লায়েন্টকে সহায়তা করে; ব্যারিষ্টার সাহেব $১৫,০০০ ফেরত দিতে বাধ্য হন।২০২৩ সালের ঘটনা। জাভেদ ইকবাল নামে এক তরুণ বাংলাদেশি যুবক সামান্য একটি মারামারির অভিযোগে ধরা পড়লেন। আইনজীবী নীহারিকা মল্লিক (কল্পিত) তার পরিবারকে বলেন, “এ ঘটনায় নির্ঘাৎ ১০ বছর জেল হয়ে যাবে। তবে $৩০,০০০ দিলে আমি প্রসিকিউটরের সাথে ডিল করব, জামিন করিয়ে আনব।” অথচ কেসটি ছিল একেবারেই জামিনযোগ্য, যা অন্য একজন আইনজীবী দুদিনেই মিটিয়ে ফেলেন $৩,৫০০–এ।২০২১ সালের ঘটনা। ডিভোর্স মামলায় দুই পক্ষের দুই আইনজীবী গোপনে চুক্তি করেন—প্রতিটি শুনানির জন্য অতিরিক্ত $৩,০০০ করে বিল করা হবে। এমন করে ১২টি শুনানির বিল তোলা হয়। তারা ক্লায়েন্টদের বলেন, “আদালতের পক্ষ থেকেই ডিলে হচ্ছে।” পর্দার পেছনে বসে তারা ঠিক করে নেন, মামলাটি কতদিন চলবে, কত ফি তোলা যাবে? অবশেষে তাদের এ পূর্বপরিকল্পিত নাটকটি ধরা পড়ে। ফলাফল: উভয়ের লাইসেন্স এক বছরের জন্য স্থগিত, $৫০,০০০ জরিমানা।কিছু প্যারালিগ্যাল আজ পরিণত হয়েছে এক ধরনের ছদ্মবেশী প্রতারকে—যারা আকারে ছোট, কিন্তু ছোবলে বিষাক্ত। তারা আইনের ভেতরে নয়—আইনের ফাঁকে ফাঁকে ঘাপটি মেরে বসে থাকে, আর অপেক্ষা করে কখন কোনো হতভাগা অভিবাসী ক্লায়েন্টকে ফাঁদে ফেলা যাবে।২০২৩ সালের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। রিনা আক্তার নামে এক প্যারালিগেল নিজেকে ‘ফ্যামিলি ল’ এক্সপার্ট’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশি নারীদের কাছ থেকে ডিভোর্স ফাইলিং বাবদ $১০,০০০ করে নেন। ব্যবহার করেন জাল Affidavit, বলেন—”আমি জজের রায় লিখি”। পরে দেখা যায় ক্লায়েন্টের আদালতের ডেট পর্যন্ত তিনি জানতেন না। ফলাফল: লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল, $১২,০০০ জরিমানা।ইমিগ্রেশন কনসালটেন্টদের দাপট আরও এক ডিগ্রি উপরে। অফিসের সজ্জা, দেয়ালে ফ্রেম করা সার্টিফিকেট, হাতে অ্যাপল ওয়াচ, কথাবার্তায় চাতুর্য। ভাবে-সাবে এরা ব্যারিস্টারদেরও ব্যারিস্টার! তারা নিজেদের পরিচয় দেন “লাইসেন্সড ইমিগ্রেশন প্রফেশনাল,” কিন্তু আচরণে যেন ক্লায়েন্টরা তাদের বাপ-দাদার গোলাম। প্রথম সাক্ষাতে আদর-আপ্যায়ন আর আনলিমিটেড সহযোগিতার আশ্বাস। কিন্তু টাকা নেয়ার পর পাল্টে যায় দৃশ্যপট। তখন তারা ব্যস্ত হয়ে যান; এমন ব্যস্ত যে অ্যাপোয়েন্টমেন্ট তো দূরের কথা, ফোন ধরার সময়ও তাদের থাকে না।সালেহ আহমেদ নামের এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ি, যিনি পরিবারসহ কানাডা এসেছেন ভিজিটর ভিসায়। এদেশে কিভাবে থাকা যায় পরামর্শের জন্য তিনি আব্দুল মালেক (কল্পিত) নামে এক ইমিগ্রেশন কনসালটেন্টের দ্বারস্থ হন। তাকে বুদ্ধি দেয়া হয় রিফুউজি ক্লেইম করার জন্যে। ১২ হাজার ডলারে পিআর কার্ড পাওয়া পর্যন্ত মৌখিক চুক্তি হয়। পরবর্তীতে কেইস লেখার জন্য আরও ২ হাজার ডলার নেন।একাধিক ভুল তথ্য থাকার কারণে সালেহ আহমেদ-এর আবেদন রিজেক্ট হয়। দেখা যায় অন্য আরেক আবেদনকারীর কেইস হুবহু কপি করে পেষ্ট করা হয়েছে।অবশেষে সালেহ আহমেদ সরাসরি IRCC তে যোগাযোগ করে নিজের ফাইল নতুন করে একজন অভিজ্ঞ ল’ইয়ারের মাধ্যমে জমা দেন, যা তাঁকে সময় ও অর্থ—উভয়ক্ষেত্রেই দ্বিগুণ ক্ষতির মুখে ফেলে।আব্দুল মালেক নামের সেই কনসালটেন্টের বিরুদ্ধে পরবর্তীতে ICCRC তে অভিযোগ জমা দেন সালেহ। তদন্ত শেষে দেখা যায়—এই একই ফরম্যাটে আরও অন্তত ১৭ জনের ফাইল বানিয়ে দিয়েছেন তিনি, যার বেশিরভাগই বাতিল হয়েছে।কানাডার ইমিগ্রেশন আইনে, ক্লায়েন্টের অজান্তে ভুল তথ্য প্রদান কিংবা প্রতারণা উদ্দেশ্যে কনসালট্যান্টের দ্বারা কপি-পেস্ট করা অ্যাফিডেভিট ব্যবহার Section 91 of the Immigration and Refugee Protection Act (IRPA) অনুযায়ী একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।CICC-এর ডিসিপ্লিনারি ট্রাইব্যুনাল এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে আব্দুল মালেককে শোকজ করে এবং শুনানির মাধ্যমে প্রমাণিত হয়—তিনি ন্যূনতম প্রফেশনাল দায়িত্বও পালন করেননি।ফলস্বরূপ: তার লাইসেন্স এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়। ১৫,০০০ ডলার জরিমানা ধার্য করা হয় (Administrative Penalty)। ক্ষতিগ্রস্ত ক্লায়েন্টদের পূর্ণ অর্থ ফেরতের নির্দেশ দেওয়া হয়।কিছু ধান্দাবাজ ইন্টারপ্রিটারও নানান কৌশলে হাজার হাজার ডলার কামিয়ে নিচ্ছেন। জানা যায়, নতুন আগত ইংরেজি না জানা রিফুউজি ক্লায়েন্টদেরকে তারা ভাগিয়ে নিয়ে তাদের নিজস্ব ঘরানার আইনজীবীর কাছে হস্তান্তর করেন। এতে ক্লায়েন্ট প্রতি তারা একহাজার থেকে দেড়হাজার ডলার কমিশন লাভ করেন। একটি ঘটনায় দেখা গেছে, নাজনীন বেগম (কল্পিত) নামে এক ইন্টারপ্রিটার এক মাসে ১২ জন ক্লায়েন্টকে নির্দিষ্ট ল’ফার্মে পাঠিয়ে কয়েক হাজার ডলার কমিশন নিয়েছেন।প্রতারক ব্যারিস্টারদের কাহিনীর যেন শেষ নেই। প্রতিটি ঘটনার পেছনে লুকিয়ে আছে বিশ্বাসভঙ্গের এক একটি নির্মম পর্ব। ব্যারিস্টার আসাদ নূর (কল্পিত)—টরন্টোর একজন বাংলাদেশি ব্যারিস্টার—একজন ক্লায়েন্টকে বাড়ি কেনার ক্লোজিংয়ে আশ্বাস দেন, “অতিরিক্ত কিছু ফি দিলে মর্টগেজ রেট কমিয়ে আনতে পারবেন”—যা সম্পূর্ণ বেআইনি। তদ্ব্যতীত, তিনি একটি ভুয়া Power of Attorney ব্যবহার করে ক্লায়েন্টের পক্ষে চুক্তি সম্পাদন করেন, যা পরে আদালতে ধরা পড়ে।এই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে শুরু হয় তদন্ত। ফলাফল: লাইসেন্স এক বছরের জন্য স্থগিত, $১৫,০০০ জরিমানা, এবং ক্ষতিপূরণ আদায়।সেদিন ক্লায়েন্ট আদালতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন—আমি তাঁকে নিজের দেশের মানুষ ভেবে বিশ্বাস করেছিলাম। ভাবিনি, এই মানুষটাই আমার জীবনের সবকিছু এক ঝটকায় কেড়ে নেবেন।২০২৩ সালে অন্টারিওর একটি আলোচিত তদন্তে উঠে আসে বিস্ময়কর এক প্রতারণার চিত্র। অভিযোগের কেন্দ্রে ছিলেন আমিনুল ইসলাম নামে এক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আইনজীবী, যিনি শতাধিক রিফিউজি ক্লেইমের জন্য বানোয়াট নির্যাতনের গল্প রচনা করেন।শুধু তাই নয়, প্রতিটি ক্লায়েন্টের জন্য তিনি জাল ‘মেডিকেল রিপোর্ট’, রাজনৈতিক সংগঠনের ভুয়া সদস্যপদ এবং পুলিশ রিপোর্ট বানিয়ে জমা দিতেন। অধিকাংশ আবেদনেই প্রায় একই রকম ভাষা, প্লট ও নাটকীয় বিবরণ—যা তদন্তকারীদের সন্দেহ জাগায়।ক্লায়েন্টদের তিনি বলতেন, “জজ আমার ব্যক্তিগত বন্ধু। আমার নাম দেখলেই কেস ক্লিয়ার করে দেন।” এ কথার উপর বিশ্বাস রেখে অনেক আবেদনকারি ৮ থেকে ১৫ হাজার ডলারের বিনিময়ে তাঁর কাছে ভিজিটর ভিসা থেকে পিআর-এর স্বপ্নে আশ্রয় খুঁজে আসতেন।এভাবেই তৈরি হয়েছিল একটি ‘টেমপ্লেট ভিত্তিক রিফিউজি ইন্ডাস্ট্রি’। IRCC এবং CBSA-এর যৌথ তদন্তে এসব বানোয়াট আবেদনের সূত্র খুঁজে পেয়ে প্রথম দফায় ৩০ জন ক্লায়েন্টকে ডিপোর্টেশন নোটিশ ইস্যু করা হয়। অনেকেই বলেন, তাঁরা জানতেনই না, যে কাহিনি তাঁদের নামে আদালতে জমা পড়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।ফলাফল: এক আইনজীবীর প্রতারণায় অনেক জীবন ছিন্নভিন্ন। ল’ সোসাইটি অফ অন্টারিও আমিনুল ইসলামের লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করে। তার বিরুদ্ধে ডিসিপ্লিনারি প্রসিডিং শুরু হয়। চলমান তদন্ত শেষে ফৌজদারি চার্জ গঠন ও লাইসেন্স বাতিলের সম্ভাবনা রয়েছে।এ ঘটনায় IRCC আমিনুলের পূর্ববর্তী ১০০টিরও বেশি ফাইল পুনঃমূল্যায়ন করে। কমিউনিটিতে তৈরি হয় ভয়, ক্ষোভ ও একটি অনির্বচনীয় হতাশা।ব্যারিস্টার আসিফ আব্দুল্লাহ (কল্পিত)। যিনি আইনের পোশাক পরে কানাডার আদালতে দাঁড়ালেও তার অন্তরে বাস করত প্রতারণার কৌশল। অভিযোগ উঠেছে—তিনি অন্তত ১৭ জন ক্লায়েন্টের ট্রাস্ট ফান্ড থেকে অর্থ সরিয়ে তা বিনিয়োগ করেন ক্রিপ্টোকারেন্সিতে। একটি বাড়ির বিক্রয় প্রক্রিয়ায় তিনি নিজের নামেই জাল Power of Attorney তৈরি করে সম্পূর্ণ লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করেন।এর চেয়েও গুরুতর বিষয়—তিনি বহুবার আদালতে উপস্থিত হননি, যার ফলে একাধিক কেস ধ্বংস হয়ে যায়। তদন্তে বেরিয়ে আসে—৪১টি মামলায় অমিল ফাইলিং, ৩টি ‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ রেকর্ড, এবং অন্তত ১৫টি অবৈধ কন্টিনজেন্সি ফি—যা বার অ্যাসোসিয়েশনের কঠোর নিয়মভঙ্গ।ফলাফল: লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত। ল সোসাইটি মন্তব্য করে—“এই কেসটি শুধু বাংলাদেশি কমিউনিটিতেই নয়, বরং পুরো অন্টারিও বার ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন প্রতারণার দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে।”ল সোসাইটি অব অন্টারিওর ২০২৩ রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৮% বাংলাদেশি ল’ইয়ার ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশনের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৬৮% ক্ষেত্রে ফাইন্যান্সিয়াল ফ্রড ছিল।আদালত প্রাঙ্গণে, এমনকি বার কাউন্সিলের কফিকর্ণারে বাংলাদেশি ব্যারিস্টারদের ইংরেজি ভাষায় অদক্ষতা এবং তাদের চাতুর্যপূর্ণ অপেশাদার কর্মকাণ্ড মুখরোচক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিচারপ্রার্থীরা নয়, বরং আইনজীবীরাই যখন বিচারকের কথাবার্তা বুঝতে হিমশিম খান, তখন আদালতের আবহাওয়ায় গুমোট একটা অস্বস্তি নেমে আসে। অনেক সময় বিচারকরাও তাঁদের উচ্চারণ ও শব্দচয়ন বুঝতে পারেন না—ফলে সৃষ্টি হয় বিভ্রান্তি, বিলম্ব ও বিরক্তি।বিভিন্ন মামলার শুনানিতে দেখা গেছে, বিচারকরা খোলাখুলি বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। একজন বিচারক মন্তব্য করেন—“আমরা ক্লায়েন্টের জন্য ইন্টারপ্রিটারের ব্যবস্থা করি, কিন্তু আইনজীবীদের জন্য নয়।”আরেকজন বিচারক আরও কঠোরভাবে বলেন—“আপনার ইংরেজি ভাষায় অদক্ষতা এই মামলার সুবিচারে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনি আপনার ক্লায়েন্টের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ।”এই ধরণের মন্তব্য শুধু ব্যক্তিগত নয়—এটি গোটা কমিউনিটির পেশাদারিত্ব, সম্মান ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ফলে, বিচারক থেকে শুরু করে সহকর্মী, এমনকি ক্লায়েন্টদের মধ্যেও জন্ম নিচ্ছে একধরনের হতাশা ও অবিশ্বাস।‘চাতুর্যপূর্ণ অপেশাদারতা’—এই শব্দবন্ধটি যেন কিছু বাংলাদেশি আইনজীবীর নতুন পেশাগত দর্শন। এখানে আইন নয়, কৌশলই মুখ্য। কেউ ফেক ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ তৈরি করেন, কেউ ট্রাস্ট ফান্ড থেকে টাকা তুলে নেন চোখের পলকে। ক্লায়েন্টের অজান্তেই ‘সেটেলমেন্ট’-এর নামে কৌশলে টাকা নিজের পকেটে তুলে নেন অনেকেই। এমনকি কোর্টে হাজির না হয়েও কাগজে সই দিয়ে মামলার শুনানি চালিয়ে যাওয়ার কসরতও দেখা গেছে।আবার এমন ঘটনাও আছে—তিন বছর ধরে কেস চলছে, অথচ সেই ব্যারিস্টার এখনো জানেন না, এটি ‘সিভিল’ মামলা নাকি ‘ক্রিমিনাল’!এইসব ঘটনা নিছক কিছু বিচ্ছিন্ন ব্যত্যয় নয়—বরং প্রতিটি কাহিনি একেকটি সতর্কবার্তা, যা আমাদের কমিউনিটির পেশাদার মূল্যবোধকে গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। এসব ঘটনা মনে করিয়ে দেয়—সুদর্শন অফিস, দামি গাড়ি আর চকচকে বিজনেস কার্ড দিয়ে পেশার সৌন্দর্য তৈরি হয় না। তার আড়ালেও লুকিয়ে থাকতে পারে ভয়ঙ্কর অপেশাদারতা, শঠতা এবং দায়িত্বহীনতার এক অন্ধকার জগৎ।লম্বা পাঞ্জাবি পরলেই যেমন কেউ আলেম হয় না; তেমন আইনের পোশাক গায়ে দিলেই কেউ সৎ মানুষ হয়ে যায় না। কানাডার মতো সুশৃঙ্খল দেশেও, কিছু মুখোশধারী আইনজীবী ন্যায়ের নাম দিয়ে অন্যায়কে বৈধতা দিতে চায়। তারা আদালতে যায় ঠিকই, কিন্তু চোখে থাকে ডলার চিহ্ন। তারা কলম চালায়, কিন্তু তাতে থাকে প্রতারণার কালি।“একজন সৎ আইনজীবী কখনই আপনার আশঙ্কাকে উপেক্ষা করবেন না। যদি আপনার সন্দেহ হয়, তাৎক্ষণিকভাবে ল সোসাইটিকে জানান। প্রতিটি রিপোর্ট আমাদের লিগ্যাল সিস্টেমকে আরও নিরাপদ করে তোলে।”—জাস্টিস মেরি টি. নর্টন, অন্টারিও সুপিরিয়র কোর্টদ্রষ্টব্য: আইনি সীমাবদ্ধতা ও নৈতিক কারণে এ প্রতিবেদনের সকল নাম কল্পিত।তথ্যসূত্র:1. Law Society of Ontario (LSO) ডিসিপ্লিনারি রিপোর্ট: https://www.lso.ca2. কানাডিয়ান লিগ্যাল ইনফরমেশন ইনস্টিটিউট (CanLII): https://www.canlii.org3. CBC News (২০২৩): “How Fake POAs Are Fueling Real Estate Fraud in Toronto”4. The Globe and Mail (২০২৪): “Disciplinary Actions Against Immigrant Lawyers Rise by 40%” [ad_2]

ডাইরেক্ট মেসেজ

Telegram Direct Message WhatsApp Direct Message

বাংলা ফন্ট কনভার্টার (বিজয় ⇄ ইউনিকোড)

×

তথ্য

×