কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে লাগা আগুন টানা আট দিন ধরে জ্বলছে। বন্ধ হয়নি গ্যাসের নির্গমনও। পর্যবেক্ষণে আগুনের শিখা ক্রমেই বাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এখনই আগুন নেভানোর উদ্যোগ নিচ্ছে না বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স) ও পেট্রোবাংলা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, গ্যাসের উৎস, নির্গমনের ধরন ও প্রবাহ সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হতে পারে। তাই আপাতত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৫ দিন আগুনের শিখার উচ্চতা, গ্যাসের প্রবাহ ও পরিস্থিতির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হবে। এরপরও আগুনের তীব্রতা না কমলে গ্যাসের নির্গমন বন্ধ করতে রিলিফ কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সাইড ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিকল্প কূপের মাধ্যমে গ্যাসের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হতে পারে। তবে পর্যবেক্ষণের সময় গ্যাসের প্রবাহ কমে গেলে বা বন্ধ হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, গ্যাসের প্রকৃত উৎস, রাসায়নিক উপাদান এবং এর সঙ্গে তেল বা কনডেনসেট রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আগুনের প্রচণ্ড তাপের কারণে মূল নির্গমনস্থল থেকে নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আগুন নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকির পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ সম্পদের প্রকৃতি ও সম্ভাবনা নির্ধারণের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে।
এদিকে ঘটনাস্থলের ২০০ মিটারের মধ্যে মানুষের প্রবেশ ও অবস্থানে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ১৪৪ ধারা জারি করেছে ইউএনও ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তার। টানা আট দিন আগুন জ্বলতে থাকায় ইনানী ছোট খাল ও শফিরবিল এলাকার প্রায় ৪০০ পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
হিমছড়িতে অবৈধ দোকান উচ্ছেদ, জরিমানা
আগুন নেভানোর চেয়ে পর্যবেক্ষণে গুরুত্ব কেন?
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের দলনেতা এস এম নাফিফুন আরহামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি দল কয়েক দিন ধরে ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ করছে। পাশাপাশি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুকতাদিরসহ কয়েকজন কর্মকর্তা।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক এস এম নাফিফুন আরহাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে গ্যাস জ্বলতে দেওয়াই যুক্তিযুক্ত হতে পারে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। গ্যাসের নির্গমন অব্যাহত থাকলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে রিলিফ কূপ খনন করে ভূগর্ভে সিমেন্ট পাম্পের মাধ্যমে গ্যাসের প্রবাহ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সম্ভাব্য বিকল্পগুলো পর্যালোচনা প্রয়োজন। প্রথমে সাত দিন পর্যবেক্ষণের কথা বলা হলেও পরে পরিস্থিতি বিবেচনায় সময়সীমা ১৫ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঘটনাস্থল থেকে পাথর ও পানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আগুনের কারণে আপাতত গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ সম্ভব হচ্ছে না। গ্যাস শুধু নলকূপ খননের স্থান দিয়ে নয়, আশপাশের বিভিন্ন স্থান দিয়েও নির্গত হচ্ছে।
বাপেক্সের সহকারী ব্যবস্থাপক ইমামুল ইসলাম রোকন বলেন, গ্যাস শনাক্ত করতে ডিটেক্টর নিয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। বাপেক্সের প্রোডাকশন ফিল্ডের একটি দল আশপাশের অন্য কোনো স্থান দিয়ে গ্যাস বের হচ্ছে কি না, তা-ও পরীক্ষা করেছে। তবে আগুন জ্বলতে থাকায় মূল নির্গমনস্থলে ডিটেক্টর দিয়ে গ্যাস শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। আশপাশের বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষা করেও অন্য কোথাও গ্যাস নির্গমনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও বলেন, আগুনের প্রচণ্ড তাপের কারণে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। প্রায় ২০ থেকে ২৫ ফুট দূর থেকেও প্রচণ্ড তাপ অনুভূত হচ্ছে। এ অবস্থায় আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ছাড়া তাঁদের আর কোনো উপায় নেই।
বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুকতাদির বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাপেক্সের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা রয়েছে। নিজেদের ব্যবস্থাপনাতেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। তবে যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকায় নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
আগুনের শিখা বাড়ছে!
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন মহাব্যবস্থাপককে নিয়ে পেট্রোবাংলায় একটি সভা হয়। সেখানে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছে, নির্গত গ্যাসটি থার্মোজেনিক ও বায়োজেনিক প্রকৃতির হতে পারে। আগুনের শিখার রং দেখে গ্যাসের সঙ্গে তেল বা কনডেনসেট থাকার বিষয়টিও অনুমান করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুনের শিখার রং কালো দেখা গেছে। এটি গ্যাসের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল বা কনডেনসেট নির্গমনের ইঙ্গিত দিতে পারে। বাপেক্সের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিয়মিত পরিস্থিতির প্রতিবেদন নেওয়া হচ্ছে। সেসব প্রতিবেদন পর্যালোচনায় আগুনের শিখা ক্রমেই বাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
মো. শোয়েব আরও বলেন, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ধারণা করা হচ্ছে, আগুনের উৎস একটি অগভীর গ্যাসের মজুত বা শ্যালো রিজার্ভার। দেশে সাধারণত ভূগর্ভের দেড় থেকে পাঁচ কিলোমিটার গভীরে গ্যাসের মজুত পাওয়া যায়। তবে ইনানীর গ্যাসের উৎস ও প্রকৃত পরিমাণ নিশ্চিত হতে ১৫ দিন পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ সময় আগুনের শিখার উচ্চতা ও গ্যাস নির্গমনের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
তিনি বলেন, ১৫ দিন পর আগুনের শিখার উচ্চতা বেড়েছে বা অপরিবর্তিত রয়েছে বলে দেখা গেলে আগুন বন্ধ করতে রিলিফ কূপ খননের পরিকল্পনা করা হবে। এ ক্ষেত্রে সাইড ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিকল্প কূপের মাধ্যমে গ্যাসের নির্গমন বন্ধের চেষ্টা করা হবে। বিশ্বব্যাপী এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। তবে পর্যবেক্ষণের সময় গ্যাসের প্রবাহ কমে গেলে বা বন্ধ হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মো. শোয়েব বলেন, আশপাশের কয়েকটি ভূতাত্ত্বিক স্তর থেকেও গ্যাস জ্বলতে দেখা গেছে। ভূগঠনে কিছু পরিবর্তনের কারণে এভাবে গ্যাস নির্গমন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে বাপেক্স সেখানে ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) ভূকম্পন জরিপ পরিচালনা করবে। জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে গ্যাসের মজুতের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মজুত পাওয়া গেলে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
গ্যাসের সঙ্গে তেল বা কনডেনসেট থাকার সম্ভাবনা কতটা?
ইনানীর ঘটনায় গ্যাসের সঙ্গে তেলজাতীয় তরল পদার্থ বা কনডেনসেট থাকার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে আগুনের শিখার রং বা ধোঁয়ার ধরন দেখে এর উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায় না। এ জন্য গ্যাসের রাসায়নিক বিশ্লেষণ, তরল নমুনা পরীক্ষা ও ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক এস এম নাফিফুন আরহাম বলেন, সেখানে প্রায় এক হাজার ফুট গভীরতা পর্যন্ত বোরিং করা হয়েছিল। তবে খননের সময় গ্যাসের উপস্থিতি বোঝা যায়নি। ২৭ অক্টোবর ভোর থেকে গ্যাসের অস্তিত্ব অনুভূত হয়। পরে তা আগুনের শিখা আকারে জ্বলতে শুরু করে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ভূগর্ভস্থ গ্যাসের আধার থেকে এ গ্যাস বের হচ্ছে।
গ্যাসের উপাদান সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রাকৃতিক গ্যাসে সাধারণত মিথেনের পাশাপাশি ইথেন, প্রোপেন, বিউটেন ও পেন্টেনের মতো হাইড্রোকার্বন থাকতে পারে। তবে ইনানীর গ্যাসের প্রকৃত উপাদান পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। আগুনের রং ও ধোঁয়ার ধরন দেখে উচ্চতর হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের মতে, ভূতাত্ত্বিকভাবে প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল একই হাইড্রোকার্বন ব্যবস্থার অংশ হতে পারে। বিশেষ করে থার্মোজেনিক গ্যাসের সঙ্গে কনডেনসেট কিংবা অন্যান্য তরল হাইড্রোকার্বন পাওয়া সম্ভব। তবে ইনানীর প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও অনুসন্ধানের বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, এখন মূল প্রশ্ন হলো—এটি কি কেবল স্থানীয়ভাবে আটকে থাকা গ্যাস, নাকি বৃহত্তর কোনো হাইড্রোকার্বনসমৃদ্ধ ভূগর্ভস্থ স্তরের অংশ? এর উত্তর নির্ভর করছে গ্যাসের রাসায়নিক বিশ্লেষণ, ভূতাত্ত্বিক কাঠামো পর্যবেক্ষণ ও পরবর্তী অনুসন্ধানের ওপর। এখন পর্যন্ত বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস বা তেলের মজুত নিশ্চিত হয়নি।
৫৪ বছর পরও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন:
ইনানীর আগুনের ঘটনা দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান, উত্তোলন ও ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন সামনে এনেছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও ভূগর্ভস্থ গ্যাসের উৎস শনাক্ত, নমুনা সংগ্রহ, প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদে উত্তোলনের ক্ষেত্রে কেন এত অনিশ্চয়তা—তা নিয়ে সচেতন মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
বাপেক্সসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও পরিচালনায় দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে শুধু অনুসন্ধান বা নমুনা সংগ্রহ নয়, দেশের প্রাকৃতিক সম্পদকে জাতীয় উন্নয়ন ও জ্বালানি নিরাপত্তায় কাজে লাগানোর বাস্তব সক্ষমতা অর্জনের প্রত্যাশাও রয়েছে।
প্রাকৃতিক সম্পদ আবিষ্কারের পর এর প্রকৃতি নির্ধারণ, উত্তোলনযোগ্যতা যাচাই, নিরাপদ উত্তোলন ও কার্যকর ব্যবহারের জন্য দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিদেশি প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ইনানীর ঘটনায় আগুন নেভাতে বিলম্বকে সরাসরি প্রযুক্তিগত অক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এ ঘটনা দেশের ভূগর্ভস্থ সম্পদ অনুসন্ধান ও ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান সক্ষমতা পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে।
পর্যটন, জননিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা:
ইনানী দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন অঞ্চল। এখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্র। ফলে ভূগর্ভে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস বা তেলের মজুত পাওয়া গেলে জ্বালানি খাতের সম্ভাবনার পাশাপাশি পর্যটনশিল্পের নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
গ্যাস বা তেল উত্তোলনে ভারী যন্ত্রপাতি, খননকাজ, যানবাহন, শব্দদূষণ ও শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় পর্যটন পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া গ্যাস নির্গমন ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলেই সব হোটেল-রিসোর্ট বন্ধ বা স্থানান্তর করতে হবে, এমন নয়। উত্তোলন এলাকার অবস্থান, নিরাপত্তা দূরত্ব, পরিবেশগত প্রভাব ও ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনার ভিত্তিতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস বা তেলের মজুত নিশ্চিত হলে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। ভূতাত্ত্বিক ও পেট্রোলিয়াম প্রকৌশল, খননকাজ, নির্মাণ, পরিবহন, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার মতো খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। স্থানীয় তরুণদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে এ শিল্পে সম্পৃক্ত করা গেলে উন্নয়নের সুফল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছাতে পারে।
জাতীয় অর্থনীতির দিক থেকেও নতুন দেশীয় গ্যাসের উৎস গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা ও আমদানিনির্ভরতার বাস্তবতায় উল্লেখযোগ্য গ্যাসের মজুত নিশ্চিত হলে তা বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও জাতীয় জ্বালানি সরবরাহে অবদান রাখতে পারে। তবে প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে মজুতের পরিমাণ, উত্তোলন ব্যয়, অবকাঠামো, বাজারমূল্য ও পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার ওপর।
জননিরাপত্তায় প্রশাসনের তৎপরতা:
গ্যাসের আগুনের ঘটনায় জননিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানের নেতৃত্বে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পাশাপাশি উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তার এবং উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার বিভিন্ন সময়ে দফায় দফায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, বিষয়টি কারিগরি, প্রযুক্তিগত ও গবেষণাসংশ্লিষ্ট। তাই বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার পরামর্শ অনুযায়ী জেলা ও উপজেলা প্রশাসন পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে। স্থানীয় প্রশাসন আপাতত জননিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার সূত্রপাতের দিন থেকেই উখিয়ার ইউএনও ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তার সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন।
এখন সবচেয়ে জরুরি জননিরাপত্তা ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান :
ইনানীর ঘটনায় আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গ্যাসের উৎস ও প্রকৃতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ। এ জন্য ঘটনাস্থলে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর রাখা, জনসচেতনতা বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা জরুরি।
পাশাপাশি গ্যাসের রাসায়নিক গঠন ও উৎস নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় ভূকম্পন জরিপ, সম্ভাব্য মজুতের পরিমাণ যাচাই এবং বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্যতা পরীক্ষা করতে হবে। সম্ভাব্য উত্তোলন কার্যক্রমের আগে ইনানীর হোটেল-রিসোর্ট, পর্যটন অবকাঠামো, পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব মূল্যায়নও জরুরি।
প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের মতে, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের পরিকল্পনায় পর্যটনশিল্পের সুরক্ষা, স্থানীয় কর্মসংস্থান, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থ সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা উচিত।
ইনানীর ভূগর্ভে গ্যাসের উপস্থিতি এবং তেল বা কনডেনসেট পাওয়ার সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের বিষয়। তবে সম্ভাবনা আর নিশ্চিত সম্পদ এক নয়। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য পাওয়ার পরই এ বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।
আপাতত বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৫ দিন পর্যবেক্ষণ চলবে। এরপর আগুনের শিখা ও গ্যাসের প্রবাহ পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে রিলিফ কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। এ সময়ে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি বজায় রাখা এবং অনুসন্ধান কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রধান দায়িত্ব।
❓ সাধারণ জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: ইনানীতে গ্যাসের আগুন নেভানো হচ্ছে না কেন? সম্পর্কিত তথ্য কী?
উত্তর: কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে লাগা আগুন টানা আট দিন ধরে জ্বলছে। বন্ধ হয়নি গ্যাসের নির্গমনও। প। মূল সংবাদ থেকে বিস্তারিত জানুন।




মন্তব্য করুন