কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা ভূমি অফিসের নাজির মো. আলমগীরের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সেবাপ্রার্থীদের হয়রানির গুরুতর অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী। তাঁদের ভাষ্য, নামজারি, মিস মামলা নিষ্পত্তি ও খতিয়ান সৃজনসহ বিভিন্ন ভূমিসংক্রান্ত কাজে দ্রুত সেবা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তিনি লাখ লাখ টাকা আদায় করেন। এ ক্ষেত্রে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডের নাম ব্যবহার এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি গোপন রাখার কথাও জানিয়েছেন তাঁরা।
ভুক্তভোগীদের দাবি, নির্ধারিত অর্থ না দিলে দিনের পর দিন ফাইল আটকে রাখা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্যের জমির বিপরীতে ভুয়া রেকর্ডপত্র তৈরি করে হয়রানি করা হয়।
তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিস মামলা নিষ্পত্তিতে এসিল্যান্ডকে দেওয়ার কথা বলে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা, প্রতিটি নামজারি মামলা অনুমোদনে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে খতিয়ান সৃজনসহ বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইনানী মৌজার জমিসংক্রান্ত সেবা পেতে এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয় বলেও জানিয়েছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। এসব অর্থের বিপরীতে রসিদ দেওয়া হয় না বলে তাঁদের দাবি।
এসিল্যান্ডের ওপর নাজিরের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন : সেবাপ্রার্থীদের কয়েকজনের ভাষ্য, নাজির আলমগীরের প্রভাব ও দাপটের কারণে ভূমি অফিসে স্বাভাবিক সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, নাজির আলমগীর এসিল্যান্ডের অধীনস্থ কর্মচারী, নাকি এসিল্যান্ডই তাঁর প্রভাবের অধীন—তা বোঝা মাঝে মাঝে কঠিন!
ইয়াবাবিরোধী অভিযানে সাফল্য, স্বীকৃতি পেল উখিয়া থানা পুলিশ
আলমগীর প্রকাশ্যে দাবি করেন, এসিল্যান্ড তাঁর কথামতো চলেন এবং তাঁর পরামর্শ ছাড়া সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। বান্দরবান জেলা প্রশাসনের কার্যালয় থেকে আবু আবদুল্লাহকে উখিয়ায় বদলি করানোর পেছনেও নিজের ভূমিকা রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এ জন্য একজন বিএনপি নেতার মাধ্যমে তদবির এবং মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের কথাও জনসমক্ষে বলেন বলে তাঁদের ভাষ্য।
এসিল্যান্ডের ওপর তাঁর প্রভাব বিস্তারের এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার : সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নাজির মো. আলমগীর সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এবং সাবেক সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ সাইমুম সরওয়ার কমলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। তাঁর সুপারিশেই আলমগীরের সরকারি চাকরি হয় বলে সূত্রটি জানিয়েছে। এর আগে কক্সবাজার সদর উপজেলা ভূমি অফিসে কর্মরত থাকাকালে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে অনিয়ম ও দুর্নীতি করার কথাও জানা গেছে।
চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল সদর উপজেলা ভূমি অফিস থেকে বদলি হয়ে উখিয়া ভূমি অফিসে যোগ দেন আলমগীর। ভুক্তভোগীদের দাবি, নতুন কর্মস্থলেও তিনি একইভাবে প্রভাব বিস্তার ও অর্থ আদায় করছেন। বর্তমানে বিএনপির নেতাদের ঘনিষ্ঠজন পরিচয় ব্যবহার করেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
রামু উপজেলার মণ্ডলপাড়ায় আলমগীরের বাড়ি এবং সাবেক হুইপ সাইমুম সরওয়ার কমলের গ্রামের বাড়ি একই এলাকায় হওয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবের কথা বলে ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখান তিনি—এমন অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর তাঁর কথার অবাধ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া এবং কক্সবাজার জেলা, রামু ও উখিয়া উপজেলা বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার ঘনিষ্ঠজন পরিচয় দিয়ে তাঁদের অন্যত্র বদলি করানোর ভয় দেখানোর কথাও জানিয়েছেন তাঁরা।
ভুক্তভোগীদের মতে, ভূমি অফিসের অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনে অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে বলেও দাবি করেছেন কয়েকজন।
সদর ভূমি অফিসেও অনিয়মের তথ্য : সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কক্সবাজার সদর উপজেলা ভূমি অফিসে কর্মরত থাকাকালেও আলমগীরের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও এসিল্যান্ডের নাম ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ছিল। এসব বিষয়ে তদন্তে প্রমাণ পাওয়ার পর জেলা প্রশাসক তাঁকে সদর ভূমি অফিস থেকে উখিয়া ভূমি অফিসে বদলি করেন বলে সূত্রটি জানিয়েছে। তবে এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক নথি বা বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ছাত্র সমন্বয়কের বক্তব্য : জেলা ছাত্র সমন্বয়ক শাহিদুল ওয়াহিদ শাহেদ বলেন, নাজির আলমগীর সাবেক ছাত্রলীগ নেতা। জুলাই-আগস্টে ছাত্র হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক সংসদ সদস্য ও হুইপ সাইমুম সরওয়ার কমলের সুপারিশে ভূমি অফিসে তাঁর চাকরি হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। আলমগীর যোগদানের পর থেকে সদর ও উখিয়া উপজেলা ভূমি অফিসে অনিয়ম-দুর্নীতি বেড়েছে বলেও তাঁর বক্তব্য।
শাহেদ বলেন, ভূমি অফিসে সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি বন্ধ এবং দুর্নীতির বিষয়গুলো তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : উখিয়া উপজেলা ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার (ভূমি) সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। ফলে নাজির আলমগীরের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বলেন, “উখিয়া উপজেলা ভূমি অফিসের অনিয়মের বিষয়ে আমি এইমাত্র অবহিত হলাম। তদন্ত করে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে, উখিয়া ভূমি অফিসের অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনের বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী জমির মালিকেরা। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁরা।
- সংবাদকর্মী ইমরানের উপর হামলাকারীদের এক সপ্তাহেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ!
- উখিয়ায় আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা; মাদক ও সার পাচার রোধে কঠোর অবস্থান
❓ সাধারণ জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: সাবেক ছাত্রলীগ নেতার হাতে জিম্মি উখিয়া ভূমি অফিস! সম্পর্কিত তথ্য কী?
উত্তর: কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা ভূমি অফিসের নাজির মো. আলমগীরের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সেবাপ্রার্থীদের হয়রানির গুরুতর অভিযোগ করেছে। মূল সংবাদ থেকে বিস্তারিত জানুন।




মন্তব্য করুন